মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ ৫ লাখ টাকা

Presentation1-51.jpg

সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ আহত হলে ক্ষতিপূরণ পাবেন তিন লাখ টাকা। নিহত ব্যক্তির পরিবার পাবে পাঁচ লাখ টাকা। নতুন সড়ক আইনে ক্ষতিপূরণের এ ব্যবস্থা রেখে খসড়া বিধিমালা তৈরি করেছে সরকার। ক্ষতিপূরণের অর্থের মূল জোগানদাতা যানবাহনের মালিকেরা। সরকারও অনুদান দেবে।

নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়েছে দুই বছর আগে। কার্যকর হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে। আইনে ক্ষতিপূরণের কথা থাকলেও বিধিমালা তৈরি না হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি। তবে খসড়া বিধিমালায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার ব্যক্তিরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের বড় অংশই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই ক্ষতিপূরণ আরও বাড়ানো দরকার।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নতুন সড়ক আইনের খসড়া বিধিমালা তৈরি করেছে। মতামতের জন্য এটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ে আছে। ক্ষতিপূরণ দিতে আর্থিক তহবিল গঠন করতে হবে।

জানতে চাইলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, খসড়া বিধিমালার ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত নিতে হবে। এরপর সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় বিধিমালাটি অনুমোদন দেবে। এরপরই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন এবং যানবাহনের মালিকের কাছ থেকে চাঁদা আদায় শুরু হবে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু বা পঙ্গু হওয়ার ক্ষতি তো কোনোভাবেই পোষানো সম্ভব নয়। আর্থিক সহায়তা পেলে আহত ব্যক্তি ও নিহত ব্যক্তির পরিবার কিছুটা হলেও উপকার পাবে।

ক্ষতিপূরণ জরুরি

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। সরকারি হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ হাজার ২৬৩ জন, আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৩২১ জন। আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এ সময় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭ হাজার ১৭০ জন, আহত হয়েছেন প্রায় ৮৩ হাজার।

গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে শিশুর লাশ নিয়ে ঝালকাঠির গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন এক পরিবারের পাঁচ সদস্য। বরিশালের উজিরপুরে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সকে ধাক্কা দেয় একটি কাভার্ড ভ্যান। এ সময় পেছনে থাকা একটি বাস কাভার্ড ভ্যানকে ধাক্কা দেয়। এতে অ্যাম্বুলেন্সচালকসহ আরোহীদের সবাই মারা যান।

ঘটনাটি অনেককেই নাড়া দিয়েছিল। দাফন-কাফনের জন্য জেলা প্রশাসন সামান্য কিছু অর্থও দেয়। এখন আর খবর নেওয়ার কেউ নেই।

নিহত ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ স্বজন রাশেদুল হাসান দুর্ঘটনার পর গৌরনদী হাইওয়ে থানায় মামলা করেছিলেন। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মামলার অগ্রগতি কী, সেটা তিনি জানেন না।

ওই দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন একই পরিবারের মা, দুই ভাই, বোন ও এক ভাইয়ের শ্যালক। রাশেদুল বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ হোসেন। গ্রামে থাকা এক প্রতিবন্ধী চাচার ভরণপোষণ করত আরিফের পরিবার। মাসে চার হাজার টাকার মতো ওষুধ লাগে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর চাচার জীবনও কঠিন হয়ে পড়েছে। আরিফের বাবা মারা গেছেন আগেই। এখন মামলা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করার মতো লোকও নেই।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন কিংবা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আইনি ভিত্তি ছিল না। সড়ক দুর্ঘটনার পর মামলা হলেও সাক্ষীর অভাব, দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের আন্দোলনের হুমকির কারণে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হওয়ার নজির কম।

২০১৮ সালে ঢাকায় গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাসের চাপায় পা হারান রাসেল সরকার। তিনি পেশায় কারচালক। এ ঘটনায় হাইকোর্টের রায়ে গ্রিন লাইন পরিবহন রাসেলকে ১০ লাখ টাকা দেয় এবং চিকিৎসা সহায়তা দেয়। আদালত আরও ২০ লাখ টাকা দিতে বলেছেন।

■ তহিবল গঠনে বাস-ট্রাকের মালিককে দিতে হবে বছরে ১ হাজার টাকা।

■ মোটরসাইকেলের জন্য এককালীন ৫০০ টাকা।

■ কার-জিপের ক্ষেত্রে বছরে ৩০০ টাকা।

ক্ষতিপূরণ কীভাবে, কত

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, আর্থিক তহবিলে সরকারের অনুদান ও যানবাহনমালিকের চাঁদা ছাড়াও সড়ক আইনের অধীনে আদায় করা বিভিন্ন জরিমানা, পরিবহনমালিক-শ্রমিক সংগঠনের অনুদান, অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে পাওয়া অর্থ নেওয়া যাবে। একটি স্থায়ী ট্রাস্টি বোর্ড এ তহবিল পরিচালনা করবে। চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে না পারলে আহত ব্যক্তি এককালীন তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা পাবেন এককালীন পাঁচ লাখ টাকা।

ট্রাস্টি বোর্ডের প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায়। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আহত ব্যক্তি কিংবা নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর বোর্ডের নির্ধারিত কমিটি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে। ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদনের সর্বোচ্চ ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিচয় নিশ্চিত করাই হবে ট্রাস্টি বোর্ডের তদন্তের মূল ভিত্তি।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ২০১৭ সালে প্রকাশ করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির প্রাণ হারানোর কারণে ২৪ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ টাকার ক্ষতি হয়। তবে এর সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবারের অন্যদের অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের ক্ষতিসহ অন্যান্য বিষয় আমলে নেওয়া হয়নি।

কোন যানের চাঁদা কত

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, আর্থিক তহবিল গঠনে মোটরসাইকেলের মালিককে এককালীন ৫০০ টাকা দিতে হবে। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানের মতো বড় যানের চাঁদা বছরে এক হাজার টাকা। বছরে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হবে মিনিবাস, মিনিট্রাক, পিকআপের। কার, জিপ ও মাইক্রোবাসের বার্ষিক চাঁদা ৩০০ টাকা। অটোরিকশাসহ থ্রি হুইলার এবং অন্যান্য যানের বার্ষিক চাঁদা হবে ২০০ টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বার্ষিক চাঁদা দিতে প্রস্তুত। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা আগে তেমন কোনো ক্ষতিপূরণ পেত না। তহবিল গঠন করা হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হবে।

বিআরটিএর হিসাব বলছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সাড়ে ৪৫ লাখ যানবাহন আছে। প্রতিবছর গড়ে পাঁচ লাখ নতুন যানবাহন যুক্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী এক বছরের মধ্যে শতকোটি টাকার ওপরে তহবিল গঠন সম্ভব।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আগের আইনে তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বিমা বাধ্যতামূলক থাকলেও নতুন সড়ক আইনে তা নেই। আগে বিমার পেছনে বাস-ট্রাকের মালিক বছরে দু-তিন হাজার টাকা খরচ করতেন। তহবিলের জন্য বছরে চাঁদা ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। ক্ষতিপূরণ অনায়াসে আরও বাড়ানো যেত।

২০১৭ সালে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় এসেছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ভালো দিক। তবে পরিবহনমালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপ, বিআরটিএ এবং পুলিশের সক্ষমতার ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এগুলো বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ।

জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশে তহবিল ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। ফলে আর্থিক সংশ্লেষ আছে, এমন অনেক ভালো আইন সফল হয় না। সড়ক খাতের আর্থিক তহবিল ব্যবস্থাপনায় ট্রাস্টি বোর্ডকে অবশ্যই পেশাদার হতে হবে। অর্থ খরচে থাকতে হবে স্বচ্ছতা। তহবিল ব্যবস্থাপনায় মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের যেন কর্তৃত্ব না থাকে।’ তিনি বলেন, আইনে কী থাকল তার চেয়ে তা কতটা প্রয়োগ হচ্ছে, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top