যখন-তখন মেজাজ বদল

-তখন-মেজাজ-বদল.jpg

ক্রিকেট মাঠে কোনো বোলারের বল যদি ঠিকঠাক সুইং করে, তবে তো কেল্লাফতে। বোলারের উচ্ছ্বাস, উল্টো দিকে ব্যাটসম্যানের সাজঘরে ফিরে যাওয়া। সুইং—মানে এই যে হঠাৎ করে বলের বাঁক বদল তা ক্রিকেট মাঠে বোলারের দারুণ এক দক্ষতা। কিন্তু মানুষের মন যদি সুইং করে? বোলার বল সুইং করলে তা উইকেট এনে দেয়, আর বোলারের মেজাজ-মর্জি যদি সুইং করে, তবে? চার-ছক্কার ফুলঝুরি ছুটবে ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে।

প্রায়ই শোনা যায়, অমুকের মন-মেজাজের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই কিংবা ওর মতিগতি বোঝা ভার। স্বভাবগতভাবেই মানুষের মনের পরিবর্তন হয়। পরিবর্তন হয় মেজাজেরও। তাই তো এসেছে ‘মুড সুইং’ কথাটা।

নানা রকম তথ্যভান্ডার ঘেঁটে যা পাওয়া গেল, তা হলো মুড বা মেজাজের গতিবিধির পরিবর্তন মানুষের সহজাত এক বৈশিষ্ট্য। মাঝে মাঝে তা হলে কখনো কখনো এই পরিবর্তন ইতিবাচক। তবে ঘন ঘন মেজাজ বদল নেতিবাচক তো বটেই কখনো ধ্বংসাত্মক। সেটি তখন মানসিক রোগের পর্যায়েই চলে যায়।

এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা। বন্ধুর অফিসের কয়েকজন মিলে বাইরে খেতে যাওয়া হবে। এর মধ্য সহকর্মীর স্বামী যেমন আছে তেমনি দুই-একজনের স্ত্রীও আছে। বেশ কবার এই দল বাইরে খেতে গেছে। বন্ধুটি বলল, এখন যখনই এ রকম আয়োজনের কথা বলা হয়, তার বউ জিজ্ঞেস করে কে কে যাচ্ছে। একজনের নাম শুনে প্রতিবারই বলে, ‘ওনার তো ঠিক নাই। অফিস থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতেই মত পাল্টাবে। বলবে যাবে না।’ বন্ধু সহকর্মীর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে থাকে—‘আরে আজ সিওর ও যাবে।’ শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, সেই সহকর্মী ‘সরি’ বলে টেক্সট করেছে মুঠোফোনে। বাইরে খাওয়ার পরিকল্পনা হয়তো বাস্তবায়ন হয়, কিন্তু খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে কেন সে মত বদলাল, তা নিয়ে আলোচনাও থাকতে পারে।

মানুষের মন বোঝা যদি কষ্টকর হয়, তবে মতিগতি বোঝা আরও জটিল। ধরা যাক, নীলার (ছদ্মনাম) কথা। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, হ্যাং আউট কিংবা ইটিং আউটে যেতে তার ব্যাপক উৎসাহ। এমনও তো হয়েছে, নীলা রীতিমতো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে দিনক্ষণ ঠিক করেছে, সবার মত নিয়েছে, জায়গা বাছাই করেছে, খাবারের মেন্যু ঠিক করেছে। যথারীতি এক শুক্রবার তারা পাঁচ বন্ধু এক গাড়িতে করে বেড়াতেও গেল ঢাকার কাছেই একটি খোলামেলা রেস্তোরাঁয়। সুন্দর সাজানো-গোছানো সবকিছু। খাবারের মেন্যু তালিকাও পছন্দ করার মতো। খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো। এই ফাঁকে চলল কথাবার্তা। যে যার স্মার্টফোনেও হালকাপাতলা গুতোগুতি করছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, নীলার মুখ কালো। খাবার আসার পর নীলার মুড অফ আরও বেশি দৃশ্যমান। বন্ধুদের একজন সোনিয়া কারণ জিজ্ঞেস করল। নীলা বলে, না কিছু হয়নি। আমি তো ঠিকই আছি। কিন্তু খাওয়ার সময়ও নীলা অফ। যা দু-একটা কথাও বলছে, সেগুলো ঝাঁজাল। দলের যে আনন্দ ছিল, তার তাল পুরোই কেটে গেল। পাঁচ বন্ধুর সেলফিও তোলা হলো না।

এরপর আরও একবার পাঁচ বন্ধুর আড্ডা। আড্ডা জমে ওঠার আগেই নীলার মেজাজ বদলে গেল। ফলাফল নিরানন্দ আড্ডা। এখন তো স্কুল জীবনের এই বন্ধু একসঙ্গে কোনো আয়োজনের পরিকল্পনাই করে না।

ইশতিয়াক-ফারহানা (ছদ্মনাম) দম্পতির বিয়ে হয়েছে বছরখানেক। ইশতিয়াক নিজে গাড়ি চালিয়ে লং ড্রাইভে যেতে পছন্দ করে। পাশে বসা ফারহানা। তারা যাচ্ছে মাওয়া ঘাটে ইলিশভাজা খেতে। দুজনের মেজাজই ফুরফুরে। অর্ধেক রাস্তা পেরোতেই ইশতিয়াক আবিষ্কার করল, ফারহানা একেবারে চুপ। পাশে নির্বাক স্ত্রী থাকলে টানা গাড়ি চালাতে বিরক্তই লাগছে ইশতিয়াকের। ধৈর্য ধরল। ঘাটে নেমেও একই অবস্থা। ফারহানা নির্লিপ্ত। ইশতিয়াক একবার তো বলেই বসল, ‘তোমার যদি মুড অফই হয়ে যায়, তবে আর আমরা এলাম কেন?’ ফারহানা বলল, ‘আমি ঠিকই আছি।’ ফেরার পথে দুজনই চুপ। ঢাকার কাছাকাছি এলে ফারহানা আবার কথা বলতে শুরু করল। ততক্ষণে লং ড্রাইভের গতি কিন্তু এলোমেলো হয়ে গেছে।

মেঘের যেমন অনেক রং, মনেরও রঙের শেষ নেই। তাই তো হয়তো আজকালকার ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ইমো, ইমোজির শেষ নেই। হাসিরই ইমো অনেক। কান্নারও শেষ নেই। চ্যাট করতে করতে এই হাসি তো এই কান্না তো আবার অট্টহাসির ইমো সহজেই দেওয়া যায়। কিন্তু কয়েকজন মিলে আড্ডা দিলে, কোথাও বেড়াতে গেলে একজনের ‘ইমো’ বদলে গেলেই পুরো মজাই মাটি। কারণ যাই হোক মুড সুইং আনন্দের পরিবেশে নিমেষেই আঁধার নামিয়ে আনতে পারে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top