বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন–১৯৯১ ও কক্সবাজারের প্রেক্ষাপট

To-Let.jpg

রাজা  সূর্য  খাঁ

কক্সবাজারে ২৫ বছরে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৪ থেকে ৭ গুণ।  বছরে ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ও এনজিও প্রবেশের পর থেকে।  প্রায়, ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে  এই তিনবছরের মধ্যেই। বাড়িওয়ালারা ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি করে পুরাতন ভাড়াটিয়াদের বাড়িছাড়া করতে বাধ্য করছেন উচ্চ ভাড়ায় এনজিও আর এনজিও কর্মীদের ভাড়া দেয়ার জন্য।   এ যেন এক নিরব কৃত্রিম সংকট ও ভাড়া সন্ত্রাস! দেখার কেউ নেই। অথচ আমাদের দেশে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন  কতো সুন্দর আর পরিপাটি।  এই বিষয়ে যে একটা আইন আছে সেটা অনেকই জানেননা। আমরা একটু সচেতন হলেই এই আইনটি বাস্তবায়ন করতে পারি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা কেউই এই বিষয়টিকে অপরাধ বলে গণ্য করিনা। ইচ্ছেমতো বাড়িভাড়া বৃদ্ধিও যে একটা  দন্ডনীয় অপরাধ সেটা আমরা জানিনা। অথচ মুখ বুঝে সহ্য করে নিচ্ছি।

কক্সবাজারে প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষ বাসাভাড়া নিয়ে থাকেন। শহরের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি ভাড়াটিয়া বাকি ৪৩ শতাংশ বাড়িওয়ালাদের কাছে জিম্মি।  এইরকম ভাড়া সন্ত্রাস চলতে থাকলে আগামী দশ বছরে এই শহরে মধ্যবিত্ত পরিবারেরা স্বাভাবিক জীবন যাপন চালাতে হিমশিম খাবে। ইতিমধ্যে এই জেলায়  রুহিঙ্গা প্রবেশের ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম প্রায়ই আকাশচুম্বী! তারউপর এই ভাড়া সন্ত্রাস! ফলে এই অতিরিক্ত খরচ মেটাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকেই বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন।

কক্সবাজারে বাড়িভাড়া আইন বাস্তবায়নে করণীয় :-

১. “বাড়িভাড়া আইন বাস্তবায়ন ” আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন;

২. গণসচেতনতা সৃষ্টিকরণ ;

৩. সম্মানিত জেলা প্রশাসককে স্মারক লিপি প্রদান;

৪.  মানববন্ধনের ব্যবস্থা করা;

৫. দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন সচল রাখা;

৬.  বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে আইনানুযায়ী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া;

আমরা যদি এখনই এই বিষয়ে সচেতন না হই তাহলে ভবিষ্যতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রবল ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হবে। তাই আসুন, নিজে সচেতন হই অন্যকেও সচেতন করি। নিজে বাড়িভাড়া আইন সম্পর্কে জানি আর অন্যদের বাড়িভাড়া আইন সম্পর্কে জানাই। নিচে বাড়িভাড়া আইনের কিছু প্রয়োজনীয় অংশ তুলে ধরা হলো :-

 

 

বাড়িভাড়া আইনের ইতিহাস :

সাল  প্রবর্তকসরকার   স্থায়িত্ব প্রসঙ্গ বিষয়
১৯৪২ ( ফেব্রুয়ারীর ০২ তারিখ) বৃটিশ ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ( ৪ বছর) এর আগে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিধান অনুসারে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার দ্বন্দ্ব নিরসন হতো    
১৯৪৬ সালের ০৫ নং আইন বৃটিশ ও পাকিস্থান  ১৯৫১ সাল পর্যন্ত (০৫ বছর) ১৯৪৭ সালে ভারত  পাকিস্তান নামের দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়ার পর বাড়িভাড়া আইনটি ১৯৫১ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকে।১৯৫১ সালে আইনটি বাতিল করে বাড়িভাড়া অধ্যাদেশ, ১৯৫১ জারি করা হয় যা পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের অধ্যাদেশ দ্বারা রহিত করা হয়।
১৯৫৩ ( পূর্ব বঙ্গীয় বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন) পাকিস্তান ১৯৬১ সাল পর্যন্ত (০৮ বছর) এরপর ১৯৬১ সালে সংক্রান্ত একটি আইন প্রণীত হয়ে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত অধ্যাদেশ জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। এর অধীনে ১৯৬৪ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়, যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একযুগেরও বেশি সময় ধরে ১৯৮৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ ছিল।
১৯ ৮৬ সালের ২২ নং আইন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এইচএম এরশাদ ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ( ০৩ বছর) তিন বছর পরে আবার বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন জারি করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু ইতিপূর্বে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। নইলে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করে আইনটি পাস করা যেত। তাই জাতীয় সংসদের অবর্তমানে বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ক্ষমতাবলে তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৯১ জারি করেন। একই বছর অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়ে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ সালের ৩নং আইন) হিসাবে নামলাভ করে। যা আজ পর্যন্ত কার্যকর  বলবৎ রয়েছে।

বর্তমান আইন অর্থাৎ ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৪ ধারায় বিধি প্রণয়নের ক্ষমতার বিধান থাকলেও সরকার আজ পর্যন্ত এই আইনের অধীনে কোনো নতুন বিধি প্রণয়ন করেন নাই। ফলে ১৯৬৪ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ বিধিমালাই কার্যকর রয়ে গেছে। সরকার

সংক্ষিপ্ত শিরোনামা  প্রবর্তন :

১৷ (১) এই আইন বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ নামে অভিহিত হইবে৷

(২) ধারা ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ এবং ২৭ দোসরা জানুয়ারী, ১৯৯১ ইং তারিখে কার্যকর হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে এবং অবশিষ্ট ধারাগুলি যে সকল এলাকায় Premises Rent Control Ordinance, 1986 (XXII of 1986) ২৬শে মার্চ, ১৯৮৯ তারিখে বলবত্ ছিল সে সকল এলাকায় ২৭শে মার্চ, ১৯৮৯ তারিখে বলবত্ হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে :

তবে শর্ত থাকে যে, সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, অন্য কোন এলাকায় এই আইন বা উহার অংশবিশেষ প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত তারিখ হইতে বলবত্ করার নির্দেশ দিতে পারিবে, এবং অনুরূপ প্রজ্ঞাপন দ্বারা এই আইন বা উহার কোন অংশবিশেষ প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত তারিখ হইতে কোন এলাকায় প্রযোজ্য হইবে না বলিয়াও নির্দেশ দিতে পারিবে৷

নিয়ন্ত্রক ইত্যাদি নিয়োগ:

৩৷ (১) এই আইন দ্বারা বা উহার অধীন নিয়ন্ত্রকের উপর অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, কোন ব্যক্তিকে কোন এলাকার জন্য নিয়ন্ত্রক নিযুক্ত করিতে পারিবে৷

(২) সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, কোন ব্যক্তিকে কোন এলাকার জন্য অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক কিংবা উপ-নিয়ন্ত্রক নিযুক্ত করিতে পারিবে৷

(৩) নিয়ন্ত্রক তাহার যে সমস্ত দায়িত্ব অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বা উপ- নিয়ন্ত্রকের নিকট অর্পণ করিবেন তাহারা কেবল সেই সকল দায়িত্ব পালন করিবেন এবং এই দায়িত্ব পালনে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বা উপ-নিয়ন্ত্রক, উপ-ধারা (৪) এ উল্লিখিত বিষয়াদি ব্যতীত, নিয়ন্ত্রকের সকল ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দায়িত্ব পালন করিবেন৷

(৪) নিয়ন্ত্রক-

(ক) তাহার নিকট নিষ্পন্নাধীন যে কোন মামলা নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বা উপ-নিয়ন্ত্রকের নিকট হস্তান্তর করিতে পারিবেন, অথবা

(খ) অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বা উপ-নিয়ন্ত্রকের নিকট নিষ্পন্নাধীন যে কোন মামলা প্রত্যাহার করিয়া উহা নিজেই নিষ্পত্তি করিতে পারিবেন বা নিষ্পত্তির জন্য অন্য কোন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বা উপ-নিয়ন্ত্রকের নিকট হস্তান্তর করিতে পারিবেন৷

বা নিষ্পত্তির জন্য অন্য কোন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বা উপ-নিয়ন্ত্রকের নিকট হস্তান্তর করিতে পারিবেন৷

শুনানী সম্পন্ন করিবেন৷

(৪) প্রত্যেক দরখাস্তের শুনানী আরম্ভ হইলে উহা ক্রমাগতভাবে চালাইয়া যাইতে হইবে, তবে কোন বিশেষ কারণে উহা সম্ভব না হইলে, উহার কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া নিয়ন্ত্রক শুনানী মূলতবী করিতে পারিবেন৷

(৫) নিয়ন্ত্রক তাহার নিষ্পন্নাধীন প্রত্যেক মামলায় কোন পক্ষের অনুকূলে বা প্রতিকূলে যুক্তিসংগত খরচ প্রদানের জন্য আদেশ দিতে পারিবেন এবং উহা সরকারী পাওনা (public demand) হিসাবে আদায়যোগ্য হইবে৷

লিখিত চুক্তি :

আইন অনুযায়ী বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি নামা সই করতে হবে। যদিও এই চুক্তি নামা সইয়ের বিষয়টি অধিকাংশই এড়িয়ে চলেন। চুক্তিনামায় ভাড়ার মেয়াদ, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, ভাড়ার পরিমাণ ইত্যাদি উল্লেখ থাকবে। বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল ইত্যাদিও কে পরিশোধ করবেন তা স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকবে।

জামানত থাকলে তা কবে ফেরত দেওয়া হবে, ভাড়ার সাথে সমন্বয় করে কাটা হবে কি না এসবও পরিষ্কার উল্লেখ থাকবে। এ সকল চুক্তির লিখিত দলিল হিসেবে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্টাম্প ব্যবহৃত হবে।

 

বাড়ি মেরামত :

সাধারণত বাড়ি মেরামত করার দায়িত্ব বাড়িওয়ালাই নিয়ে থাকেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছু কিছু মেরামতের কাজ বাড়িওয়ালা করতে চান না। এজন্যই হয়তো দেখা যায় পানির লাইন, গ্যাস লাইন দিনের পর দিন নষ্ট থাকলেও বাড়িওয়ালা মেরামত করে দিতে চান না।

এমন পরিস্থিতিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে ভাড়াটিয়া আবেদন করতে পারবেন। তখন ভাড়া নিয়ন্ত্রক বাড়িওয়ালাকে মেরামতের নির্দেশ দিবেন। জরুরি মেরামত করার প্রয়োজন পড়বে এমনকিছুর জন্য ভাড়াটিয়া তিন দিনের সময় বেঁধে বাড়িওয়ালাকে নোটিশ দিবেন। যদি এই সময় বাড়িওয়ালা মেরামতের কাজ না করেন তবে ভাড়াটিয়া আনুমানিক খরচের হিসেব ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠিয়ে নিজেই মেরামতের কাজ করতে পারবেন। মেরামত করার পর খরচ ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে আবেদন করা সাপেক্ষে বাড়িওয়ালার কাছ থেকে আদায় করতে পারবেন।

উচ্ছেদ :

যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তারা কমবেশি এই শব্দটির সাথে পরিচিত। নিজস্ব অভিজ্ঞতায় জানি, বাড়িওয়ালার স্ত্রীর সাথে কোনো কারণে ভাড়াটিয়ার স্ত্রীর ঝগড়া লেগে গেল। দেখা যাবে বাড়িওয়ালাও বলে দিবে এই মাসেই বাসা ছেড়ে দিতে হবে।

আইনানুযায়ী এভাবে হঠাৎই কাউকে বাসা থেকে উচ্ছেদ করা যায় না। এক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করছে কি না তা দেখতে হয়। যদি ভাড়া পরিশোধ করে তবে উচ্ছেদ করতে পারবেন না। আবার চুক্তিপত্র না থাকলেও যদি ভাড়াটিয়া পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই ভাড়া পরিশোধ করে থাকেন তাকেও উচ্ছেদ করা যায় না। মাসিক ভাড়ায় থাকা ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদের কমপক্ষে ১৫ দিন পূর্বে নোটিশ দিতে হবে। আর বার্ষিক ইজারা বা শিল্প কারখানার চুক্তির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাস পূর্বে নোটিশ দিতে হবে। অনেক সময় চুক্তিপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে যদি বাড়িওয়ালা টাকা নিয়ে থাকেন তবে চুক্তিপত্র নবায়ন করেছেন বলে ধরে নেওয়া হবে।

মূল গেটের চাবি:

বাড়ির মালিকের কাছে মূল গেটের চাবি বুঝে নেওয়ার অধিকার ভাড়াটিয়ার রয়েছে। সুতরাং ভাড়াটিয়া মূল গেটের চাবি নিতে পারবেন।

বৈদ্যুতিক মিটার ব্যবহার :

সাধারণত ভাড়াটিয়ার জন্য আলাদা বৈদ্যুতিক মিটার দিতে হবে। এই মিটারের রিডিং দেখে রাখতে হবে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালা উভয়কেই।

অনেক সময় বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে ব্যাচেলর হলে পাশের বাসার অবস্থা পর্যন্ত জানাতে ভুল করেন না। দিয়ে থাকেন সতর্কবার্তাও। যাতে তাদের সাথে কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা না ঘটে। এসব বলার অধিকার বাড়িওয়ালার আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাড়িওয়ালা সামগ্রিক পরিবেশ, যেমন – বাড়ির আশপাশে চলাচল করা কতটা নিরাপদ, নেশাখোরদের আড্ডা, চাঁদাবাজদের উৎপাত ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো ধারণা দেন না। তবে এসব সম্পর্কে অবহিত করা কিন্তু বাড়িওয়ালারই দায়িত্ব।

অগ্রিম ভাড়া:

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১-এর ১০ ও ২৩ ধারা মোতাবেক বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনোভাবেই বাড়ি মালিক তার ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম বাবদ এক মাসের বাড়ি ভাড়ার অধিক কোনো প্রকার ভাড়া, জামানত, প্রিমিয়াম বা সেলামি গ্রহণ করতে পারবেন না। তা হলে দণ্ডবিধি ২৩ ধারা মোতাবেক তিনি দণ্ডিত হবেন।

ভাড়ার রসিদ:

আপনার পরিশোধকৃত বাড়ি ভাড়ার রসিদ সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক বা তার প্রতিনিধি দিতে বাধ্য।

 

ভাড়া বাড়ানো:

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৬ ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানসম্মত ভাড়া কার্যকরী হবার তারিখ হতে দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। দুই বছর পর মানসম্মত ভাড়ার পরিবর্তন করা যাবে। এই আইনের ৮ ধারা এবং ৯ ধারায় বর্ণিত রয়েছে যে, মানসম্মত ভাড়া অপেক্ষা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অধিক বাড়ি ভাড়া আদায় করলে সে ক্ষেত্রে প্রথমবারের অপরাধের জন্য মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত যে অর্থ আদায় করা হয়েছে তার দ্বিগুণ অর্থদণ্ডে বাড়ি মালিক দণ্ডিত হবেন এবং পরবর্তী প্রত্যেক অপরাধের জন্য এক মাসের অতিরিক্ত যে ভাড়া গ্রহণ করা হয়েছে তার তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে বাড়ি মালিক দণ্ডিত হবেন।

মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ:

মানসম্মত ভাড়া সম্পর্কে আইনের ১৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজার মূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হবে না। বাড়ির বাজার মূল্য নির্ধারণ করার পদ্ধতিও বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ১৯৬৪ তে স্পষ্ট করা আছে।

বাস উপযোগী বাসস্থান:

বাড়ি মালিক তার বাড়িটি বসবাসের উপযোগী করে রাখতে আইনত বাধ্য। বাড়ির মালিক ইচ্ছা করলেই ভাড়াটিয়াকে বসবাসের অনুপযোগী বা অযোগ্য অবস্থায় রাখতে পারেন না। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বসবাসের উপযোগী করে বাড়িটি প্রস্তুত রাখতে বাড়ির মালিকের উপর এই বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ২১নং ধারায় বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। অর্থাৎ ভাড়াটিয়াকে পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পয়ঃপ্রণালী নিষ্কাশন ইত্যাদি সুবিধা প্রদান করতে হবে। এমনকি প্রয়োজনবোধে লিফটের সুবিধাও দিতে হবে। কিন্তু উক্তরূপ সুবিধা প্রদানে বাড়ি মালিক অনীহা প্রকাশ করলে কিংবা বাড়িটি মেরামতের প্রয়োজন হলেও ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রকের কাছে দরখাস্ত করতে পারবেন।

ভাড়া বাসা থেকে উচ্ছেদ:

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৮নং ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, ১৮৮২ সনের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন বা ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের বিধানে যাই থাকুক না কেন, ভাড়াটিয়া যদি নিয়মিতভাবে ভাড়া পরিশোধ করতে থাকেন এবং বাড়ি ভাড়ার শর্তসমূহ মেনে চলেন তাহলে যতদিন ভাড়াটিয়া এভাবে করতে থাকবেন ততদিন পর্যন্ত উক্ত ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না। এমনকি ১৮(২) ধারা মতে বাড়ির মালিক পরিবর্তিত হলেও ভাড়াটিয়া যদি আইনসম্মত ভাড়া প্রদানে রাজি থাকেন তবে তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। চুক্তিপত্র না থাকলে যদি কোনো ভাড়াটে প্রতি মাসের ভাড়া পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করেন, তাহলেও ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। যুক্তিসংগত কারণে ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করতে চাইলে যদি মাসিক ভাড়ায় কেউ থাকে, সে ক্ষেত্রে ১৫ দিন আগে নোটিশ দিতে হবে। চুক্তি যদি বার্ষিক ইজারা হয় বা শিল্পকারখানা হয়, তবে ছয় মাস আগে নোটিশ দিতে হবে।

  ভাড়া বৃদ্ধির উপর বাধানিষেধ:

৭৷ এই আইনের বিধান সাপেক্ষে, কোন বাড়ীর ভাড়া মানসম্মত ভাড়ার অধিক বৃদ্ধি করা হইলে উক্ত অধিক ভাড়া, কোন চুক্তিতে ভিন্নরূপ কিছু থাকা সত্ত্বেও, আদায়যোগ্য হইবে না৷

 মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের দণ্ড:

২৩৷ যদি কোন ব্যক্তি জ্ঞাতসারে-

(ক) ধারা ৮ বা ধারা ৯ এ বিবৃত কারণ ব্যতিরেকে অন্য কোন কারণে মানসম্মত ভাড়া অপেক্ষা অধিক ভাড়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্রহণ করেন; বা

(খ) ধারা ১১ এ বিবৃত কারণ ব্যতিরেকে অন্য কোন কারণে মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত হিসাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রিমিয়াম, সালামী, জামানত বা অনুরূপ কোন টাকা গ্রহণ করেন বা দাবী করেন বা দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করেন; বা

(গ) নিয়ন্ত্রকের লিখিত সম্মতি ব্যতিরেকে অগ্রিম ভাড়া বাবদ এক মাসের ভাড়ার অধিক ভাড়া গ্রহণ করেন;তাহা হইলে তিনি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা সরকারের অভিযোগের ভিত্তিতে-

(অ) দফা (ক) এ উল্লেখিতক্ষেত্রে, প্রথমবারের অপরাধের জন্য মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়কৃত টাকার দ্বিগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং পরবর্তী প্রত্যেকবারের অপরাধের জন্য উক্ত অতিরিক্ত টাকার তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন;

(আ) দফা (খ) এ উল্লেখিতক্ষেত্রে, প্রথমবারের অপরাধের জন্য দুই হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং পরবর্তী প্রত্যেক বারের অপরাধের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত্ম অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবে;

(ই) দফা (গ) এ উল্লেখিতক্ষেত্রে, প্রথমবারের অপরাধের জন্য এক মাসের ভাড়ার অতিরিক্ত যে টাকা আদায় করা হইয়াছে উহার দ্বিগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন, এবং পরবর্তী প্রত্যেক বারের অপরাধের জন্য এক মাসের ভাড়ার অতিরিক্ত যে টাকা আদায় করা হইয়াছে উহার তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন৷

অভিযোগ দায়ের ইত্যাদি:          

২৮৷ (১) ধারা ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ এর অধীন প্রত্যেক অভিযোগ নিয়ন্ত্রকের নিকট লিখিতভাবে দায়ের করিতে হইবে৷

(২) নিয়ন্ত্রক উপ-ধারা (১) এর অধীন তাহার নিকট দায়েরকৃত প্রত্যেক অভিযোগ তদন্ত করিয়া উক্ত ধারাগুলিতে উল্লেখিত দণ্ড আরোপ করিতে পারিবেন৷

(৩) উক্ত ধারাগুলির অধীন আরোপিত অর্থদণ্ড দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে দণ্ডাদেশের তারিখ হইতে ত্রিশ দিনের মধ্যে আদায় করিবেন এবং তিনি যদি উক্ত সময়ের মধ্যে উহা আদায়ে ব্যর্থ হন তাহা হইলে উহা Public Demands Recovery Act, 1913 (Bengal Act III of 1913) এর অধীন সরকারী দাবী হিসাবে আদায়যোগ্য হইবে :

তবে শর্ত থাকে যে, নিয়ন্ত্রক বিশেষ কারণে, যাহা লিপিবদ্ধ করিতে হইবে, উক্ত আদায়ের সময় বর্দ্ধিত করিতে পারিবেন৷

 অভিযোগ তামাদি:

২৯৷ কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে  ধারা ২৩, ২৫, ২৬ বা ২৭ এর অধীন কোন অভিযোগ যে অপরাধের জন্য উহা আনীত সে অপরাধ সংঘটনের ছয় মাস অতিবাহিত হইবার পর আনয়ন করা যাইবে না৷

 বাড়ী-মালিকের ভুল নাম বা ঠিকানা দেওয়ার দণ্ড:    

২৫৷ যদি কোন ভাড়াটিয়া ধারা ১৯ এর অধীন ভাড়া জমা করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ী-মালিকের নাম বা ঠিকানা ভুল দিয়া থাকেন, তাহা হইলে তিনি, বাড়ী-মালিকের অভিযোগের ভিত্তিতে, পাঁচশত টাকা পর্যন্ত্ম অর্থ দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন৷

  বাড়ী দখল বুঝাইয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার ব্যর্থতার দণ্ড:

২৬৷ (১) যদি কোন ভাড়াটিয়া বাড়ী ছাড়িয়া দেন তাহা হইলে তিনি উহার খালি দখল বাড়ী-মালিকের নিকট হস্তান্তর করিবেন, যদি না তিনি বাড়ী-মালিকের সম্মতি অনুসারে বা ভাড়ার চুক্তির শর্ত অনুসারে উহার কোন অংশ উপ-ভাড়া দিয়া থাকেন৷

(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন কোন ভাড়াটিয়া বাড়ীর খালি দখল হস্তান্তর করিতে অস্বীকার করিলে বা ব্যর্থ হইলে তিনি, বাড়ী-মালিকের অভিযোগের ভিত্তিতে, বাড়ীর মানসম্মত ভাড়ার দশগুণ অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন৷

 রশিদ প্রদানে ব্যর্থতার দণ্ড:

২৭৷ যদি কোন বাড়ী-মালিক ধারা ১৩ এর বিধান অনুসারে ভাড়াটিয়াকে ভাড়া গ্রহণের লিখিত রশিদ প্রদানে অস্বীকার করেন বা ব্যর্থ হন, তাহা হইলে তিনি ভাড়াটিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে, আদায়কৃত টাকার দ্বিগুণ অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।

 অব্যাহতি    :

৩৩৷ এই আইনের কোন কিছুই সরকার, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং রাজশাহী শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃপক্ষের দখলীয় কোন বাড়ীরক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে না৷

আরও জানতে ভিজিট করুন :- bdlaws.minlaw.gov.bd

 

সোহানোর রহমান সূর্য  (fb id – রাজা সূর্য খাঁ)

Founder Director Of SAD (Social Awareness & Development)

email- sad.cox2020@gmail.com Contact :- 01882233282

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top