শিশুসহ দুই রোহিঙ্গা নিহত ; সাড়ে তিন হাজার আশ্রয়স্থল ক্ষতিগ্রস্ত

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প

66350403_2451014054919647_8040641303140106240_n.jpg

গোলাম আজম খান

সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়ায় উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের নাগরিকরা শরণার্থী শিবিরে সঙ্কটে পড়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা তাদের আশ্রয়স্থল হারিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ঘর। নিহত হয়েছেন শিশুসহ দুইজন রোহিঙ্গা। ক্যাম্পে দায়িত্বরত আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম’র ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার তারেক মাহমুদ প্রেরিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, তথ্য মতে ২ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত থাকা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণীতে জানা গেছে, ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ১ হাজার ১৮৬টি, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ২১৬টি, ঝড়ো হাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ১ হাজার ৮৪০টি, বন্যায় অথবা অন্যান্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৫৩৪ জন। ভূমিধস হয়েছে ৩৯১টি, ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেছে ৫১ বার এবং ৭ জুলাই পর্যন্ত ২৬ বার। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় আইওএম-এর ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা গেছে, আরো ১৩টি ভূমিধস হয়েছে, ৯ বার ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেছে এবং দুটি বন্যায় দুই হাজার ২০০ ব্যক্তি এবং ৪৩২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার এক ইমেইল বার্তায় এসব তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম। ক্যাম্পজুড়ে কর্মরত আইওএমের কর্মকর্তা এবং স্বেচ্ছাসেবকরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরেজমিন গিয়ে এ ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করেন বলে বার্তায় জানানো হয়েছে।
এদিকে আইওএম ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আবাসস্থলগুলো মেরামত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জরুরি আশ্রয়স্থলে নিতে কাজ করে যাচ্ছে। আইওএমের মুখপাত্র জর্জ ম্যাকলয়েড বলেছেন, বর্ষাকালের মাত্র অর্ধেক সময় পার হয়েছে। এরই মধ্যে গত ৭২ ঘণ্টায় আমরা দুই হাজার মানুষকে সহায়তা করেছি। আমাদের সব সদস্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
ইতোমধ্যেই ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক পরিমাণ ২০১৮ সালের ক্ষয়ক্ষতি থেকেও বেশি হয়েছে বলে উল্লেখ করে আইওএমের এই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ৩ থেকে ৫ জুলাই, এই তিন দিনে সবচেয়ে বড় কুতুপালং মেঘা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৫১০ মিলিমিটার। আরেকটি বড় ক্যাম্প- ‘ক্যাম্প ১৬’তে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৫৩০ মিলিমিটার। এদিকে ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়া নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রিত রোহিঙ্গা শিবির পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে দুর্ভোগে পড়েছে এখানে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ রোহিঙ্গা পরিবারের পাঁচ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ ও শিশু। দেখা দিয়েছে খাবার ও পানি সঙ্কট।
তুমব্রু শূন্যরেখা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘প্রবল বৃষ্টির পানির সাথে পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় এখানকার শিবিরটি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পানিতে তলিয়ে রয়েছে। বর্তমানে এখানে খাদ্য এবং খাবার পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’
জাদিমুড়া শালবন পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রিত মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, গত শনিবার রাত থেকে ভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের পানি ঘরে ঢুকে পড়ে। এতে পরিবারের ৮ সদস্যের নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। ভূমিধসের ভয়ে পাহাড়ের পাদদেশের ঝুপড়ি ঘর ফেলে অন্যত্র আশ্রয় খুঁজছি।’
জাদিমুড়া রাস্তার পাশের রোহিঙ্গা শিবিরের মাঝি মোহাম্মদ একরাম বলেন, ‘ক’দিনের ভারী বৃষ্টিপাতে অনেকের বাড়ির ঘরের ত্রিপলের ছাউনি নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই পানিতে ঘর ভিজে যায়। ফলে সন্তানদের নিয়ে বসে বসেই কাটাতে হয়।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল হাসান বলেন, ‘রোহিঙ্গারা পাহাড় ও বন কেটে ঝুপড়ি ঘর তৈরি করেছে, তাই ঝুঁকিটা বেশি। তবে ভারী বর্ষণে দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রোহিঙ্গা সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আশপাশের মসজিদ, সাইক্লোন শেল্টার, আশপাশের স্কুলের ভবন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
এদিকে পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে প্রশাসন। শনিবার থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top