আমাদের হাসান মুরাদ

7819_me.jpg

আজিম নিহাদ :

ক’দিন আগেও পর্যটন শহরে খুব একটা চেনা ছিলনা হাসান মুরাদ নামটি। উনিশের তারুণ্য শক্তিতে যারা ক্রিকেট বিশে^র পরাশক্তিকে বধ করে বাংলাদেশকে বিশ^জয়ী করেছেন হাসান মুরাদ এখন তাদের একজন। এদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম অংশীদার। সমুদ্র শহরের গর্বের ধন।
জুনিয়র টাইগার দলের সদস্য হাসান মুরাদ বীরের বেশে ঘরে ফিরছেন তাই উৎসবের আমেজ ছিল পর্যটননগরী কক্সবাজারে। শহরের সড়কে সড়কে হাসান বন্দনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বৃহস্পতিবার ঘটির কাটা চারটায় পৌঁছানোর আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরে শুরু হয় উপচে ভীড়। বিশ^কাপ ছিনিয়ে ঘরের ছেলে ফিরছেন তাই বরণে ছিল বর্ণাঢ্য প্রস্তুতি। বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছলে হাসান মুরাদকে সংবর্ধনা দেয় জেলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা আম্পায়ার এসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং আপামর জনতা।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ^কাপে এবারের আসরে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইলে চমক দেখিয়েছেন হাসান মুরাদ। খুব কম রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন তিনটি উইকেট। তার এই গুরুত্বপূর্ণ উইকেটগুলো দলকে বিজয়ের বন্দরে নোঙর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আত্মবিশ^াস বাড়িয়ে দেয় দলকে।
বিমানবন্দরে সংবর্ধনার পর হাসান মুরাদকে নেওয়া যাওয়া হয় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে। সেখানে তাকে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। কেক কেটে, মিষ্টি খাইয়ে সংবর্ধিত করেন সমুদ্র শহরের এই কৃতি খেলোয়াড়কে। এসময় জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুমি কক্সবাজারবাসীর গর্ব। আগামীতে দেশের হয়ে আরও গৌরব বয়ে আনতে হবে। সমগ্র কক্সবাজারবাসী তোমার সাথে আছে।’ এসময় হাসান মুরাদের অসুস্থ বাবাকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ারও আশ^াস দেন জেলা প্রশাসক এবং পারিবারিক অবস্থার খোঁজ খবর নেন।
জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ফিরে যান নিজের এলাকা লিংকরোডে। বিমানবন্দর সড়ক থেকে লিংকরোড পর্যন্ত সড়কজুড়ে এক পলক বিশ^জয়ী ঘরের ছেলেকে দেখার উৎসুকে থাকা জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়ে সাড়া দেন মুরাদ। এসময় তার গাড়িবহরে যুক্ত ছিল শত শত মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন গাড়ি।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার ঠিক আগমুহুর্তে লিংকরোডে পৌছেন হাসান মুরাদ। এসময় তাকে ঘিরে উৎসুক জনতার ঢল নামে সেখানে। উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয় এলাকাজুড়ে। যে ছেলেকে চোখের সামনে বড় হতে দেখেছেন, যারা তার দীর্ঘদিনের বন্ধু-সহপাঠী তারাও এক পলক দেখতে আসেন মুরাদকে। এ যেন অন্য এক মুরাদ। যে কিনা বছর তিনেক আগেও অন্য দশজনের মত ছিল সবার কাছে, সে আজ ভীষণ স্পেশাল। যেমন-তেমন কথা নয়, তাদের ছেলে ক্রিকেট বিশে^র শক্তিধর ভারতকে পরাজিত করে বাংলাদেশকে বিশে^র কাছে অন্য এক পরিচয় এনে দেওয়া টাইগার দলের সদস্য।
মাশরাফি-সাবিকরা যখন বার বার তীরে এসে তরী ডুবায়, সেখানে হাসতে হাসতে বাংলাদেশকে জয়ের মুকুট এনে দিয়েছেন আকবর আলী-হাসান মুরাদরা। তাই ইতিহাসের কাছে আকবর আলী-হাসান মুরাদরা উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।
ঘরের ছেলে ইতিহাসের অংশীদার হওয়ায় গর্বিত কক্সবাজারবাসী। লিংকরোডে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে খুশিতে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন ঝিলংজা ইউপি চেয়ারম্যান টিপু সুলতান। তিনি বলেন, হাসান মুরাদ এখন শুধু কক্সবাজারের নয়, সারাদেশের গর্ব। মুমিনুল হকের পর হাসান মুরাদ কক্সবাজারকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। আগামীতে মূল দলের বিশ^কাপ বিজয়েও সমুদ্র শহরের সন্তান হাসান মুরাদ নেতৃত্ব দিবেন বলে আশাবাদী তিনি।
সন্তানের এমন অর্জনে বাবার অনুভূতি জানতে চাইলে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে মুরাদের বাবা নাজির হোসেনের। চোখের এ জল শোকের নয়, ছেলের অবিশ^াস্য সাফল্যের।
তিনি বলেন, ছেলের খেলাধুলা দেখে সব সময় আত্মবিশ^াসী ছিলাম। কিন্তু এটুকু বয়সে বিশ^কাপ ছিনিয়ে আনবে, তা কল্পনাতেও ছিল না। মনে হচ্ছে, এই মুহুর্তে আমার চেয়ে গর্বিত পিতা পৃথিবীতে আর নেই। ছেলে মুরাদসহ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সবার জন্য দোয়া এবং সাফল্য কামনা করেন তিনি।
হাসান মুরাদের মা রাশেদা বেগমও ছেলের সংবর্ধনা দেখে খুশিতে আত্মহারা। তিনি জানান, মুরাদ ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট পাগল ছিল। তবে পড়াশোনাতেও বেশ মনোযোগ ছিল। সেই ছোট্ট ক্রিকেট পাগল ছেলেটা আজ বিশ^কাপ জিতে ঘরে এসেছে। আমি গর্বিত যে, হাসার মুরাদ আমার ছেলে।
হাসান মুরাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় অনুভূতির কথা। তিনি বলেন, আমরা শুরু থেকেই আত্মবিশ^াসী ছিলাম। শেষদিন যখন ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলাম সেদিন সকালে জয়ের আত্মবিশ^াস আরও বেড়ে যায়। দলে বোলিং. ব্যাটিং ও ফিল্ডিং তিনটিই ছিল দারুণ। আকবর আলীর দক্ষ নেতৃত্বে মাঠে সবার একটাই লক্ষ্য ছিল বিশ^কাপ বিজয়ের। অবশেষে দেশের লাখো-কোটি মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা আর দোয়ায় আমরা পেরেছি বিশ^কাপ জয় করতে। দেশের মানুষের সমর্থন এবং উচ্ছ্বাস দেখে আপ্লুত তিনি।
হাসান মুরাদ জানান, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া একজন ক্রিকেটারের জন্য সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। জাতীয় দলে সুযোগ পেলে ইনশাআল্লাহ অনূর্ধ্ব-১৯ এর মতো বিশ^কাপ এনে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top