পুলিশে বদলির রেকর্ড; এক আদেশেই কক্সবাজারের ১০৭৫ কনস্টেবল বদলি

IMG_20200926_183057.jpg

দিসিএম ডেস্ক  ।৷ ইত্তেফাক 

কক্সবাজার জেলা পুলিশকে ঢেলে সাজাতে ব্যাপক রদবদলের অংশ হিসেবে কর্মকর্তা থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সবাইকে বদলি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার এক আদেশেই কক্সবাজারের ১ হাজার ৭৫ কনস্টেবলকে বদলি করা হয়েছে। এর আগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর এসপি মাসুদ হোসেনসহ ৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। কিছুদিন আগে ৩৪ জন ইন্সপেক্টর এবং এসআই ও এএসআইসহ ২৬৪ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত বদলির আদেশ পাওয়া পুলিশ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৪৬ জন। এর মাধ্যমে পুলিশে বদলির রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশের ইতিহাসে একযোগে জেলা পুলিশে এত বড় বদলির ঘটনা এই প্রথম। এক সঙ্গে এই বদলির ঘটনাকে অস্বাভাবিক মনে হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আসলে এখানে অস্বাভাবিকের বলে কিছু নেই। স্বাভাবিক নিয়মে পুলিশে বদলি করা হয়েছে।’ পুলিশের আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘চাকরির ক্ষেত্রে বদলি হইতেই পারে। স্বাভাবিক নিয়মে বদলি করা হয়েছে। এখানে অস্বাভাবিকের কিছু নেই।’

এদিকে জেলা পুলিশে একযোগে এত সংখ্যক বদলির ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা কথাবার্তা চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাদক ব্যবসায়ীদের যে তালিকা রয়েছে সেখানে পুলিশের কিছু সদস্যের নাম রয়েছে। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হন। হয়তো এসব কারণে কক্সবাজার জেলা পুলিশকে ঢেলে সাজানো হয়েছে।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের নতুন ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জনস্বার্থে বদলি করা হয়েছে। পুলিশের আরেক জন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের ঘর আমরা ঢেলে সাজাব। কক্সবাজার পুলিশকে ঢেলে সাজানো হয়েছে।’ তবে যা হোক না কেন, একসঙ্গে এত সংখ্যক পুলিশের বদলির ঘটনা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন অনেকে। এই বদলির মাধ্যমে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও মাদক নির্মূল হবে সাধারণ মানুষ মনে করছেন। অন্যদিকে, কক্সবাজার এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, শুধু একা পুলিশকে ম্যানেজ করে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসা করা অসম্ভব। এখানে কেউ সাধু না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই তারা মাদক ব্যবসা করে। মাঝেমধ্যে ইয়াবার বড় বড় চালান পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিষয়টি পাতানো খেলা বলে উল্লেখ করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মাদক ব্যবসায়ী বলেন, লোক দেখানোর জন্য এসব ঘটনা ঘটানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তা তাদের মাদক রেখে চলে যেতে বলেন। আবার ইয়াবার চালানের সঙ্গে মাদক পাচারকারীকে আটক করে রফাদফা করে ছেড়ে দেয়। ঐ ইয়াবা চালানকে দেখানো হয় পরিত্যক্ত।

গত ৩১ জুলাই পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপসহ আট জন গ্রেফতার হন। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত এপিবিএনের তিন সদস্য ও স্থানীয় তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারাও জেলে রয়েছেন। সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর জেলা পুলিশের ক্রসফায়ার বাণিজ্য, মাদক ব্যবসার সম্পৃক্ততাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে গণমাধ্যমে। এর পর থেকে জেলা পুলিশকে ঢেলে সাজানো শুরু হয়।

নতুন পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বুধবার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আগের এসপি মাসুদ হোসেনকে বৃহস্পতিবার বিদায় জানানো হয়। তাকে রাজশাহীতে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনকে ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আদিবুল ইসলামকে মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কক্সবাজার সদরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজওয়ান আহমেদকে গাজীপুর জিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এবং মহেশখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রতন কুমার দাশ গুপ্তকে চট্টগ্রাম নবম এপিবিএনের সহকারী পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ট্র্যাফিক পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার বাবুল চন্দ্র বণিককে চট্টগ্রাম আরআরএফের সহকারী পুলিশ সুপার, চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মো. মতিউল ইসলামকে নোয়াখালীর সহকারী পুলিশ সুপার এবং ডিএসবির সহকারী পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলামকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে। পুলিশ হেডকায়ার্টার্সের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলামকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মামুন আল ইসলামকে কক্সবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং চট্টগ্রামের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার পংকজ বড়ুয়াকে কক্সবাজার সদরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার মো. জাহেদুল ইসলামকে মহেশখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার, চট্টগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার কাজি শাহবুদ্দিন আহমেদকে কক্সবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার ট্র্যাফিক, র্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার মো. তফিকুল ইসলামকে চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার এবং খাগড়াছড়ির সহকারী পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম শাহনেওয়াজকে ডিএসবি কক্সবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top