সাতকানিয়ায় এক বছরের শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মাটি চাপা দিল আপন চাচা-চাচী

satkania-pic-19-09-2019-2.jpg

গ্রেপ্তারকৃত নুরুল আবছার মানিক ও তার স্ত্রী মারুফা আক্তার

দিসিএম ডেস্ক

সাতকানিয়ায় এক শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মাটি চাপা দিয়ে লাশ গুমের চেষ্টা চালিয়েছে তারই আপন চাচা-চাচী। ঘটনার ৪ ঘণ্টা পর মাটি খুঁড়ে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এক বছর বয়সী নিহত শিশুটির নাম ইমরান হাসান ছামিম।

এ ঘটনায় নিহত শিশুর চাচা-চাচীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো নুরুল আবছার মানিক (২৫) ও তার স্ত্রী মারুফা আক্তার (২০)।

উপজেলার চরতি ইউনিয়নের সুইপুরা এলাকায় গতকাল বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকালে হত্যার পর মাটি চাপা দেয়া হয় শিশুটিকে এবং রাতে লাশ উদ্ধার করা হয়।

এদিকে, শিশু ছামিম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত তার চাচী মারুফা আক্তার হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আজ বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

নিহত ইমরান হাসান ছামিম

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, চরতি ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সুইপুরা এলাকার মৃত আবু তাহেরের পুত্র নুরুল আবছার মানিক সৌদি আরবে থাকতেন। ওই সময়ে মানিক সৌদি আরব থেকে তার বড় ভাই মোহাম্মদ মামুনের কাছে টাকা পাঠাতেন। পরে নুরুল আবছার মানিক সৌদি আরব থেকে দেশে আসার পর মামুনের কাছে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা ফেরত চান কিন্তু মামুন তার ছোট ভাই মানিককে টাকা ফেরত দিতে পারেননি। ফলে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। টাকার বিরোধকে কেন্দ্র করে মামুন এবং মনিকের মধ্যে অনেকবার ঝগড়া হয়।

এরই মধ্যে গত ৪ মাস আগে মামুন স্ত্রী-সন্তানকে রেখে দুবাই চলে যান। মামুন দুবাই যাওয়ার পর তার স্ত্রী রিমা আকতারের কাছে দেবর মানিক একাধিকবার টাকা চান।

ওই টাকার বিষয়ে মানিক এবং তার স্ত্রীর সাথে মামুনের স্ত্রী রিমা আকতারের বেশ কয়েকবার ঝগড়া হয়। ঘটনার দিন সকালেও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়।

এদিকে, ঘটনার দিন বিকালে মামুনের স্ত্রী রিমা আকতার তার এক বছরের শিশু সন্তানকে দাদীর কাছে রেখে গরুর জন্য বাড়ির নিকটবর্তী এলাকায় ঘাস কাটতে যান।

অন্যদিকে, নাতিকে খেলারত অবস্থায় রেখে দাদী আসরের নামাজ পড়তে যান।

এরই মধ্যে শিশু ছামিম তাদের ঘর থেকে চাচা মানিকের ঘরে চলে যায়। এসময় চাচা-চাচী মিলে শিশু ছামিমকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তড়িঘড়ি করে তার লাশ ব্যাগের মধ্যে মুড়িয়ে ঘরের নিকটবর্তী নলকূপের কাছাকাছি জায়গায় গর্ত করে মাটি চাপা দেন।

এদিকে, নামাজ শেষে দাদী নাতি ছামিমকে খুঁজতে থাকেন। ঘরের ভেতর না পেয়ে বাইরে গিয়ে আশপাশে খোঁজ নিতে থাকেন তিনি। এসময় রিমা আকতার ঘরে এসে শাশুড়ির মুখে সন্তানকে খুঁজে না পাওয়ার খবর শুনে আশপাশের লোকজন সহ চারদিকে শিশু ছামিমকে খুঁজতে থাকেন।

এক পর্যায়ে রাত ৯টার দিকে নুরুল আবছার মানিকের ঘরের নিকটবর্তী নলকূপের পাশে মাটি খোঁড়ার চিহ্ন দেখতে পান তারা। এতে লোকজনের সন্দেহ হলে তারা চিহ্নিত স্থানে মাটি খুঁড়তে শুরু করেন।

এসময় ওই গর্তে ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় শিশু ছামিমের লাশ দেখতে পান তারা।

পরে এলাকার লোকজন পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশু ছামিমের লাশ উদ্ধার করে এবং ঘটনায় জড়িত চাচা নুরুল আবছার মানিক ও তার স্ত্রী মারুফা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে।

পরে পুলিশ নিহত শিশু ছামিমের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।

নিহত শিশু ইমরান হাসান ছামিমের মা রিমা আকতার বলেন, ‘মানিক আমার স্বামীর কাছে টাকা পাওয়ার বিষয়টি সত্য। আমার স্বামী দেশে থাকা অবস্থায় ওই টাকার বিষয়ে তারা দুই ভাইয়ের মধ্যে অনেকবার ঝগড়া হয়েছে। আমার স্বামী বিদেশে চলে যাওয়ার পর তার ভাই আমার কাছেও একাধিকবার টাকা ফেরত চেয়েছে কিন্তু আমি তাকে বলেছিলাম এটা তোমাদের দুই ভাইয়ের ব্যাপার। আমার নিষ্পাপ সন্তানটি কী অপরাধ করেছে? তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে আমার বুকের ধন কেড়ে নিয়েছে। আমার ছেলেকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মাটি চাপা দিয়েছে। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’

সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সফিউর কবীর জানান, শিশু ছামিমের চাচা নুরুল আবছার মানিক সৌদি আরবে থাকতেন। ওই সময়ে মানিক তার বড় ভাই মো. মামুনের কাছে টাকা পাঠাতেন। মানিক দেশে আসার পর মামুনের কাছে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা ফেরত চান কিন্তু মামুন টাকা ফেরত দিতে পারেননি। এরই মধ্যে মামুন দুবাই চলে যান। ওই টাকার বিরোধকে কেন্দ্র তাদের মধ্যে অনেকবার ঝগড়া হয়েছে। মূলত টাকার বিরোধকে কেন্দ্র করে শিশু ছামিমকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত চাচা-চাচীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে।’

এ ঘটনায় শিশু ইমরান হাসান ছামিমের মা রিমা আকতার বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে বলে জানান ওসি সফিউর।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাতকানিয়ার ঢেমশা তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজনু মিয়া জানান, শিশু ইমরান হাসান ছামিমকে হত্যার ঘটনায় তার চাচী মারুফা আক্তার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তিনি জানান, স্বামীর পাওনা টাকার বিরোধকে কেন্দ্র করে শিশু ছামিমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। লাশ গুম করার জন্য হত্যার পর তাড়াতাড়ি করে মাটি চাপা দেয়া হয়। গ্রেপ্তারকৃত চাচা-চাচীকে আজ বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হলে চাচী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি প্রদানকালে এসব কথা স্বীকার করেন। পরে আদালত চাচা-চাচী দুইজনকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top