এক অসাধারণ, আদর্শবান শিক্ষকের গল্প

untitled-1.jpg

দিসিএম ডেস্ক।।

ওপেন হার্ট সার্জারি করা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই শিক্ষক এখনও রাত জেগে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মেধার বিকাশ ও তাদের সুন্দর আগামীর জন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা করেন। শিক্ষার্থীরাও নিজেদের আদর্শ মনে করেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষক সোপানুল ইসলামকে।

 

 

সাধারণ থেকেই কর্মগুণে অসাধারণ হয়ে উঠেন একজন মানুষ। মেধা আর প্রজ্ঞা দিয়ে আলোকিত করেন গোটা জাতিকে। এমনই একজন অসাধারণ ও আদর্শবান শিক্ষক সোপানুল ইসলাম। ওপেন হার্ট সার্জারি করা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই শিক্ষক এখনও রাত জেগে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মেধার বিকাশ ও তাদের সুন্দর আগামীর জন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা করেন। শিক্ষার্থীরাও নিজেদের আদর্শ মনে করেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষক সোপানুল ইসলামকে।

 

ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এই শিক্ষক বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের আইডিয়াল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী এখন দেশের বিভিন্ন সম্মানজনক অবস্থানে আছেন। এদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক, সেনা কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কবি ও সঙ্গীতশিল্পীও রয়েছেন। তাদের অনেককেই বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন শিক্ষক সোপানুল ইসলাম।

 

বাবা মনিরুল ইসলামের অনুপ্রেরণায় শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়া সোপানুল ইসলাম মনে করেন, একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মাঝে নৈতিকতার আদর্শিক রূপ চিত্রায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বাবা মনিরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের পূর্বমেড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

 

মূলত বাবার আগ্রহেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে সহজভাবে উপস্থাপন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে তিন দশক ধরে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বাবার অনুপ্রেরণায় শিক্ষক হয়ে এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন অসাধারণ, আদর্শবান শিক্ষক তিনি।

 

২০১২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সোপানুল ইসলামের বাইপাস সার্জারি করানো হয়। এখনও শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ তিনি। কিন্তু অসুস্থতার মধ্যেও রাত জেগে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তারে নানা পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি সহওয়ার আগে বিভিন্ন টিচিং অ্যাপস্ ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা পরিচালনা করেছেন।

 

সম্প্রতি শিক্ষক হয়ে উঠা ও শিক্ষকতার প্রতিবন্ধকতাসহ নানা বিষয় নিয়ে তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মুখোমুখি হন।

 

সোপনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছাত্রজীবন থেকেই বাবাকে দেখেছি, তিনি বিবেকের তাড়নায় নৈতিক মূল্যবোধের প্যারামিটারগুলো নিয়ে সারাজীবন কাজ করেছেন এবং আক্ষেপও করেছেন। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও মানুষ কীভাবে ঘৃণ্য আচরণ করে, হিংস্র হয় এবং অহংকার করে আবার পরচর্চাও করে! আমার মনে হয়েছে একজন শিক্ষককে আগে অনুকরণীয় আদর্শের অধিকারী হতে হবে; তারপর তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিকতার আদর্শিক রূপ চিত্রায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। তাই মনে প্রাণে নিজেকে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে চেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করেছি।’

 

তিন আরও বলেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজচিত্রে একজন শিক্ষকই উপযুক্ত নাগরিক তৈরি করতে পারেন। যাপিত জীবনে যেটি আর অন্য কোনো পেশায় থেকে এতোটা সম্মানজনক ও স্বাচ্ছ্যন্দভাবে করা সম্ভব নয়। আমার দার্শনিক বাবার অনুপ্রেরণাতেই শিক্ষক হয়েছি। বাবার আগ্রহেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাই শত শত নির্ঘুম রাতে জেগে থেকে নানা কৌশলে ইংরেজি শিক্ষার বিষয়গুলোকে সহজভাবে শৈল্পিক রূপ দিয়ে সাজিয়ে যাচ্ছি।

 

তিনি আরও বলেন, আমার দুই ছেলে এখনও স্কুল শিক্ষার্খী। আমার ইচ্ছা তাদের একজনকে আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত শিক্ষক বানাবো। যেনো সে নিষ্ঠাবান শিক্ষকতার আবরণে ডিজিটাল রোবটিক যুগে মানবিক মানুষ তৈরি করতে পারে।

 

তবে শিক্ষকদের আর্থিক দৈন্যদশা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপও রয়েছে সোপানুল ইসলামের। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার কাছে সম্মানের মূল জায়গাটি স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু সম্মানের জন্য এখন আর মানুষ শিক্ষক হতে চায় না। যোগ্যতা সম্পন্ন মেধাবী মানুষগুলো এখন শিক্ষকতার চেয়ে টাকার নেশায় তাড়িত হচ্ছে বেশি।

 

কোচিং নিয়ে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক যুগে অগ্রসর অনেক শিক্ষার্থীই কোচিংয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে পরনির্ভরশীল কাগজি ‘এ প্লাস’ পাওয়ার জন্য বিশ্রী মানসিকতা সম্পন্ন পরীক্ষার্থী তৈরি করার প্রতিযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসা কোচিংকে কোনোভাবেই সমর্থন যোগ্য নয়।

 

শিক্ষাঙ্গণের পাশাপাপশি সামাজিক অঙ্গণেও সমান পরিচিত তিনি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীৃদের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ জাগানোর সকল শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত থাকেন সোপানুল ইসলাম। কারণ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেন তাঁর কথা। সাধারণ থেকে একজন অসাধারণ, আদর্শবান শিক্ষক হয়ে উঠা সোপানুল ইসলাম এখন ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাদের আদর্শ।

 

শিক্ষক সোপানুল ইসলামের ছাত্রী, বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত নিশাত তাসনিম বলেন, ‘আমি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আইডিয়াল রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পড়েছি। তখন স্যার সবসময় আমাদের অনুপ্রাণিত করতেন, কীভাবে সামনের দিক অগ্রসর হতে হবে সেই দিকনির্দেশনা দিতেন। স্যার আমাদের সবসময় বলতেন- আগে একজন ভালো মানুষ হও, তাহলে জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারব। স্যারের এই কথাটিকে সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই’।

 

সোপানুল ইসলামের আরেক ছাত্র, বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘স্যার সারাক্ষণ শুধু ছাত্রছাত্রীদের মেধার বিকাশ ও উন্নয়ন নিয়েই ভাবেন। তিনি ব্যক্তি জীবনে শতভাগ সৎ মানুষ এবং আমার দেখা একমাত্র শিক্ষক; যিনি ছাত্রছাত্রীদের জন্য তার কর্মরত প্রতিষ্ঠানে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেন।

 

‘স্যার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেক ছেলে-মেয়েকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন, ইংরেজিকে সহজভাবে উপস্থাপন করা শিখিয়েছেন। কত ছাত্রছাত্রী পড়িয়েছেন সেটির হিসেব স্যারও দিতে পারবেন না। স্যারের অনেক ছাত্রছাত্রী এখন ভালো অবস্থানে আছেন, কিন্তু এসব নিয়ে স্যারের মাঝে কখনোই অহংকারী মনোভাব দেখিনি’- যোগ করেন শাহাদাৎ।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top