দৃশ্যপট কক্সবাজার> মৃত্যুর আগে সবাই ছিলো, মরণে আসেনি কেউ!

Badi-20180530082511-1.jpg

দিসিএম ডেস্ক।।

জওশন আরা ও নুরুল ইসলাম। জওশন আরা ঢাকার একটি বেসকারি হাসপাতালে ও নুরুল ইসলাম কক্সবাজারের রামুর আইসোলেশন সেন্টারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। দুইজনই চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা।

জওশন আরা চকরিয়া উপজেলার পশ্চিম বড় ভেওলা ইউপির দরবেশকাটার জমিদার এনামুল হক চৌধুরীর স্ত্রী।

অপরজন নুরুল ইসলাম চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউপির পূর্ব নয়াপাড়ার বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপে চাকরি করতেন। কিন্তু শেষ বিদায়ে তাদের দাফন-কাফনে অংশ নেয়নি কেউ। তবে তাদের গোসল জানাজা ও দাফনসহ নানা কাজে পাশে দাঁড়িয়েছে চকরিয়ার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের পাঁচ সদস্য। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজের কাছ থেকে খবর পেয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করে লাশ দাফনের জন্য ছুটে যান যুবকেরা।

জওশন আরার দেবর চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শহিদুল্লাহ বলেন, জওশন আরা সন্তানদের সঙ্গে ঢাকায় থাকতো। কয়েকদিন আগে ওনার জ্বর হয়। পরে ১৪ জুন তিনি করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন। এতে তার করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। তবে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। এরমধ্যে ওনার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে গত বুধবার রাতে তাকে ঢাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরপর বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি ওই হাসপাতালে মারা যান। পরে রাতে তাকে চকরিয়ার নিজ গ্রামে নিয়ে আসা হয়।

তিনি আরো বলেন, লাশ নিজ গ্রামে আনা হলেও দাফনের জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তার আত্মীয়রা ইউএনওকে বিষয়টি অবহিত করেন। পরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের কয়েকজন যুবক এসে লাশের গোসল, জানাজা ও দাফন কাজ করেন।

শহিদুল্লাহ বলেন, জওশন আরার ছেলে-মেয়ে,পুত্রবধূ, মেয়ে জামাইসহ অনেক আত্মীয় রয়েছেন। তবে ছেলে-পুত্রবধূরা বাসায় কোয়ারেইন্টানে রয়েছেন। যার কারণে তারা কেউ আসেননি। তবে মেয়ে ও মেয়ের জামাইরা জানাজায় অংশ নিয়েছেন।

অপরদিকে, খটুখালীর নুরুল ইসলাম করোনায় মারা যাওয়ার সংবাদ পেয়ে এগিয়ে আসেনি তার কোনো আত্মীয়-পরিজন। লাশ দাফনের জন্য পাওয়া যাচ্ছিলো কোনো মানুষ। পরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের কয়েকজন যুবক গিয়ে ওই লাশ দাফন করেন।

নুরুল ইসলামের স্ত্রী রোকসানা আক্তার বলেন, চলতি মাসের ১১ তারিখ আমার স্বামীর জ্বর হয়। পরে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। ১৩ জুন তারা তার করোনার পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে। পরে তার করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে। এরপর তাকে রামু আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি হওয়ার পর তার ডায়রিয়া শুরু হয়। পরে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মারা যান।

তিনি আরো বলেন, আমার স্বামী করোনায় মারা যাওয়ার খবরে এলাকায় কেউ দাফন করার জন্য আসেনি। পরে চকরিয়া থেকে স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের কয়েকজন যুবক এসে আমার স্বামীর গোসল, জানাজা থেকে শুরু করে দাফন করিয়েছেন।

দাফন কাজে অংশ নেয়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চের তিন স্বেচ্ছাসেবক সৌরভ মাহাবী, সরওয়ার ইমরান নীল ও জায়েদ হোসেন নয়ন বলেন,  ইউএনও সৈয়দ শামসুল স্যারের কাছ থেকে জানতে পারি করোনায় মৃত দাফন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা লাশ দাফনের জন্য বের হয়ে পড়ি। বৃহস্পতিবার রাতে বয়ষ্ক নারীর  ও শুক্রবার সকালের দিকে এক ব্যক্তির লাশের গোসল, জানাজা শেষে দাফন কাজে সমাপ্ত করেছি। এতে আমাদের সঙ্গে ছিলেন চকরিয়া ইসলামি ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার মাওলানা আমির হোসেন ও হাফেজ মাহবুবুল আলম।

তারা আরো বলেন, স্বাধীন মঞ্চ বিভিন্ন সামাজিক কাজে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। করোনা মহামারি এ সময়ে লাশ দাফন আমাদের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দেখা গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর তার আত্মীয়-পরিজন কেউ পাশে থাকছে না। এসব কথা চিন্তা করে ইসলামি ফাউন্ডেশন ও স্বাধীন মঞ্চ যৌথভাবে করোনায় মৃতদের দাফনে কাজ করার সিদান্ত নেয়।

চকরিয়ার ইউএনও সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে দুইজনের লাশ দাফনের জন্য এলাকার কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে বিষয়টি ইসলামি ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার ও স্বাধীন মঞ্চের সদস্যদের জানানো হয়। তারা লাশ দাফনের কাজে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এদিন রাতে বয়োবৃদ্ধ নারী ও শুক্রবার সকালে এক ব্যক্তির লাশ দাফন করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top