১০ টাকা কেজি চালের তালিকায় আ.লীগ নেতার স্ত্রী-কন্যা ও স্বজন!

Presentation1-46.jpg

বাংলা ট্রিবিউন // দিসিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দরিদ্রদের ওএমএস কার্ডের তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী-কন্যাসহ এক ডজন স্বজনের নাম থাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পৌরসভা, খাদ্য বিভাগসহ জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

জানা যায়, কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের জন্যে সরকার বিশেষ ওএমএস সুবিধা চালু করেছে। আর এ জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে বিতরণ করা হয় ওএমএস কার্ড। তবে অভিযোগ উঠেছে, হতদরিদ্র, কর্মহীন ও গরিবের এই ওএমএস কার্ডেও ভাগ বসিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা! জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক, জেলা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি মো. শাহ আলম নিজের স্ত্রী ও মেয়ের নামসহ তার ১২ জন আত্মীয়ের নামে ওএমএসের কার্ড করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খাদ্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা সুবীর নাথ চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভিক্ষুক, ভবঘুরে, রিকশাচালক, চায়ের দোকানিসহ হতদরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা কোনও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদের জন্য বিশেষ ওএমএস সুবিধা চালু করা হয়। এই সুবিধায় প্রতিটি ওএমএস কার্ডধারী প্রতি মাসে ১০ টাকা কেজি দরে মোট ২০ কেজি করে চাল পাবেন। সেজন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা এলাকার ১২টি ওয়ার্ডে প্রথম দফায় ৬ হাজার এবং দ্বিতীয় দফায় মোট ৩ হাজার ৬০০ পরিবারসহ মোট ৯ হাজার ৬০০ জনকে ওএমএস কার্ড দেওয়া হয়।

এই কার্ডের জন্য পৌর এলাকার ১০ নম্বর ওয়ার্ডসহ পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রথম দফায় ৫০০ জনের তালিকা তৈরি করা হয়। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম দফার তালিকা অনুযায়ী ইতোমধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি করে চাল পেয়েছেন প্রতিটি ওয়ার্ডের তালিকাভুক্তরা।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের ওএমএস তালিকা থেকে জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক মো. শাহ আলমের পরিবার এবং স্বজনদের নাম ওএমএস কার্ডের এই তালিকায় রয়েছে।

.

বিতর্কিত তালিকা বিষয়ে নির্দেশনা

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন, তালিকা থেকে আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারসহ পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে যাচাই বাছাই করে মোট ৯১ জন সামর্থ্যবান ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার জন্যে খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে পৌর মেয়রকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা ওএমএস কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক হায়াত- উদ-দৌলা খান।

খাদ্য নিয়ন্ত্রক আরও বলেন, ‘পৌর এলাকার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ওএমএস ডিলার মো. শাহ আলম আমাদের তালিকাভুক্ত একজন ওএমএস ডিলার। দরিদ্রদের জন্য ওএমএস তালিকায় তার পরিবার-পরিজনের নাম থাকার কারণে জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে মো. শাহ আলমকে শোকজ করেছেন। আগামী দুই দিনের মধ্যে তাকে উত্তর দিতে বলা হয়েছে। উত্তর সন্তোষজনক না হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তালিকার ১৬ নম্বরে রয়েছে শাহ আলমের স্ত্রী মোছা. মমতাজ আলমের নাম। তালিকার ১২ নম্বরে রয়েছে তার মেয়ে আফরোজার নাম। তার তিন ভাইবোন মো. সেলিম, মো. আলমগীর ও শামসুন্নাহারের নাম রয়েছে ৮, ৯ ও ২৭ নম্বরে। অপর ভাই খোরশেদ মিয়ার ছেলে নাছিরের নাম রয়েছে ৭ নম্বরে, যদিও নাছির প্রবাসী। ৩ নম্বরে রয়েছে শ্যালক মো. তাজুল ইসলামের নাম। শ্যালকের স্ত্রী আসমা ইসলামের নাম রয়েছে তালিকার ৫ নম্বরে। অপর শ্যালকের স্ত্রী মোছা. জান্নাতুল ইসলামের নাম রয়েছে ১০ নম্বরে। বোনের তিন দেবর মতিউর রহমান, মাহবুবুর রহমান, লুৎফুর রহমানের নাম রয়েছে ৭২, ৭৩ ও ৭৪ নম্বর ক্রমিকে। অপর শ্যালক প্রবাসী শফিকুল ইসলামের নামও রয়েছে তালিকার ১৩ নম্বরে।

শহরের কাউতলী এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি পাঁচতলা বাড়ির মালিক আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলম গরিবের ওএমএস কার্ডে স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনদের নাম দেখে হতবাক দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দলের শীর্ষ মহল।

আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহ আলমের কাছে তালিকায় পরিবারের সদস্যদের নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এই বিষয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর বলতে পারবেন। তার তালিকা পৌরসভা যাচাই-বাছাই করে ফাইনাল করেছে। তাছাড়া আমি কোনও কার্ড বণ্টন করিনি। আমি একজন ডিলার। ডিলার কোনও কার্ড দিতে পারে না।

তবে ওএমএস কার্ডে বিত্তবানদের নাম থাকার বিষয়ে পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকবুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তার ওয়ার্ডের অধীন ওএমএস তালিকা করার জন্যে শহরের কান্দিপাড়া, কলেজপাড়া ও কাউতলী মহল্লাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। কাউতলী উত্তর এলাকার তালিকাটি করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলমের বড় ভাই সাঈদুর রহমান। তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তালিকাটি তিনি যাচাই-বাছাই না করেই পৌরসভায় জমা দিয়েছেন। এটি ভুল হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মোট ১৫ হাজার ভোটারের মধ্য থেকে তালিকা প্রণয়ন করা জটিল একটি বিষয়। তাই সঠিকভাবে করতে গিয়ে কিছুটা হেরফের হতে পারে। তালিকা যাচাই-বাছাই চলছে।

.

 

বিতর্কিত তালিকা বিষয়ে নির্দেশনা

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার মেয়র নায়ার কবির জানান, জেলা প্রশাসকের পাঠানো বিতর্কিত ৯১ জনের তালিকা ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি পৌরসভার ইস্যু করা সব কার্ড পৌরসভার পক্ষ থেকে ফের নিরীক্ষণের জন্য কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল পৌরসভায় বৈঠক ডাকা হয়েছে। কাউতলী এলাকার দায়িত্বে থাকা ১০ নম্বর ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলরকে ডাকা হয়েছে। তার কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ- দৌলা-খান বলেন, ইতোমধ্যে পৌরসভার মাধ্যমে ওএমএস-এর ৬ হাজার কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭ জন, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ১ জন, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৮ জন, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ২ জন, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ জন, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৬ জন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২ জন, ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ২২ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ১৯ জনসহ মোট ৯১ জন সামর্থ্যবান ব্যক্তির নাম তালিকায় এসেছে। এক পরিবার থেকে ১২ জনের নাম এসেছে। তিনি কাউতলী এলাকার ওএমএস ডিলার মো. শাহ আলম। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর আমারা তাকে শোকজ করেছি। দুই দিনের মধ্যে তাকে এ বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে। সন্তোষজনক উত্তর না পেলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, কারও দলীয় পরিচয় বড় বিষয় নয়। যাদের তালিকা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা যদি যথাযথ ব্যক্তিদের এড়িয়ে তাদের পছন্দের লোকদের নাম দেন সেটি দুঃখজনক। এতে সরকারের উদ্দেশ্য ও সাধারণ মানুষের উপকার সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top