ক্রেতাদের গলা কাটছে কক্সবাজারের শপিংমল গুলি; ১৪০০ টাকার কাপড় বিক্রি হয় ৫ হাজার টাকায়

Screenshot_2019-05-12-06-21-07-660_com.facebook.katana.jpg

আজিম নিহাদ :

মাত্র ১৪০০ টাকায় কেনা নারীদের একটি জামা বিক্রি করা হয় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায়। ৫ হাজার টাকার কাপড়গুলো বিক্রি করা হয় সর্বনিম্ন ১৯ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিদেশি শাড়ী বা জামাগুলোর দাম-তো প্রায় নাগালের বাইরেই।
এভাবে ক্রেতাদের গলা কাটছে শহরের মেগামার্ট ও সানাই ক্লথিং অ্যান্ড কসমেটিক্স শপিংমল। কাপড় ও প্রসাধনীর জন্য শহরের সবচেয়ে বড় এ দুটি শপিংমল। এত বড় শপিং হওয়া স্বত্বেও কোন কাপড়ের সঠিক বিক্রয়মূল্য ও মূল্য তালিকা নেই। শপিংমল কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছেমত অতিরিক্ত দাম হাকিয়ে বিক্রি করে প্রতিটি কাপড়। নির্ধারিত দামের তিন থেকে চারগুণ বেশি দাম আদায় করায় মারাত্মকভাবে ঠকছে ক্রেতারা। রমজানের ঈদ উপলক্ষ্যে মেগামার্ট ও সানাই শপিংমলে মূল্য বেড়ে গেছে আরও কয়েকগুণ।
ক্রেতাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (৯ মে) দুপুরে এ দুটি শপিংমলে হানা দেয় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিন্নাত শহীদ পিংকি। শুরুতে মেগামার্টে অভিযান চালানো হয়। সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম প্রায় এক ঘণ্টা সময় পার করে। এসময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতিরিক্তি দাম আদায়, কৌশলে ক্রেতাদের ঠকানো, ক্রয়মূল্য তালিকা গোপন করাসহ বিভিন্ন অপরাধ খুঁজে বের করেন। অভিযান চলাকালে কৌশলে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে মেগামার্টের মালিক। পরে মেগামার্টের মালিক জহিরুল ইসলামকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালীন সেখানে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানান, অভিযান চলাকালে স্টিকারে উল্লেখিত মূল্য এবং ক্রয়মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য খুঁজে বের করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেগামার্টের মালিকের কাছে ক্রয়মূল্য ভাউচার দেখতে চান। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা সময় নিয়েও ক্রয়মূল্যের ভাউচার দেখাতে ব্যর্থ হয় মেগামার্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া প্রতিটি কাপড়ের উপর যে মূল্য লিখে দেওয়া হয়েছে, সেটি কিসের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে জানতে চাইলেও কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তারা। অভিযানে মারাত্মকভাবে গ্রাহক ঠকানোর প্রমাণ পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত।
কিছুদিন আগে মেগামার্ট থেকে বউয়ের জন্য বিয়ের শাড়ি কিনেছিলেন এক ব্যক্তি। কাকতালীয়ভাবে বৃহস্পতিবার অভিযানের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ভুক্তভোগি ওই ক্রেতা। যে শাড়ি তিনি ১৯ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করেছিলেন; অভিযানের সময় সেই শাড়ির বিক্রয়মূল্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জানান মাত্র ৫ হাজার টাকা। তার কাছ থেকে প্রায় চারগুণ অতিরিক্ত মূল্য হাতিয়ে নিয়েছিল মেগামার্ট কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগি ওই ক্রেতা দৈনিক কক্সবাজারকে জানান, সারা বছরজুড়ে গলাকাটা বাণিজ্য করে মেগামার্ট। নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে তারা। রমজানের ঈদে হলেও অন্তত এসব কসাইদের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। মেগামার্টে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হওয়ায় সন্তুষ্ট তিনি।
একইভাবে সানাই ক্লথিং অ্যান্ড কসমেটিক্স শপিংমলেও গলাকাটা বাণিজ্য চলছে। মূল্য তালিকা প্রদর্শন ছাড়া নিজেদের ইচ্ছেমত দাম বসিয়ে দেশি-বিদেশি কাপড় বিক্রি করে ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে নির্ধারিত দামের ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি দাম।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিন্নাত শহীদ পিংকি বলেন, মেগামার্ট ও সানাইতে চরম গলাকাটা বাণিজ্য চলছে। নূন্যতম নিয়ম-কানুন মানা হচ্ছে না। কৌশলে গ্রাহকদের আর্থিকভাবে ঠকানো হচ্ছে। নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা, অবহেলা দ্বারা সেবাগ্রহীতার অর্থহানি এবং বিক্রয়যোগ্য মূল্যের ভাউচার না থাকায় ভোক্তা অধিকার আইনে ৪০ হাজার টাকার জরিমানা করা হয়। একই অপরাধে সানাইকেও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ঠকার জন্য গ্রাহকরাও কমবেশি দায়ী। মেগামার্টসহ বেশ কয়েকটি দোকানে দেখলাম নারী ক্রেতারা কখনো ক্রয়মূল্য বা মূল্য তালিকা দেখতে চায় না। দোকানদাররা যে দাম হাকিয়ে বসে, সেটি কোন রকম কষাকষি করে কিনে নেয়। এরফলে তাদেরকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। তাই অতিরিক্ত দাম আদায়ে ঠেকাতে শুধু অভিযান করলে হবে না গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে। রমজানজুড়ে কোন ক্রেতা অভিযোগ করার সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিন্নাত শহীদ পিংকি বলেন, প্রতিটি দোকান বিশেষ করে কাপড়ের দোকানগুলোকে প্রকাশ্যে মূল্য তালিকা প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়া হয়। পুরো রমজান মাসে এ ধরনের অভিযান আরো পরিচালনা করা হবে। কোন অবস্থাতেই অতিরিক্ত দাম আদায় করতে দেয়া যাবে না।
অভিযানের সময় সেখানে উপস্থিত ক্রেতারা প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। কয়েকজন নারী ক্রেতারা জানান, কাপড়ের দোকানদাররা ইচ্ছেমত দাম নির্ধারণ করে দেয়। বিশেষ করে রমজানে মাত্র ৫০০ টাকার কাপড় ৩ হাজার টাকা হয়ে যায়। তাদের সাথে ঠিকমত কথাও বলা যায় না। প্রশাসন এভাবে কঠোর ভূমিকা পালন করলে অতিরিক্ত মূল্য আদায় ঠেকানো সম্ভব।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top