করোনা কারও জন্য শিক্ষা, কারও জন্য অভিশাপ

IMG_20200407_013054.jpg

বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে, স্মার্টফোনের কল্যাণে সারা পৃথিবী যখন আমাদের হাতের মুঠোয়। যখন টেকনোলজির উন্নয়নে অনেক জটিল, কঠিন কাজ খুবই সহজে সম্পন্ন করা যায়। যখন স্মার্টফোন ও চতুর্থ প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা সহজলভ্য হওয়ায় প্রতি ঘরে ঘরে এখন ইন্টারনেট, ওয়াই-ফাই সংযোগ। যখন ভার্চুয়াল জগত নিয়ে বর্তমান যুব সমাজ দিশেহারা, চাইলেও সহজে এ ভার্চুয়াল জগত থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। যখন স্মার্টফোন বিহীন লাইফ এখনকার যুগে ইম্পসিবল। যখন সব বয়সের মানুষ নেট দুনিয়া নিয়ে রাতদিন মাতোয়ারা। যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো ছাড়া লাইফ কল্পনা করা যায় না। যখন পশ্চিমা দেশ গুলোর মতো যুব সমাজ পর্নোগ্রাফির করাল গ্রাসে আক্রান্ত, তা থেকে বেঁচে থাকা কঠিন। যখন পশ্চিমা মেয়েদের মতো শর্ট ও আঁটসাঁট পোশাকে নারী সমাজ প্রতিযোগিতায় মগ্ন। ঠিক তখন একজন সৎ ব্যক্তি, সৎ পথে চলতে প্রতি নিয়ত হাজারো বাধার সম্মুখিন হয়।

বর্তমান পৃথিবীর চিত্র:
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে ঢুৃকলেই বিভিন্ন অশ্লীল এ্যাড সামনে ভেসে আসে। নগ্ন এ্যাড গুলো দেখতে না চাইলেও বিভিন্ন কলা-কৌশলে ডিসপ্লে করা হচ্ছে। ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অর্ধ-উলঙ্গ বিভিন্ন নর্তকীর ছবি ও ভিডিও ক্লিপস। টুইটার, ফেসবুক, শেয়ারইট, ভিগু লাইভ, টিকটক, লাইকী ও আরও অন্যান্য এ্যাপস এর মাধ্যমে অশ্লীলতাকে প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিচ্ছে। যুব সমাজকে পর্ণোগ্রাফির দিকে ঠেলে দিতে ঐ অশ্লীল এ্যাড ও এ্যাপস গুলোর যথেষ্ট ভুমিকা রয়েছে। ইয়াহুদী ক্রিস্টানরা সারা পৃথিবীতে শান্তির নামে অশান্তি সৃষ্টি করে মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করে যাচ্ছে। তারা এক দিকে শান্তির কথা বলছে, অন্য দিকে বিভিন্ন উস্কানি দিয়ে মুসলিম দেশ গুলোকে একে অপরের শত্রু বানিয়ে যুদ্ধ লাগিয়ে দিচ্ছে। ফলে লাখ লাখ মুসলমান আহত-নিহত হচ্ছে। মুসলিম দেশ গুলোই তাদের প্রধান টার্গেট। মুসলিম জাতিসমূহকে নৈতিকতার অধঃপতন ঘটিয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আজ আমরা কাপড় পড়া মুসলিম জাতি বটে, কিন্তু আমাদের মন মস্তিস্ক পশ্চিমারা নগ্ন করে নৈতিকতার চরম অধঃপতন ঘটিয়ে মুসলিম সমাজের কবর রচনা করতে সক্ষম হচ্ছে। পাপাচার, জুলুম- নির্যাতনে জর্জরিত আজ মুসলিম জাতি। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বর্তমানে মুসলিম সমাজ গুলোতে নেই কোন নৈতিকতার বালাই, নেই কোন আদর্শ, নেই জীবনের সঠিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। পুরো পৃথিবীটা যেন আজ উন্মাদের ভুমিকায় অবতীর্ণ ।

এমন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে মহান সৃষ্টিকর্তা করোনা ভাইরাস নামক এক মহামারীর মাধ্যমে সেই নগ্ন মানব সভ্যতাকে পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে দিয়ে নতুন সভ্যাতার আবির্ভাব ঘটাতে চান। উলঙ্গপনার করাল গ্রাস থেকে মানব সভ্যাতাকে বের করে আনতে চান। নগ্ন জাতিকে সভ্যতায় পরিপূর্ণ করে তুলতে চান। সৃষ্টিকর্তার এ মরণঘাতি করোনা ভাইরাস কিছু জাতির জন্য অভিশাপ ও আসমানি গজব হিসেবে এসেছে। কুলুষিত মানবতার একটি অংশ হয়তো শেষ করে দিয়ে অবশিষ্ট মানবজাতিকে পরিশুদ্ধ করবেন। ভবিষৎ প্রজন্ম যাতে শিক্ষা গ্রহণ করে।

আজ পশ্চিমাদের অশ্লীলতা ও উলঙ্গপনার প্রদর্শনী কোথায়? আঁটসাঁট পোষাকে অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় বের হতে এখন কেন দেখা যায় না? সামান্য করোনা নামক অনুজীবের ভয়ে বড় বড় শহর, রাস্তা-ঘাট, শিল্প প্রতিষ্ঠান মানব শুণ্য।
পুরো পৃথিবী আজ বিনা যুদ্ধে পরাজিত। সামান্য অনুজীবের কাছে মানবসভ্যতা আজ খুব অসহায়। মরণঘাতি এ ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাবস ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে পুরো শরীর প্রোটেকশনের জন্য পিপিই ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা চাইলে কি না পারেন! পৃথিবীর নগ্ন জাতিসমূহক পিপিই’র মতো পোষাকে আবৃত করতে বাধ্য করছেন। কোথায় আজ তোমাদের নগ্নতা? নিশ্চয়ই তোমাদের নগ্ন সংস্কৃতি পরাজয় বরণ করেছে।

এবার চলুন, আমাদের চারিত্রিক অবস্থান কোথায় দেখা যাক:
আমরা কেউ আজ এ কথা বলতে পারি না যে, আমরা বা আমাদের দেশ আসমানি আল্লাহর কোনো আজাব থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। পৃথিবীতে অন্যায় কৃতকর্মের মাত্রা আজ এতটাই ছাড়িয়েছে যে, পুরো শরীর যেন পাপে ভরপুর। আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরি যাই করি না কেন সব কিছুতেই যেন অসৎকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। এমনকি মুখে যা বলছি তাও মিথ্যা বলছি, আল্লাহর ভয়ে দুই রাকাআত যে নামাজ আদায় করছি সেখানেও দুনিয়ার চিন্তায় মগ্ন, কখন নামাজ শেষ করব আর কখন মসজিদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাবো এ চিন্তায় মগ্ন।

কেন সৃষ্টিকর্তা এ মহামারী ও আসমানি গজব পাঠান:
মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা পৃথিবীতে কেন আজাব অথবা গজব পাঠান সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন কিন্তু আমরা তারপরেও উদাসীন। আমরা একের পর এক রোগব্যাধি ও আসমানি আজাবের সম্মুখীন হচ্ছি এর মূল কারণ হলো- আমাদের কৃতকর্মই এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ডেকে আনছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন- ‘মানুষের কৃতকর্মের জন্যই স্থলে ও জলে বিশৃঙ্খলা ছেয়ে গেছে। এর পরিণামে তিনি তাদের কোন কোন কর্মের শাস্তির স্বাদ তাদের ভোগ করাবেন, যাতে তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।’ (সুরা রূম : আয়াত ৪১)

আমাদের পাপ যখন সর্বত্র ছেয়ে যায়, তখন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ- করোনা ভাইরাসের আক্রমণ বলুন বা ঘূর্ণিঝড় সিডর, ফণি বা ভূমিকম্প সবটাই মূলত আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে মানবজাতিকে সতর্ক করার সংকেত। আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করে, সহজ-সরল ও সঠিক পথের সন্ধান দিতে চান।

সমাজে যখন অধিকাংশ মানুষ পাপাচার, অন্যায়, অপকর্মে লিপ্ত থাকে এবং নিজ প্রভুকে ভুলে যায় তখনই আল্লাহ তা’আলা তার পক্ষ থেকে কঠিন কঠিন শাস্তি হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ পাঠিয়ে মানুষকে একথা স্মরণ করে দেন যে, সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন, তাঁর আজাব-গজব থেকে তোমরা সাবধান হওয়ার চেষ্টা করো। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন- ‘আর তোমাদের কৃতকর্মের কারণই তোমাদের ওপর বিপদ নেমে আসে। অথচ তিনি অনেক কিছুই উপেক্ষা করে থাকেন।’ (সুরা শুরা : আয়াত ৩০)

কালের বিবর্তনে মানব প্রকৃতি বিকৃত হওয়ার কারণে আল্লাহর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারী গুলোও বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি স্বরূপ যখন মানুষের নিকট কোনো আজাব আসে, তখন তা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো রাস্তা থাকে না। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা উল্লেখ করেছেন-
‘তুমি বল, আল্লাহর হাত থেকে কে তোমাদের রক্ষা করতে পারে, যদি তিনি তোমাদের কোনো শাস্তি দিতে চান? অথবা তিনি যদি তোমাদের প্রতি কৃপা করতে চান তবে কে এ থেকে তোমাদের বঞ্চিত করতে পারে? আর তারা নিজেদের জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন অভিভাবক বা কোন সাহায্যকারীও খুঁজে পাবে না’ (সুরা আহজাব : আয়াত ১৭)

দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আমরা পবিত্র কুরআনের সে শিক্ষাকে অমান্য করেই যাচ্ছি। আমাদের সবার একটি বিষয় অনুধাবন করা উচিৎ যে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক কেন বার বার আজাবের কথা উল্লেখ করলেন? তা এ জন্যে যে, আমরা যেন সব ধরনের আজাব বা ব্যাধি থেকে রক্ষা পাই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এ ধরনের মহামারী থেকে আল্লাহর দরবারে পানাহ চাওয়ার দোয়াও শিখিয়ে গেছেন-
‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাছি ওয়াল জুনুনি ওয়াল ঝুজামি ওয়া মিন সায়্যিয়িল আসক্বাম।’

প্রিয় পাঠক!
সারা পৃথিবীতে একের পর এক ঘটনা ঘটছে আর হাজার-হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, এর একটাই কারণ, তা হলো- আল্লাহর গোলামরা আজ তার সৃষ্টিকর্তাকে ভুলতে বসেছে। আর এ সকল আসমানি আজাব থেকে রক্ষার জন্য একটি মাত্র পথ তা হলো- মহান আল্লাহর প্রকৃত গোলামে পরিণত হওয়া, আল্লাহর অধিকার এবং মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজে সংশোধন হওয়া এবং নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলুন। ঘরে থাকুন, নিরাপদ ও সতর্ক অবস্থানে থাকুন।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের বার বার সতর্ক করছেন তারপরেও যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে আমরাও সে আদ ও সামুদ জাতি ও অন্যান্য জাতিদেরকে যেভাবে তাদের অপকর্মের জন্য আল্লাহপাক ধ্বংস করেছেন, আমাদের পরিণতিও কি তাদের অনুরূপ হবে না তো? তাই সময় থাকতে আমাদের দোষত্রুটির জন্য পরিপূর্ণভাবে আল্লাহপাকের কাছে তওবা করি। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তাঁর প্রাকৃতিক সকল দুর্যোগ থেকে নিরাপদ রাখুন। সুস্থ রাখুন।

লেখক: এম এ মাসুদ
ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার ও
ম্যানেজিং ডিরেক্টর
আইডিয়াল প্রিন্টার্স
কক্সবাজার।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top