খুলতে পারে ব্লু-ইকোনমির নতুন দুয়ার

blue_economy_beautiful-fishes-swimming-sea-water.jpg
আহমদ গিয়াস
কক্সবাজারসহ দেশের সমুদ্র উপকুলীয় এলাকার নদ-নদী, খাল ও ছড়া মোহনায় গত চার মাস ধরে প্রজনন করছে ‘টাইগার পার্স’ বা ‘বরগুনী’ মাছ। আকর্ষণীয় শরীরের কারণে সাম্প্রতিককালে বিশ্বব্যাপী ‘অর্নামেন্টাল ফিশ’ বা ‘শোভাময় মাছ’ হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এ সামুদ্রিক মাছটিকে ঘিরে দেশের ব্লু-ইকোনমিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
কক্সবাজারসহ দেশের সমুদ্র উপকুলীয় এলাকা থেকে গত ৩ দশকে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারণে বেশ কয়েক প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। কিন্তু এখনও সদর্পে টিকে রয়েছে ‘টাইগার পার্স’ বা বরগুনী মাছ। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম থেরাপন জার্বুয়া (Therapon jarbua)। থেরাপন্ডাই (Terapontidae) পরিবারের ‘পার্সিফর্মেস’ (Perciformes) বর্গের এ সামুদ্রিক মাছটি বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশিষ্ট সামুদ্রিক মৎস্য বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিচার্স ইন্সটিটিউটের (বিএফআরআই) সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক।
তিনি বলেন, কক্সবাজারসহ দেশের প্রায় ৫০০ কিলোমিটারব্যাপী সমুদ্র উপকুলীয় এলাকায় বরগুনী মাছের শত শত প্রজনন ক্ষেত্র রয়েছে। আমাদের বঙ্গোপসাগর ও উপকুলে এ মাছটি এখনও দাপটের সাথে টিকে আছে। আর এ মাছটি সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ‘অর্নামেন্টাল ফিশ’ হিসাবে তালিকাভূক্ত হওয়ায় এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।
এ্যাকুরিয়াম ফিশ বা শোভাবর্ধনকারী মাছ হিসাবে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘টাইগার পার্স’ বা ‘বরগুনী’ মাছের প্রজনন ক্ষেত্র রয়েছে কক্সবাজার সৈকতের বড়ছড়া খালের মোহনাতেও। গত চার মাস ধরে এ খালের মোহনাতে মাছটি প্রজনন করছে এবং ইতোমধ্যে এ মোহনায় বড় হওয়া লক্ষ লক্ষ পোনা সাগরে চলে গেছে বলে জানান স্থানীয় অধিবাসীরা।
স্থানীয় অধিবাসীরা আরো জানান, কেবল বড়ছড়া খালের মোহনা থেকে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক মানুষ কিশোর মাছগুলো ধরে নিয়ে যায়। এরপরও এ খালের মোহনা থেকে এ মাছ ফুরোয় না। এ মোহনায় রেণু থেকে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ পোনা ফোটে এবং সাগরে চলে যায়।
কক্সবাজারের বড়ছড়া খাল ছাড়াও দেশের সমুদ্র উপকুলের শত শত পাহাড়ী ছড়া বা খালের মোহনায় এ মাছের প্রজননক্ষেত্র রয়েছে বলে জানান কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান।
তিনি জানান, প্রজননকালীন সময়ে দেশের উপকুলীয় বালুকাময় নদনদী, খাল ও ছড়া মোহনায় ব্যাপকভাবে ধরা পড়ে মাছটি। আর এসব প্রজননক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি পোনা বড় হয়ে সাগরে চলে যায়। আর কিছু মাছ ছোট অবস্থায় মানুষের হাতে ধরা পড়ে। এ মাছটি উপকুলের মৎস্য খামারে বা ছোট্ট চৌবাচ্চাতেও চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
টাইগার পার্স বা বরগুনী মাছকে স্থানীয় ভাষায় ‘ঘ ঘ’ মাছ বলা হয়। এ মাছের লেজ ধরলে তার মুখ থেকে ‘ঘ ঘ’ সুরে শব্দ বের হয় বলে মাছটির এ নাম। অনেকেই এটাকে ভোয়াং মাছও বলে থাকে।
টাইগার পার্স মাছটি বাংলাদেশ, ভারত ও কম্বোডিয়ায় বরগুনী মাছ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ‘কাঠ-কোই’ নামে পরিচিত। এছাড়া জিরপাই, গরঙ্গেটা, জলকন্যা, গোর, কিলিপোথু বৈকেলি, সমুদ্রাকিলি, গঙ্গা কিলি, পোল বাতেয়া, ইরি বাতেয়া, শ্রীলংকাতে পলিন-কেচঞ্চন, অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিসেন্ট গ্রান্টার, ক্রিসেন্ট পার্চ, মায়ানমারে; বাঘাট, জেলামা, কিরং-কিরং, মেংকারং, কেরং-কেরং, সেকিরং, সুকিরোং, কোকোরেহ, জামব্রুং, মালয়েশিয়ায় রুমপাক, জেন্ডাং-জেন্ডাং, ইন্দোনেশিয়ায় জাঙ্গজান, মাঙ্গাহুয়া, বাবাগুনি, কালারো, জাপানে কোতোহিকি, ইয়াগাটা-ইসাকি, কোরিয়ায় সাল-বেন-জা-রি, এনগা-হান্ন- কিয়াং, এনগা-গাই-কিয়ার, এনগা-নান-গায়ং, ফিলিপিন্সে দ্রেকে সাক, তসারাবাড়ো, আস্তসারবাড়ো ইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে সি ওং, সি সি কং, চীনে এক্স ল্যান ইন,
কেনিয়ায় নাগাগু, কৌরমৌ , কুরমনও, মাদাগাস্কারে সুমাহা, ওমানে বাআম, থিয়েব, ইয়াল্লি, ইয়ানাম, জিমজাম, দক্ষিণ আফ্রিকায় ডোরিংভিস, খংটাফোলাইখং ইন, কুই, এনগাগু নামে পরিচিত।
টেরাপন জার্বুয়া একটি মাঝারি আকারের মাছ, যার বন্টন সীমা বিস্তৃত। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড,  ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও জাপান পর্যন্ত মহাসাগর এবং ভূ-মধ্য সাগরে এই প্রজাতির মাছের হার বেশ ভাল রকমেই রয়েছে বলে জানান বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা জানান, বরগুনী মাছ সাধারণত: সমুদ্র থেকে মোহনার অগভীর পানিতে এসে এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময়ে প্রজনন করে থাকে। সামুদ্রিক জোয়ারে প্লাবিত হয়, এমন খালবিলে এদের রেণু থেকে পোনা ফোটে। এরপর পক্ষকাল থেকে ২৮ দিনের মধ্যেই এরা সাগরে চলে যায়। আকারে ১০ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে বরগুনী। সাধারণত: পুরুষ মাছের তুলনায় স্ত্রী প্রজাতির সংখ্যা হয় ৭/৮ গুণ বেশি। বরগুনী মাছের চঞ্চল পোনাগুলো ক্ষিপ্ত গতিতে ওজানের দিকে ধাবিত হতে পারে। এরা খাল ও সাগরের ২০ মিটার (প্রায় ৬৭ ফুট) গভীরতম এলাকাতেও বসবাস করে। একেকটি ডিম থেকে চার লাখের বেশি পোনা বের হয়। এরা সাধারণত: খাদ্য হিসাবে মাছ, পোকামাকড়, কৃমি, এলগি, প্রাণকণা (জু প্লাঙ্কটন), উদ্ভিদ কণা (ফাইটো প্লাঙ্কটন) এবং বালির ভেতরে বসবাসকারী অমেরুদন্ডী প্রাণীগুলো খেয়ে জীবন ধারণ করে। তবে এ মাছ ‘সর্বভুক’ বা অমনিভোরাস (Omnivorous) হিসাবেও তালিকাভূক্ত, আবার মাংশাসী (Carnivorous) হিসাবেও তালিকাভূক্ত।
বরগুনী একটি ‘ইউরিহেলাইন’ বা তীব্র লবণসহিষ্ণু প্রজাতির মাছ। এটি ১ পিপিটি (পানিতে লবণাক্ততা মাপার পরিমাপক বা পার্টস পার থাওজেন্ড) থেকে ৭০ পিপিটি পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। অথচ কক্সবাজার বঙ্গোপসাগরের পানির লবণাক্ততা থাকে সর্বনিম্ন ১৫ পিপিটি থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ পিপিটি। এটি সর্বভুক মাছ হওয়ায় পঁচাগলা জৈব বর্জ্য খেয়ে সাবাড় করে। ফলে বলা যায়, এটি উপকুলের পরিবেশের জন্য উপযুক্ত ও উপকারী মাছ। ফলে এ মাছটির ব্যাপকভাবে চাষ করা সম্ভব। এমনকি ছোট ছোট জলাশয়, ড্রাম বা এ্যাকুরিয়ামে। হ্যাচারিতে পোনা ফুটিয়ে ‘অর্নামেন্টাল ফিশ’ হিসাবে সারাবিশ্বে মাছটি বাজারজাত করে দেশের ব্লু-ইকনোমি তথা সমুদ্র সম্পর্কিত অর্থনীতিতে নতুন দুয়ার উম্মোচন করা সম্ভব বলে মনে করেন গবেষকরা।
আপনার মন্তব্য লিখুন
Top