চট্টগ্রামেই মিলল হাতি মশা

images-2.jpeg

খেয়ে ফেলে ডেঙ্গুবাহী এডিস ।। পাওয়া গেছে মশামাছও ।। নগরীর জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা

মোরশেদ তালুকদার

ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিশ মশা খেয়ে ফেলে এমন এক প্রজাতির মশার সন্ধান মিলেছে চট্টগ্রাম শহরে। যার নাম ‘টক্সোরিনসাইট’। এটা ‘হাতি মশা’ নামেও পরিচিত। পাশাপাশি ‘মসকুইটো ফিশ’ বা ‘মশামাছ’ নামে এক প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে যেগুলো নালা-নর্দমায় বা দূষিত পানিতে জন্ম নেয়া রোগ-জীবাণুবাহী মশাগুলো খেয়ে ফেলে। নগরীর জীববৈচিত্র্যর ওপর পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে এ তথ্য ওঠে এসেছে। গবেষক দল শহরের এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ‘টক্সোরিনসাইট’ প্রজাতির খাদক মশা বৃদ্ধি এবং ‘মশামাছ’ বৃদ্ধির বিষয়ে আরো ব্যাপক গবেষণার উপর জোর দেয়।
নগরীর জীববৈচিত্র্যর তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষে ‘জীববৈচিত্র্য জরিপ ও সংরক্ষণ- ২০১৮’ শীর্ষক পাইলট প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও ‘বায়োডাইভারসিটি রিসার্চ গ্রুপ অফ বাংলাদেশ (বিআরজিবি) যৌথভাবে এ জরিপ চালায়। গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণাধর্মী জরিপ পরিচালিত হয়। আজ রোববার মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীনের হাতে জরিপের রিপোর্ট হস্তান্তর করবেন বিআরজিবি কর্মকর্তাবৃন্দ।
প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. বদরুল আমিন ভূইয়া দৈনিক আজাদীকে বলেন, পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুলকবহর ওয়ার্ডে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এখানে ম্যালেরিয়া বাহক ‘অ্যানোফিলিস’ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়নি। তবে এডিস ও কিউলেক্স প্রজাতি রেকর্ড করা হয়। নালা-নর্দমায় মশামাছ পাওয়া গেছে। এবং ‘টঙোরিনসাইট’কে এডিস মশার লার্ভা খেতে দেখা গেছে। শহরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ‘টঙোরিনসাইট’ প্রজাতির মশা ব্যবহার করা যায় কী না আরো গবেষণার প্রয়োজন। আমরা রিপোর্টে কিছু সুপারিশও করেছি। আশা করছি, সিটি কর্পোরেশন সেগুলো বাস্তবায়ন করবে। ৩৭০ প্রজাতির প্রাণী : জরিপে ৩৭০ প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। এরমধ্যে চার প্রজাতির ‘ক্রাস্টসিয়া’, পাঁচ প্রজাতির শামুক, ২০৫ প্রজাতির পোকা, ১২ প্রজাতির মাকড়সা, ১৬ প্রজাতির মাছ, পাঁচ প্রজাতির উভয়চর, পাঁচ প্রজাতির টিকটিকি, সাত প্রজাতির সাপ, ৫৯ প্রজাতির পাখি এবং ১৩ প্রজাতির বণ্যপ্রাণী রয়েছে।
গবেষক দল জানায়, চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করে অনুজীব, উদ্ভিদ ও প্রাণির উপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার পাহাড়-টিলা, গৃহ প্রাঙ্গণ, ছাদ বাগানের জীববৈচিত্র পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন হাট-বাজারের আবর্জনা হতে অনুজীব সংগ্রহ করে গবেষক দল। উদ্ভিদকূল, পতঙ্গ, স্বাদু পানির শামুক-ঝিনুক, মাছ, ব্যাঙ, সরীসৃপ, পক্ষীকূল, স্তন্যপায়ী ও গৃহপালিত প্রাণি এবং অন্যান্য প্রাণির উপর চলছে জরিপ কার্যক্রম। জরিপ করা হয় ওয়ার্ডের হাসপাতাল-ক্লিনিকেও ।
জরিপে ৭৯০ ধরনের অনুজীব চিহ্নিত হয়েছে। এরমধ্যে ২২ প্রজাতির অনুজীবের সন্ধান মিলেছে যার মধ্যে ১৬ টি ছত্রাক এবং ৬টি ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। আছে ক্ষতিকারক ও উপকারী প্রজাতির অনুজীব। এদের মধ্যে ‘গ্যানোডার্মা’ নামের একটি স্থলজ ঔষধি ছত্রাক পাওয়া গেছে।
এছাড়া ৩৯০টি উদ্ভিদ প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে, যার অধিকাংশই বনজ, ফলজ, ফুল-বাগান, কৃষি ও ঔষধের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ গাছ, ৩৫ শতাংশ গুল্ম ও ১৫ শতাংশ দূর্বা এবং ১৩ শতাংশ লতা।
জরিপে ১৮ টি খামারে চার জাতের মুরগী, তিন জাতের হাঁস এবং কয়েক জাতের কোয়েল, চার জাতের গবাদি পশু এবং তিন জাতের ছাগল পাওয়া গেছে। স্থানীয় ও বিদেশি প্রজাতির বিড়াল-কুকুরও তালিকাভুক্ত করা হয়। এছাড়া এ্যাকুরিয়ামে ১২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। কুকুরের ৪টি ভ্যারাইটি এবং এক প্রজাতির চিত্রল হরিণ এবং ১০ প্রজাতির পাখি বন্দি অবস্থায় পাওয়া গেছে।
এবিষয়ে মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘রিপোর্ট হাতে পেলে বুঝতে পারবো কি ধরনের জীববৈচিত্র্য রয়েছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্য অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। সুপারিশের আলোকে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরে জনসংখ্যা অনুপাতে গাছপালা, পশুপাখিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণির ভারসাম্য কতটুকু প্রয়োজন সেই তথ্য সংরক্ষিত নেই। এটা নিয়ে বড় ধরনের কোন গবেষণাও হয় নি। ফলে কোনটির অভাবে কোন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে সেটাও নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ একটি শহরে নাগরিকদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা ও বেড়ে উঠার জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশকে টেকসই রাখা অত্যন্ত জরুরি। সেটা বিবেচনায় নিয়েই নগরীর জীববৈচিত্র্যর তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় চসিক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম শহরের কলকারখানা এবং রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহন হতে নির্গত ধোঁয়ার কার্বনডাইঅঙাইড গ্যাস শোষণ করে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ গাছের প্রয়োজনীয়তা নির্ণয় করা এ প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
প্রসঙ্গত, নিউইয়র্ক, লন্ডন, টরেন্টো, ক্যানবেরা, অষ্ট্রেলিয়ার মোযমানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন শহর কর্তৃপক্ষ প্রতি পাঁচ বছর পর পর জীববৈচিত্র্য জরিপ ও সংরক্ষণ প্রকল্প পপরিচালনা করে। উন্নত দেশগুলোর বেশিরভাগই তাদের জীববৈচিত্রের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রতি পাঁচ বছর পরিস্থিতির উন্নতি অবনতি পরীক্ষা করে দেখে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top