মুক্তিযুদ্ধের গল্প

পাথরের মূর্তির মতো

-মূর্তির-মতো.jpg

‘আপনাদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিচারটি ঠিক হয়নি।’

চমকে উঠলেন খালিদ। মাঝবয়সী এক মহিলা। পরনের মলিন ও প্রায় বিবর্ণ শাড়ি-ব্লাউজ আর পাদুকাবিহীন পায়ের দিকে তাকিয়ে দীনহীন বলেই মনে হয়। আবার চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা, কানে হিয়ারিং আর কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতনি ঝোলার দিকে তাকিয়ে কিছুটা সমীহও জাগে। খালিদ কিছুটা বিভ্রান্ত, অর্থাৎ এই ভদ্রমহিলার সামাজিক অবস্থানটা নির্ণয় করতে পারছেন না। পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘ঠিক হয়নি মানে? কী করে বুঝলেন যে বিচার ঠিক হয়নি?’

‘সবগুলো ছবি প্রদর্শনীতে দেওয়া হয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এখানে সেরা ছবিটাকেই তো পুরস্কার দিলেন না। যে ছবিটার প্রথম পুরস্কার পাওয়ার কথা, সেটিকে কোনো পুরস্কারই দেওয়া হলো না। ঠিক হয়নি, এটা একেবারেই ঠিক হয়নি…।’

মেজাজটা বিগড়ে গেল খালিদের। এ রকম ছোটখাটো একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিচারক হয়ে তাঁর আসার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু শহরের নামী এই স্কুল ও কলেজে একসময় তাঁর পুত্র-কন্যা পড়েছে, তার ওপর কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ একসময় তাঁর সহপাঠী ছিলেন। তাঁর অনুরোধ ফেলতে না পেরে এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে এসেছেন। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে—এই প্রবাদটি বোধ হয় মনে ছিল অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের। তাই একজন শিল্পীকে পেয়ে চারুকলার দুজন তরুণ শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিচারক প্যানেলে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ঢোক গিলে রাজি হয়েছিলেন। শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিষয় ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ।’

সবই ঠিক আছে, কিন্তু এই মহিলার আক্রমণাত্মক মন্তব্যটি অস্বস্তিতে ফেলে দিল তাঁকে। এড়িয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু মহিলার চেহারায় বিশেষ কিছু একটা আছে। সম্ভবত তাঁর চোখ দুটি। ঘোলা কাচের আড়াল থেকে তাঁর তীব্র দৃষ্টিকে এড়ানো যায় না। বিরক্ত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘আপনার কেউ কি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে?’

ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমার কেউ মানে?’

‘মানে, আপনার নিজের বা আত্মীয়-স্বজনের ছেলে-মেয়ে কেউ কি ছবি জমা দিয়েছে?’

‘না।’

‘তাহলে কে প্রথম পুরস্কার পেল, কে পেল না তাতে আপনার কী সমস্যা?’

‘এটা আপনি কী বলছেন স্যার, আত্মীয় না হলে একজন ব্রিলিয়ান্ট শিল্পীর পক্ষে, একটা ভালো ছবির পক্ষে কথা বলা যাবে না?’

ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়েই আছেন তাঁর সামনে। মহাবিপদে পড়া গেল। অনুষ্ঠানের আয়োজকেরাও এখন কেউ এদিকটায় নেই যে কেউ একজন তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যাবেন। অগত্যা খালিদ বললেন, ‘বিচারক তো আমি একা নই, আপনি অন্য বিচারকদের গিয়ে বলেন…।’

‘অন্যদের বলে কী হবে? সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদই যদি সেরা ছবিটাকে চিনতে না পারেন, অন্যরা পারবে?’

মহিলার মুখে বংশের পদবিসহ পুরো নামটা শুনে খানিকটা বিস্মিত খালিদ, ‘আপনি আমাকে চেনেন?’

‘কেন চিনব না? আপনি ‘‘অপরাজেয় বাংলা’’র ভাস্কর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আপনার তিন মুক্তিযোদ্ধা…আপনাকে চিনব না!’

উদাসীন প্রকৃতির মানুষ হলেও নিজের প্রশংসা শুনে খুশি না হওয়ার মতো নির্লিপ্ততা এখনো রপ্ত করতে পারেননি খালিদ। তিনি প্রফুল্ল ­চিত্তে কথোপকথন আরও একটু চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন, ঠিক এ সময়ে, এতক্ষণ যাঁদের টিকিটির দেখা নেই, সেই আয়োজকদের দুজন এসে হাজির। তাঁরা জানতে চাইলেন স্যার চা খেতে চান কি না। খালিদ না বলে মাথা নেড়ে তাঁদের বিদায় জানাতে চাইলে, তাঁরা যাওয়ার সময় ভদ্রমহিলাকেও তাঁর সামনে থেকে সরিয়ে দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু খালিদ নিরস্ত করলেন তাঁদের। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ভদ্রমহিলাকে বললেন, ‘চলুন তো দেখি, কোন ছবিটির কথা বলছেন আপনি…।’

ভদ্রমহিলার চোখমুখ উদ্ভাসিত হলো। তিনি শিল্পীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন পর্দাঘেরা চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনী কক্ষের দিকে। প্রতিযোগিতায় জমা পড়া শ খানেক ছবির মধ্য থেকে বাছাই করা ২০টির মতো ছবি ঝোলানো হয়েছে প্রদর্শনীতে।

‘এই ছবিটা। দেখুন, ছবিটা দেখুন…।’ ভদ্রমহিলা নিজের বিস্ময় যেন সঞ্চারিত করতে চান খালিদের মধ্যে।

খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখলেন আবদুল্লাহ খালিদ। মহিলা উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তাঁর মুখের দিকে, অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছেন।

 ‘এ রকম একটা ডিসপ্রোপোরশনেট ছবিকে পুরস্কার দেওয়া উচিত ছিল বলছেন?’

‘ডিসপ্রোপরশনেট?’—বিস্মিত হলেন মহিলা।

 ‘নয়তো কী? শেখ মুজিবের পুরো ফিগারটা আঁকা হয়েছে ছয় বা সাত ইঞ্চি, আর উঁচু করে তুলে ধরা তাঁর হাতটা এক ফুট বা তার চেয়েও বেশি…কোনো সামঞ্জস্য আছে?’ এবার ঠোঁটে একটু ঠাট্টার হাসি ঝুলিয়ে বললেন, ‘হাতটা তো আকাশের ওপর উঠে গেছে, আর সূর্যটা যেন আঙুলের ডগায়…অদ্ভুত।’

‘এটাকে অদ্ভুত বলছেন স্যার? ওই হাতটা এইভাবে আকাশে উঠে না গেলে, ওই আঙুলটা সূর্য স্পর্শ না করলে এই দেশটা স্বাধীন হতো?’

সারা শরীর যেন ঝাঁকুনি খেল খালিদের। ভদ্রমহিলার বলার ভঙ্গিতে বা একজন সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে একটি ছবিকে নতুনভাবে দেখার দৃষ্টি খুঁজে পেয়ে অন্য রকম এক অনুভূতি হলো তাঁর। বিষয়টা এ রকম করে ভাবেননি বলে নিজেকে একটু ধিক্কারও দিলেন যেন। বিনীত ও কিছুটা বিব্রত কণ্ঠে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি দেখছি কী করা যায়।’

‘ধন্যবাদ।’—ধীর পায়ে তাঁর সামনে থেকে সরে গেলেন ভদ্রমহিলা।

ছবি প্রদর্শনীর কক্ষ থেকে ফিরে আবার মাঠের শামিয়ানা টাঙানো অংশে এসে একটা চেয়ার টেনে বসলেন খালিদ। উদ্যোক্তাদের একজন এসে আবার জানতে চাইলেন চা খাবেন কি না। এবার মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। তরুণটি সম্ভবত এই স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, দ্রুত ছুটে গিয়ে চায়ের বদলে একটি পুরু কাগজের কাপে পরিমাণমতো দুধ–চিনি দেওয়া মেশিনে তৈরি কফি নিয়ে হাজির হলেন। চা হোক বা কফি, দুধ-চিনি ছাড়া খেতে পছন্দ করেন খালিদ। কিন্তু এখন বিরক্তি প্রকাশ করলেন না।

‘আপনি কি এই স্কুলে পড়ান?’

‘জি, না মানে আমি কলেজের শিক্ষক। আমার নাম হুমায়ুন কবির।’

‘কোন সাবজেক্ট?’

‘কেমিস্ট্রি।’

‘ভালো। আচ্ছা, আপনি ভদ্রমহিলাকে চেনেন? এই যে একটু আগে আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন?’

‘জি চিনি, কিছু মনে করবেন না স্যার, উনি একটু পাগল গোছের। ওঁর নাম রমা চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের সময়…।’

প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন খালিদ, ‘রমা চৌধুরী? উনি রমা চৌধুরী?…আরে আমি তো চিনতেই পারলাম না, উনি কি চলে গেছেন?’

‘আছেন বোধ হয় মাঠের কোথাও, আমি দেখছি স্যার…ডেকে আনব?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, প্লি­জ, আমি একটু কথা বলতে চাই।’

এতক্ষণ রমা চৌধুরী কথা বলছিলেন তাঁর সঙ্গে! পত্র-পত্রিকায় এঁর সম্পর্কে পড়ে খুব ইচ্ছা ছিল একদিন দেখা করবেন। চট্টগ্রাম শহরেই থাকেন, এত কাছে থেকেও এ রকম একজন নারীর সঙ্গে একবার আলাপ-পরিচয় হলো না বলে কতবার আফসোস করেছেন মনে মনে। আজ চোখের সামনে দেখেও চিনতে পারলেন না! পত্রিকায় দু–একবার ছবিও ছাপা হয়েছে, তাই চেহারাটা খুব চেনা লাগছিল, কিন্তু শেষতক সামনাসামনি দেখেও চিনতে পারলেন না। অন্তত পাদুকাবিহীন দুটি খালি পা দেখেও তো চিনে ফেলতে পারতেন।

বিস্ময়কর একটা জীবন রমা চৌধুরীর। সেই ১৯৬১ সালে, যখন এ দেশে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র মেয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পেত, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেছিলেন। এত বড় প্রতিষ্ঠানের বড় ডিগ্রি নিয়েও শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন নিজের গ্রাম বোয়ালখালীর একটি স্কুলে। বিয়ে করে স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসারও করেছিলেন গ্রামেই। কিন্তু ১৯৭১ সাল তছনছ করে দিয়েছিল সবকিছু। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাড়ি আক্রমণ করেছিল পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারেরা। সেনাদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন রমা। তার আগেই বউ-বাচ্চাকে ফেলে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী।

দেশ তো স্বাধীন হলো। কিন্তু তারপর শুরু হলো রমার একার যুদ্ধ। স্বামী আর গ্রহণ করেননি তাঁকে। আত্মীয়স্বজনের কাছে ঘৃণা ও উপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই পাননি। বাবাকে হারিয়েছিলেন তিন বছর বয়সে। পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। তীব্র ঝড়ের মুখে একটি প্রদীপ শিখার টিকে থাকার কী অদম্য সংগ্রাম! দুঃসময় তো একা আসে না, রমার ওপর সময়ের নির্মম আঘাত নেমে এসেছিল একের পর এক। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো, সেই একই বছর ২০ ডিসেম্বর নিউমোনিয়ায় মারা গেল বড় ছেলে সাগর। এই শোক সামলে ওঠার সময়ই হলো না, মাত্র এক মাস ২৮ দিনের মাথায় মারা গেল ছোট ছেলে টগরও। দুটি ছেলের লাশ হিন্দুপ্রথা অনুযায়ী দাহ করেননি। কবর দিয়েছিলেন। তাই বাকি জীবন আর কখনো এই মাটির ওপর জুতো পরে হাঁটেননি রমা চৌধুরী।

আশ্চর্য, একটি সমীহ জাগানো চেহারার ভদ্রমহিলা কেন খালি পায়ে?—এই প্রশ্নটাই তো তাঁকে চিনে নেওয়ার সূত্রটা ধরিয়ে দিতে পারত। কেন দিল না এটা ভেবে প্রবল আফসোস ও বিরক্তিতে নিজে নিজেই মাথা নাড়ছিলেন খালিদ, ঠিক তখনই কেমিস্ট্রির শিক্ষক হুমায়ুন এসে জানালেন ‘কোথাও পেলাম না, উনি বোধ হয় চলে গেছেন, স্যার…।’

কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন তরুণের দিকে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কী আর করা।’

তরুণ শিক্ষক বললেন, ‘পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আধ ঘণ্টার মধ্যে শুরু হবে, স্যার। আপনি কি প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে বসবেন?’

‘আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে থাকা আমার আর সম্ভব হচ্ছে না। আপনি কাইন্ডলি প্রিন্সিপাল সাহেবকে জানিয়ে দেবেন।’—বলেই হাঁটতে শুরু করেছিলেন খালিদ।

‘আমি কি গাড়ি পর্যন্ত আপনাকে এগিয়ে দেব, স্যার?’

‘না না দরকার নেই, আমি যেতে পারব।’

অনুষ্ঠানের উদ্বোধক সমাপনী পর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা না করে হঠাৎ অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এ রকম একটি পরিস্থিতিতে তাঁর কী করার আছে ভেবে না পেয়ে হুমায়ুন অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলেন স্যারের গমনপথে। কয়েক কদম হেঁটে গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়লেন শিল্পী, হাত তুলে ডাকলেন হুমায়ুনকে। হুমায়ুন কাছে যেতেই বললেন, ‘আমার সঙ্গে একটু চিত্র প্রদর্শনী কক্ষে যেতে পারবেন?’

‘নিশ্চয়ই স্যার, কেন পারব না, আসুন…।’

‘এই ছবিটাকে…’ প্রদর্শনী কক্ষের ভেতর একটি ছবি দেখিয়ে আবদুল্লাহ খালিদ বললেন, ‘এই ছবিটাকে একটা বিশেষ পুরস্কার দিতে বলবেন। আমাদের বিচারটা ভুল হয়ে গেছে। দিস পেইন্টিং ডিজার্ভস দ্য ফার্স্ট প্রাইজ। যা-ই হোক, যা হওয়ার হয়েছে, এখন অন্য দুই বিচারককে বলবেন, আমি এটাকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি। ঠিক আছে?’

‘জি, ঠিক আছে বলব স্যার।’

মাথা ঝুঁকিয়ে ধীর পায়ে মাঠের সবুজ ঘাসের ভেতর পায়ে হাঁটা যে সরু মেঠোপথ, সেই পথ ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেটের দিকে চলে গেলেন শিল্পী। রাস্তায় এসে একটা অটোরিকশা ডাকবেন বলে এদিক–ওদিক তাকাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের মতো আইসক্রিম চুষছেন রমা চৌধুরী। তাঁকে দেখে একগাল হাসলেন, চুরি করে খেতে গিয়ে ধরা পড়ার হাসি।

‘আপনি কোন সময় বেরিয়ে এলেন বুঝতেই পারিনি, আপনাকে খুঁজছিলাম…।’

‘আমাকে? কেন?’—বিস্মিত রমা চৌধুরী।

‘আসলে আমি না প্রথমে আপনাকে চিনতেই পারিনি। পরে যখন চিনলাম…।’

‘আমাকে চেনার কী আছে, আমি তো আপনাদের মতো বিখ্যাত মানুষ না, স্যার।’

‘না না দিদি, আপনি অনেক বড় মানুষ। এই দেশটার জন্য আপনাদের ত্যাগ…।’—আবেগাক্রান্ত হলে খালিদ তোতলাতে থাকেন, কথা গুছিয়ে বলতে পারেন না।

‘আমি যাই।’ অস্বস্তি নিয়ে বললেন রমা চৌধুরী।

‘আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা একসঙ্গে যাই? রিকশায় যেতে যেতে দুজনে একটু কথাবার্তা হলো, লালখানবাজারের মোড়ে আমি নেমে পড়ব।’

রমা চৌধুরী হাসলেন। সেই হাসিতে স্নেহ ও প্রশ্রয়। দুজনে একই রিকশাতে উঠে বসলেন তাঁরা। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রোদটা তেতে উঠতে শুরু করেছে। হুডতোলা রিকশায় সেই আঁচ কিছুটা টের পাচ্ছেন দুজনেই। তবে এই শহুরে রাস্তার দুধারে গাছপালা মৃদু হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে বলে গরমটা অসহ্য মনে হচ্ছে না।

‘আপনার জীবনের গল্প…মানে ঠিক গল্প না, আপনার জীবন সম্পর্কে আমি কিছুটা জানি।’ ইতস্তত করে বললেন খালিদ।

‘কী জানেন? পাকিস্তানি আর্মি আমাকে রেপ করেছিল, সেটা?’ রমা চৌধুরীকে একটু ক্ষুব্ধ মনে হলো।

‘না না, শুধু সেটা কেন, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন, আপনি একজন লেখিকা, যুদ্ধের পরপর আপনার দুই সন্তান…সাগর আর টগর…।’

ক্ষোভ সরে গিয়ে একধরনের শান্ত বিষণ্নতা নেমে এল রমার চেহারায়।

তাঁকে নিরুত্তর দেখে খালিদ বললেন, ‘আচ্ছা কিছু মনে করবেন না, এখন আপনি কী করেন? মানে বলতে চাইছি আয়-উপার্জন…।’

‘আমি বই বিক্রি করি, লোকের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বই বিক্রি করি। নিজের লেখা বই…।’

ঝোলা থেকে দুটো বই বের করে দেখালেন রমা চৌধুরী। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন খালিদ। একটি বইয়ের নাম একাত্তরের জননী, অন্যটির নাম রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য। তাঁর লেখা এ রকম আরও দশ-বারোটি বই আছে বলে জানালেন তিনি।

‘আমি এ বই দুটো নিতে পারি?’—জানতে চাইলেন খালিদ।

‘নিশ্চয়। এ দুটোর দাম দু শ ত্রিশ টাকা। আপনি দু শ টাকা দিন।’

একটু অপ্রস্তুত বোধ করলেন খালিদ। ভদ্রমহিলা সরাসরি টাকা চেয়ে বসবেন ভাবতে পারেননি। পকেট থেকে একটা পাঁচ শ টাকার নোট বের করে দিলেন তাঁর হাতে। হাতের ছোট ব্যাগে নোটটা রেখে গুনে গুনে তিন শ টাকা ফিরিয়ে দিতে উদ্যত হলে খালিদ বললেন, ‘না লাগবে না, বাকি টাকাটা আপনি রেখে দিন।’

স্থির কঠিন চোখে খালিদের দিকে তাকালেন একবার, তারপর টাকাটা গছিয়ে দিয়ে একটু রূঢ় কণ্ঠেই বললেন, ‘আমি বই বিক্রি করি স্যার, ভিক্ষা করি না।’

‘স্যরি দিদি, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি…আমি…।’ একধরনের অপরাধবোধ থেকেই হয়তোবা আবার তোতলাতে থাকেন খালিদ, কথা শেষ করতে পারেন না।

বেশ কিছুটা সময় কোনো বাক্যবিনিময় হয় না। রিকশা গড়িয়ে চলে গন্তব্যের দিকে। লালখানবাজারের মোড়ে নেমে যাওয়ার কথা খালিদের। আর কখনো হয়তো দেখা হবে না এই মহিলার সঙ্গে। বলবে কি বলবে না ভেবে বলেই ফেললেন, ‘আপনি একা থাকেন, সহায়-সম্বল সব হারিয়েছেন, রাষ্ট্রেরই তো উচিত আপনাকে সাহায্য করা। আপনি কখনো আবেদন করেননি?’

‘না। আমার তো চলে যাচ্ছে, সাহায্য লাগবে না।’

‘তবু…।’

‘প্রফেসর সাহেব, যুদ্ধের পর আমার যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। পাকিস্তানি সেনারা আমাকে ধর্ষণ করেছিল এটা যেন আমারই অপরাধ। কোথাও লজ্জায় ঘৃণায় নিজের পিতা-মাতার পরিচয় দিতে পারতাম না। এ রকম দুঃসময়ে একদিন শুনলাম শেখ সাহেব বলেছেন, ‘‘ধর্ষিতা মেয়েরা বাবার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দাও, আর ঠিকানা লেখ ধানমন্ডি বত্রিশ।” বিশ্বাস করবেন কি না জানি না স্যার, সেদিন থেকে আমি শেখ মুজিবের মেয়ে। এটা আমি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করেছি। আমার আর কোনো গ্লানি নেই, আমার একটা পরিচয় আছে, আমি শেখ মুজিবের মেয়ে।’

খালিদ নিষ্পলক তাকিয়ে থাকেন রমা চৌধুরীর দিকে। সত্যিই তাঁর চেহারায় অসাধারণ এক দীপ্তি। এই মহিমাময়ীর দিকে তাকিয়ে অশ্রুসজল হয়ে ওঠে তাঁর চোখ।

‘জানেন ভাই, আমি একবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।’—প্রায় কিশোরীর চপলতা এবার মহিলার কণ্ঠে। ‘স্যার’ থেকে সম্বোধন ‘ভাই’তে পৌঁছেছে।

‘দেখা হয়েছিল? শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আপনার?’ খালিদের কৌতূহল।

‘হ্যাঁ হয়েছিল, তিনিই তো খবর পাঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। তো শেখ হাসিনা আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন আমার কী লাগবে। আমি বলেছি কিছু লাগবে না। উল্টো আমি তাঁকে দুটো বই উপহার দিয়ে এসেছি…হি হি হি…।’ আবার কিশোরীর মতো হাসি রমা চৌধুরীর।

‘না না, যা-ই বলেন এটা আপনি ঠিক করেননি দিদি। আপনার তো বাকি জীবন পড়ে আছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অন্তত থাকার মতো ছোট্ট একটা বাড়ির কথা বলতে পারতেন। কত পরিত্যক্ত বাড়ি আছে শহরে, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে…।’

‘ভাই, আমি শেখ মুজিবের মেয়ে, আমি কারও কাছে হাত পাততে পারি? অপরাজেয় বাংলার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি মুক্তিযোদ্ধার কোনো একটি যদি হঠাৎ মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়ায় আপনি সহ্য করতে পারবেন?’

একটি দরিদ্র মহিলার এমন অহংকারী চেহারা সত্যিই বিহ্বল করে তোলে ভাস্করকে। লালখানবাজারের মোড়ে নেমে পড়বেন। রিকশা দাঁড় করালেন তিনি। নেমে যাওয়ার মুহূর্তে রমা চৌধুরীর হাত দুটি ধরলেন গভীর আবেগে, ‘আশীর্বাদ করবেন দিদি, অপরাজেয় বাংলাকে যেন কোনো দিন মাথা নত করতে না হয়।’

সস্নেহে ভাইয়ের পিঠে হাত রাখলেন দিদি।

ফুটপাতে লোকজনের ভিড়ের মধ্য দিয়ে হনহন করে হাঁটছেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। চারপাশে যানবাহনের হর্ন, ব্যস্ত পথচারীদের আনাগোনা, রাস্তার পাশের দোকানিদের ব্যস্ততা—কোনো দৃশ্য, কোনো শব্দই মনোযোগ কাড়তে পারছে না তাঁর। বারবার কানে বাজছে অসাধারণ তেজোদীপ্ত সেই উচ্চারণ, ‘আমি শেখ মুজিবের মেয়ে, আমি কি কারও কাছে হাত পাততে পারি?’ একজন সাধারণ নারীকে নিজের চোখের সামনে ‘অপরাজেয় বাংলা’র অনড় অটল পাথুরে মূর্তি হয়ে যেতে দেখলেন খালিদ। হাঁটার গতি বেড়েছে তাঁর, চারপাশের কেউ লক্ষ করছে কি না কে জানে, চোখের জলে চোখ ভেসে যাচ্ছে ভাস্করের।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top