বার্ডস আই...

তাসবীহ্ছরা/জপমালা

-আই....jpg

মাহ্ফুজুল হক

‘সম্পদশালী ব্যক্তিরা উচ্চ মর্যাদা পাবেন আর স্থায়ী স্বাচ্ছন্দ ভোগ করবেন অথচ তাঁরা আমাদের মতো ইবাদাত করেন ও আমাদের মতোই রোজা পালন করেন। তাঁদের প্রচুর অর্থ-কড়ি থাকায় তাঁরা হজ্জ্ব ও ওমরাহ্ পালন করেন, আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধ-জিহাদ করেন আর জনকল্যাণার্থে অর্থ ব্যয় করেন।’ কিছু সংখ্যক গরিব লোকের মুখে এহেন ক্ষেদোক্তি শুনে মহানবী মুহাম্মদ সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম জবাবে বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা বলবো না যা পালন করলে তোমরা তাঁদের ধরে ফেলতে পারবে যাঁরা তোমাদের অতিক্রম করে যায় ? কেউ তোমাদের অতিক্রম করে যাবে না এবং তোমাদের মাঝে বসবাসরতদের মধ্যে তোমরা হবে উত্তম তাঁরা ব্যতীত যাঁরা তা পালন করেন। বল, ‘সোবহানল্লাহ্’, ‘আল্হামদুলিল্লাহ্’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ চৌত্রিশ বার।’
মহাপ্রভূ আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগন, তোমরা আল্লাহ্কে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর।’ (৩৩:৪১-৪২)। মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহ্কে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে।’ (৩:১৯১)। মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে মা আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, নবী করিম (সঃ) দিন-রাত সর্বদা আল্লাহ্কে স্মরণ করতেন।
আলী বিন আবু তালিব (রাঃ) ও বিবি ফাতেমা’র (রাঃ) বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর আয়-রোজগার ছিল যৎসামান্য। ফলে বিবি ফাতেমাকে সাহায্য করার জন্য তিনি কোন কাজের মেয়ের ব্যবস্থা করতে পারেননি। এদিকে বিবি ফাতেমা যব পিষতে পিষতে তাঁর হাতে চাট পড়ে গিয়েছিল, পানি টানতে টানতে তাঁর গলার পাশে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল যা থেকে প্রচুর ব্যথা হতো। আর ঘরের মেঝে পরিষ্কার করতে করতে পরিধেয় বস্ত্র ভীষণ ময়লাযুক্ত হয়ে পড়েছিল। একদিন আলী (রাঃ) জানতে পারলেন যে, নবীজী’র (সঃ) হাতে কিছু কাজের লোক আছে। তিনি বিবি ফাতেমা’কে (রাঃ) পরামর্শ দিলেন যে, তিনি যেন নবীজীর (সঃ) কাছ থেকে একজন কাজের লোক চেয়ে নেন। ফাতেমা (রাঃ) তাঁর বাবার কাছে গেলেন বটে, কিন্তু তিনি চাইতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত আলী (রাঃ) বিবি ফাতেমা (রাঃ) সমেত নবীজীর (সঃ) বাসায় গেলেন। কিন্তু নবীজী তাঁদের কথায় সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, ‘অনেকগুলো ক্ষুধার্ত এতিম রয়েছে যাদের জন্য খাবারের কোন সংস্থান নেই। এই কাজের লোকগুলোর বিনিময়ে আমাকে তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।’ তারপর নবীজী (সঃ) বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি জিনিস দেব যেটি একজন কাজের লোক দ্বারা সহায়তা করার চেয়ে উত্তম। তিনি (সঃ) তাঁদেরকে এক বিশেষ ধরণের জিকির শিক্ষা দিলেন যা ফাতেমা’র (রাঃ) তাসবীহ্ নামে সুপিরিচিত। জিকিরটি হল : সোবহানল্লাহ্ (আল্লাহ্ পবিত্র) ৩৩ বার। আল্হামদুলিল্লাহ্ (প্রশংসা আল্লাহ্র) ৩৩ বার। আল্লাহু আকবার (আল্লাহ্ মহান) ৩৪ বার।
মুতাওয়াতির রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, নবীজী (সঃ) আর তাঁর সাহাবাগন (রাঃ) তাসবীহ্ মুখে উচ্চারণ করতেন আর তা আঙ্গুলের দ্বারা হিসাব করতেন। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের আঙ্গুলের দ্বারা হিসাব কর, যেহেতু তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে এবং তাদের কথা বলার ক্ষমতা দান করা হবে।’ মহাপ্রভূ আল্লাহ্ সোবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত।’ (৩৬:৬৫)
কেউ কেউ ছোট ছোট পাথর বা খেজুর বীচি/দানা দ্বারা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা তাসবীহ্ এর হিসাব রাখেন। মাস্বাহা দ্বারা তাসবীহ্ এর হিসাব রাখাকে মাকরুহ্ (অপছন্দনীয়) বলেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ এটিকে সঠিক কাজ বলে মনে করেন। তবে এসব পদ্ধতিতে তাসবীহ্ গণনা করার কাজকে আঙ্গুল দ্বারা গণনা করার চাইতে উত্তম কাজ বলে কেউ বলেননি। আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, ‘আমি দেখেছি যে, আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) তাঁর ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে তাসবীহের হিসাব গণনা করছেন।’ একদা ইবনে মাসউদ (রাঃ) এক মহিলার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন যার হাতে ছিল একটি মাসবাহা আর তা দিয়ে তিনি তাসবীহ্ গণনা করছিলেন। ইবনে মাসউদ (রাঃ) তা ভেঙ্গে দেন এবং পাশে নিক্ষেপ করেন। অতঃপর তিনি এক লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পেলেন যে লোকটি ছোট ছোট পাথর (পেবেল্স) দিয়ে তাসবীহছরা তৈরি করছেন। তিনি (ইবনে মাসউদ (রাঃ) ওই ব্যক্তিকে লাথি মারেন এবং বলেন, ‘তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা সাহাবাগনের (রাঃ) চেয়ে উত্তম, তোমরা ভিত্তিহীন বিদ’আতের অনুসরণ করছ ! তোমরা ধারণা কর যে, মুহাম্মদ (সঃ) এর সাহাবাগনের চেয়ে তোমরা বেশি জ্ঞানী !’ দেখা যায়, লোকজন কথা বলছেন বা কথা শুনছেন আর হাতে মাসবাহা নিয়ে গুনছেনও। এমনও দেখা যায় যে, বাইসাইকেল চালাচ্ছেন আবার হাতে মাসবাহা নিয়ে তাসবীহ্ও জপছেন। মাসবাহা নিয়ে জপ করার এই পদ্ধতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, কারো দেওয়া সালামের জবাবে তিনি শুধু মাথা নাড়েন, মুখে ওয়া লাইকুমুস সালাম বলার ফুরসত পান না। যেহেতু তিনি মাসবাহা নিয়ে তাসবীহ জপার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন, তাই সালামের জবাব দেওয়ার মতো ওয়াজিব আদায় করার সময়টুকুও তার হাতে নেই !
ইংরেজি শব্দ বিড (নবধফ)। এটি প্রাচীণ ইংলিশ নাউন বিডি (নবফব) থেকে উৎসারিত যার অর্থ প্রার্থনা। মিস্বাহাহ্ বা তাস্বীহ্ বা তাস্বীহ্ছরা বা তাস্বীহ্দানা বা জপমালা যাই বলি না কেন এগুলো সচরাচর গাছের তৈরি হয়। তবে অলিভ দানা, হাতির দাঁত, মুক্তা, পাথর, তৈলস্ফটিক বা প্লাস্টিক দিয়েও বানানো হয়। একটি মিসবাহা বা তাসবীহ্ ছরায় সাধারনতঃ ৯৯টি (নিরান্নব্বই) গুটি বা দানা থাকে যা মূলতঃ মহাপ্রভূ আল্লাহ্ তায়ালার ৯৯টি পবিত্র নামের সংখ্যা নির্দেশক। আবার কোন কোনটিতে ৩৩ দানা থাকে যার মাধ্যমে জিকিরের হিসাব রাখার সময় ওই ৩৩ দানাকে তিনবার গণনা করা হয় অর্থাৎ ৩৩*৩=৯৯। জিকর বা জিকির করার সময় তা গণনা করার একটি টুল বা হাতিয়ার হিসাবে মিস্বাহাকে ব্যবহার করা হয়। আরবিতে যেটি মিসবাহাহ্ সেটিই বাংলায় জপমালা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন, ‘মুহাম্মদ মোর নয়নমণি, মুহাম্মদ নাম জপমালা।
ঐ নামে মিটাই পিয়াসা ও নাম কওসারের পিয়ালা।’
মরমী সাধক লালন শাহ্ বলেন, ‘কেউ মালা, কেউ তস্বি গলায়,
তাইতে কী জাত ভিন্ন বলায়,
যাওয়া কিংবা আসার বেলায়
জেতের চিহ্ন রয় কার রে \’

বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ লোক কোন না কোনভাবে তাদের ধর্ম চর্চার অংশ হিসেবে মাসবাহার ব্যবহার করে থাকেন। এই যে মাসবাহা, এর প্রকার ও আকারে ভিন্নতা থাকলেও এর মৌল ক্রিয়া কিন্তু অভিন্ন আর তা হলো ধর্মীয় প্রার্থনা যা মুখে উচ্চারণ করা হয় তা গণনা করা বা হিসাব রাখা। ভারতের হিন্দু পূজা-অর্চনাকারীরা জপমালা প্রথম ব্যবহার করেন সম্ভবতঃ খৃস্ট পূর্ব ৮ম শতকে। হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে আসা বৌদ্ধরা জপমালা নিয়ে জপ করার ধারনাটি বৌদ্ধ ধর্মীয় চর্চায় অনুপ্রবিষ্ট করান। হালে ভারত ছাড়াও চীন, কোরিয়া, জাপান, তিব্বত প্রভৃতি দেশে মালা’র চর্চা দেখা যায়। খৃস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের হিন্দু পূণ্যার্থীর জপমালা সমেত মূর্তির সন্ধান পাওয়ার খবর জানা যায়। বর্তমান কালে কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, ক্যাথলিক খৃস্টান, ইসলাম, শিখ ও বাহাই ধর্মাবলম্বীদেরকে এটি নিয়ে জপ করতে দেখা যায়। রোমান ক্যাথলিকদের প্রার্থনায় কুমারী মেরি’র নামে জপ (রোজারি) চর্চা সমগ্র ইউরোপে বিগত মধ্য যুগ থেকে চালু হয়ে আছে। এবং ইসলামে জিকির করার সময় জপমালা বা তসবীহ্দানার ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। সিদি গাবাল্জা (ঝরফর এধনধষুধ) রচিত এক গ্রন্থে ইসলাম, ইহুদি, ক্যাথলিক, মানাউই, মাযুস, হিন্দু, বৌদ্ধ এর সাথে রহস্যজনক দর্শন পিথাগোরাস ((Pythagoras)) এর সম্মিলনে বানানো ‘সুফিজম’ -এ তিনি ওই মিস্বাহা’র প্রচলন করেন। আবার খৃস্ট ধর্মে ৩৩ দানা বিশিষ্ট বিড এর ব্যবহার দেখা যায় যা যিশু খৃস্টের পৃথিবীতে অবস্থানের বছর নির্দেশ করে। তাঁদের ব্যবহৃত মাসবাহা’র শেষ প্রান্তে একটি বড় দানা থাকে যা মহাপ্রভূর একত্বের নির্দেশক। সেটির সাথে আরও তিনটি ছোট দানা থাকে যা ট্রিনিটি বা ত্রিত্ববাদকে নির্দেশ করে।
অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অন্ধভাবে অনুকরণ করা থেকে বিরত থাকতে আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) স্পষ্টভাবে মুসলমানদেরকে বলেছেন। জনাবে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেন, ‘যদি কেহ অন্য কোন জাতি বা লোকের অনুকরণ করে তবে সে তাদের ই একজন বলে গন্য হবে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top