বার্ডস আই...

নববর্ষ ও স্বকীয়তা

Presentation1-20.jpg

– মাহ্ফুজুল হক

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ ১৪২৬। বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের বিশাল অর্জন একটি আলাদা ক্যালেন্ডার, একটি সৌর সন, দিন ক্ষণ গণনার স্বকীয় একটি ব্যবস্থা। একটি পরিপূর্ণ জাতিসত্ত্বারূপে যে ক’টি উপাদান একান্ত অপরিহার্য ও গৌরবের তন্মধ্যে নিজস্ব ক্যালেন্ডার তার বড় একটা অংশ জুড়ে আছে। আমরা সেই গৌরবের গর্বিত ধারক। বর্ষ বরণের এই শুভক্ষণে সকল বাংলাভাষীকে জানাই শুভেচ্ছা, শুভ নববর্ষ।
আকাশে স্থাপিত চাঁদ, সূর্য, তারকারাজী মানুষের সময় গণনা ও বিভিন্ন বিষয়ের হিসাব রাখার জন্য বাস্তব, জীবন্ত ও স্থায়ী ক্যালেন্ডার যেগুলো দেখে মানুষ আজ কোন্ দিন, কত তারিখ, কোন্ ঋতু তা অনায়াসে বলে দিতে পারে। মহান স্রষ্টার উল্লিখিত নিদর্শনগুলো প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অদ্যাবধি আরও বহুবিধ সেবার পাশাপাশি এই সেবা দিয়ে চলেছে। ক্যালেন্ডার, পঞ্ছিকা ইত্যাদি আবিষ্কারেরও হাজার হাজার বছর আগ থেকে মানুষ আকাশে স্থাপিত জীবন্ত ক্যালেন্ডার দেখেই সময়ের হিসাব রাখতো। সঠিকভাবে দিন তারিখের হিসাব রাখার জন্য চাঁদে রয়েছে ক্রমবর্ধমান ও ক্রমহ্রাসমান ব্যবস্থা। ঋতুর ভেদ বুঝার জন্য রয়েছে সূর্যের উদয়াস্ত কাল, স্থান ও তাপমাত্রার তারতম্য। রাত ও দিনের ছোট বড় হওয়া এবং বিভিন্ন মৌসুমে বিশেষ বিশেষ তারকারাজীর উদয় ও অন্তরাল যাত্রা ঋতুর ভিন্নতা প্রকাশ করে। বিশেষ বিশেষ দিনের (২৪ ঘন্টা) বিশেষ সময়ে তারকার উদয়, অবস্থান ও অস্ত যাওয়া সঠিক সময় (ঘন্টা) নির্দেশ করে। মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোময় আর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব।’ চাঁদ-সুরুজ-গ্রহ-তারা ও রাত-দিন প্রভৃতির আনুক্রমিক হিসাব কষে গবেষকগণ বের করেছেন বিভিন্ন ক্যালেন্ডার ও পঞ্ছিকা। তার কোন কোনটি সৌর বর্ষ (সোলার ইয়ার) হিসাবে আবার কোন কোনটি চান্দ্র বর্ষ (লিওনার ইয়ার) হিসাবে।
এখন কেউ যদি বলেন, যেহেতু চাঁদ-সূর্য আমাদের এতবড় উপকার করছে তাই তাদের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাদের সম্মান করা, পূজা করা উচিত। পৌত্তলিকেরা তা-ই করেন বটে। এধরণের কর্মকান্ডকে বিবেকবান মানুষ কৃতজ্ঞতার প্রকাশ বলবেন, না চরম কৃতঘœতা বলবেন, জানি না। যদি কেউ বলেন, মোবাইল ফোনের ছোট্ট হ্যান্ডসেটটি কতোভাবেই না মানুষের উপকার করছে – যখন তখন দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে থাকা যে কারো সাথে কথা বলা যায়, ছবি দেখা যায়, গান শোনা যায়, বার্তা আদান প্রদান করা যায়, খেলাধুলা করা যায়, দেখতেও সুন্দর ইত্যাদি আরো কতো কী। এত সেবা যখন সে আমাদের করছে তো অন্ততঃ সকাল সন্ধ্যা দু ’বেলা তার পুজা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত নয় কি ? কিন্তু ঐ বিশেষ যন্ত্রটি যে পদ্ধতিতে কাজ করার জন্য তার স্রষ্টা (নির্মাতা) কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থা করে রেখেছেন তার বাইরে সে কিছুই করতে পারে না এবং নির্দিষ্ট একটি মেয়াদান্তে সে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করাও এক ধরণের কৃতজ্ঞতা। এছাড়াও কৃতজ্ঞতা যদি প্রকাশ করতেই হয় তবে নির্মাতা বা আবিষ্কারকেরই করা যুক্তিযুক্ত নয়কি ? তদ্রপ সূর্য-চন্দ্র ইত্যাদিকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছেন – এক্ষেত্রে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা কী হওয়া বিধিসম্মত ? মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘তিনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান আর দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান আর তিনিই সূর্য ও চাঁদকে বশীভূত করে দিয়েছেন ; প্রত্যেকে পরিভ্রমণ করছে একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত।’ ‘আর তিনি তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিনকে এবং সূর্য ও চাঁদকে।’ ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ। তোমরা না সূর্যকে সিজদা করবে, না চাঁদকে। আর তোমরা আল্লাহ্কে সিজদা কর যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন।’
৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৫ খৃষ্টাব্দে ভারত সম্রাট আকবর এর নির্দেশে তাঁর অমাত্য আমির ফতেহ্ উল্লাহ্ সিরাজী হিজরি সনকে ভিত্তি করে চান্দ্র হিসাবের স্থলে সৌর হিসাবে দিন গণনা প্রক্রিয়ায় ইলাহী সন বা ফসলি সনের উদ্ভাবন করে বাংলা সন নামে চালু করেন। সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহন বর্ষকে স্মরণীয় করার জন্য হিজরি ৯৬৩ এবং ১৫৫৬ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল থেকে বৈশাখকে প্রথম মাস ধরে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। পূর্ব ভারতের কৃষিজীবী মানুষ কর প্রদানের পরিবর্তে ফসলের একটি অংশ রাজস্ব হিসাবে প্রদান করতো। তাদের সুবিধার্থেই বাংলা সন প্রবর্তিত হয় যাকে ফসলি সনও বলা হয়। এই সনের প্রতিষ্ঠাতা ও আবিষ্কারক মুসলমান আর হিজরি সনের আদলে প্রবর্তিত হওয়ায় ভারতের পূর্বাঞ্চলের মুসলমানরাই এই সনটিকে বাংলা সন হিসাবে গ্রহণ করেন। এই সনের সাথে মুসলমানী সংশ্লিষ্টতা থাকায় হিন্দুরা এর অংশত পরিবর্তন ঘটিয়ে একে শকাব্দ বা বিক্রমাব্দে পরিণত করার যারপরনাই চেষ্টা করে চলেছেন। তাই তো আমরা দেখি, বাংলাদেশের মুসলমানরা বাংলা সন আর পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুরা অনুসরণ করেন শকাব্দ সন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি। তিন দিনের এই অনুষ্ঠানকে চাকমারা ফুলবিঝু, মূলবিঝু, গোজ্যপজ্যেদিন ; ত্রিপুরারা হারিবৈসু, বিষুমা, বিচিকাতাল এবং মারমারা পেইংচোয়ে, আক্যে ও আতাদা বলে। পাহাড়ের এই উৎসব সমতলে বৈসাবি নামে পরিচিতি পেলেও উপজাতিরা সম্প্রদায় ভেদে নিজস্ব নামে ডাকে। চাকমারা বিঝু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, অহমিয়ারা বিহু নামে উৎসব উদযাপন করে। তবে উদযাপন রীতি ও দিন একই হওয়ায় উৎসবের আদ্যক্ষর নিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে বৈসাবি। উৎসবের প্রথম দিনে উপজাতি জনগোষ্ঠী ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, ফুল দিয়ে বাড়ি সাজায়, নদী বা ছরায় গিয়ে দল বেঁধে ¯œান করে এবং নদী থেকে পানি তুলে গ্রামের বৌদ্ধ মন্দিরের বুদ্ধমূর্তি, বৌদ্ধসাধক ও গ্রামের বয়স্ক লোকজনকে ¯œান করায়। তারপর সারাদিন চলে পরবর্তী দিনের খানাপিনার আয়োজন। বছরের শেষ অর্থাৎ উৎসবের দ্বিতীয় দিনে সবার বাড়ির দ্বার খোলা থাকে সবার জন্য। এদিন ধনী-গরিব, সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ মুছে গিয়ে সবাই সবার বাড়িতে বেড়াতে যায়। যার যা সামর্থ্য তা খেতে দেয়। এদিন শিশুরা নতুন পোষাক পরে নিজেদের বাড়ি থেকে ধান বা চাল নিয়ে দল বেঁধে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মোরগ-মুরগিকে খেতে দেয়। মুরুব্বিদের বাড়ি গিয়ে প্রণাম করে। এসময় গৃহস্থরাও ছেলেমেয়েদের ডেকে নানা মুখরোচক খাবার খেতে দেন। তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীসহ নানা বয়সীরা দল বেঁধে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি, পাড়া-গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। কোন কোন দল ঘুরে বেড়ায় নেচে-গেয়ে। তৃতীয় দিন অর্থাৎ নববর্ষের সকালে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালন, মুরুব্বিদের বাড়িতে ডেকে এনে ভালো খাবার পরিবেশন করে আশির্বাদ গ্রহণ আর সন্ধ্যায় বাড়ির আঙিনা, গোয়ালঘর, নদীর ঘাট, চৌরাস্তা ও বাড়ির পাশের গাছের নিচে নতুন বছরের সুখ-শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে মোমবাতি জ্বালানো হয়।
১২ থেকে ১৯ এপ্রিল আটদিন ব্যাপী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন সম্প্রদায় সাংগ্রে পোয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করে। এ ধর্মীয় উৎসবকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। তন্মধ্যে ১২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ধর্মদেশনা, উপাসনা, বৌদ্ধমূর্তিকে গোসলসহ বিভিন্ন কর্মসূচী এবং ১৭ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নারী-পুরুষের পানি খেলার (জলকেলি) মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হয়। জানা যায়, ১২ এপ্রিল রাখাইন ছাত্র-ছাত্রীগন বৌদ্ধমূর্তিকে গোসল দেন এবং ১৩ এপ্রিল সর্বস্তরের জনগন বৌদ্ধমূর্তিকে গোসল দেন। ১৪ এপ্রিল রাখাইন সম্প্রদায়ের বয়োবৃদ্ধরা প্যাগোড়ায় গিয়ে উপাসনা করেন। ১৫ ও ১৬ এপ্রিল রাখাইন সম্প্রদায়ের সর্বস্তরের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ প্যাগোড়ায় গিয়ে উপাসনা করেন। তন্মধ্যে উভয় দিন সকালে অষ্টশীল গ্রহন, দুপুরে পিন্ডদান, বিকেলে ধর্মদেশনা ও সন্ধ্যায় প্রদীপ পূজা করা হয়। ১৭, ১৮, ১৯ এপ্রিল বিভিন্ন স্থানে পৃথক পৃথক প্যান্ডেল তৈরি করে রাখাইন মহিলা- পুরুষ পানি খেলার মধ্য দিয়ে সাংগ্রে পোয়ে উৎসব পালন করেন।
বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকে বহিরাগত কর্নাটকের অধিবাসী সেন বংশীয় ব্রাহ্মণদের শাসন আমলে তারা সংস্কৃতকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং জাতিভেদ প্রথার প্রবর্তন করেন। দেব দেবীর পূজা উপলক্ষে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, হোম, আরতি ও কাঁসার ঘন্টার প্রচলন করেন যা বর্তমানে হিন্দুদের বিভিন্ন অর্চনায় আমরা আচরিত হতে দেখি। এইসব আচরণ হচ্ছে পৌত্তলিক ধর্ম বিশ্বাসের প্রতীক। তদুপরি বিভিন্ন জীব জন্তুর মুখোশ পড়ে আনন্দ উৎসব করা নি¤œ বর্ণের হিন্দুদের গাজন ও হরি উৎসবের সাথে সংশ্লিষ্ট। গাজনের মেলায় ডোম, মেথর ও চন্ডাল শ্রেণির হিন্দুরা বহুরূপী সঙ সেজে তাদের উৎসব করে। চৈত্রের শেষে চৈত্র সংক্রান্তি ও ১লা বৈশাখের প্রথম প্রহরে তিতা খাবার মুখে দিয়ে পর পান্তা ভাত খাওয়া, বাদুর-বাঘ-বানর-হনুমান-পেঁচা-রাক্ষস-খোক্ষস ইত্যাদি জান্তব মুখোশ পড়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে রাস্তায় নারী পুরুষের নৃত্য, মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, কাঁসার ঘন্টা ও শাঁখ বাজানো, গলায় পৈতা, গেরুয়া রঙের পোষাক পড়ে বৈরাগীর একতারার সাথে নাচ গান প্রভৃতি কর্মকান্ড পুরোপুরি হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট পৌত্তলিকদের ধর্ম বিশ্বাস সঞ্ছাত। নববর্ষের দিনটিকে আমরা বলি, পহেলা বৈশাখ আর পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুরা বলেন, পয়লা বৈশাখ। নববর্ষের দিনে হিন্দুরা হাতি-মুখ সদৃশ দেবতা গণেশের পূজো করেন। কুর্তার সাথে ধুতি পড়ে দাদাবাবু সাজা, সাদা শাড়ি ব্লাউজ পড়ে খোলা মাথায় ভোরে ওঠে রমনা বটমূল ও অন্যান্য স্থানে পূর্বমুখী হয়ে সূর্য উদয়কালে নারী পুরুষ সম্মিলিতভাবে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি সমস্বরে গেয়ে সূর্য পূজার ঢংয়ে নববর্ষের প্রথম সূর্যকে আবাহন করার মাঝে – যুক্তি ও কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ কোন্ বার্তা পান ? অত্যন্ত সন্তর্পণে, সুকৌশলে ও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ছদ্মাবরণে মুসলমানদের মাঝে পৌত্তলিকতা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এর সাথে বাঙালি মুসলমানের দূরতম সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্টতা তো নাই-ই, এমনকি বাংলা সন এর প্রবর্তন ও আবহমান বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতির সাথেও তা আদৌ সম্পর্কীত নয়। মুসলমানদের মাঝে সুকৌশলে সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি চালু করা, পৌত্তলিক ধর্ম বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট আচার অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে এক ইলাহ্ বিশ্বাসী মুসলমানগনের মধ্যে শিরকী বা বহুত্ববাদী বিশ্বাসের ধারণা অনুপ্রবিষ্ঠ করিয়ে দেয়ার সুদূরপ্রসারী এক পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই এইসব অপতৎপরতা।
উপরের বর্ণনা থেকে বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের একটি বিবরণী পাওয়া গেল। মজার ব্যাপার হলো, উভয় সম্প্রদায়ের উৎসব দু’টিই চৈত্রের শেষ ও বৈশাখের প্রারম্ভে উদযাপিত হয়। তারা তাদের উৎসব উদযাপন করেন স্বীয় ধর্মীয় চেতনার আলোকে। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘বলা হয়, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। তেরো কেন, তার বেশি। তবে বেশির ভাগ পার্বণই আমাদের ধর্ম পালনের সঙ্গে যুক্ত – ঈদ, পূজো, ক্রিসমাস, বৌদ্ধপূর্ণিমা। দেশের সব ধর্মের মানুষ যেখানে সহজে মিলতে পারে, তেমন উৎসব বাঙালির নববর্ষ।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল, ২০১২) চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী ওই একই সংখ্যায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা যেভাবে শুরু হলো’ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন, ১৯৮৯ সালে চারুশিল্পী সংসদে বসে ঢাকায় পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণের শোভাযাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথমে কিন্তু এর নামকরণের কথা ছিল বৈশাখী শোভাযাত্রা। আলাপ-আলোচনার পর আমরা যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রা নামটাই ঠিক রাখলাম। আর শিল্পী তরুণ ঘোষ তখন বিদেশ থেকে শিখে এসেছেন কীভাবে মুখোশ বানাতে হয়। শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারের প্রিয় ছাত্র জুইস। তিনি শিখিয়ে দিলেন কীভাবে মুখোশ তৈরি করতে হবে। তখন দেশে অগণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চলছিল। আমরা চেয়েছিলাম সেখানে একটা আঘাত করতে। তাই শোভাযাত্রায় রাক্ষসকে স্বৈরশাসকের প্রতিরূপ হিসেবে দেখানো হয়েছে।’ এদেশের কতিপয় বুদ্ধিজীবি সমাজ এভাবেই স্বীকৃত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে সচেতন বা অবচেতন অবস্থায় সর্ববাঙালির সর্বজনীন উৎসবের নামকরণে চালু করে দিয়েছেন এবং লেখনি, বক্তব্য ও আনুষ্ঠানিকতা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম ও সাধারন দেশবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন যে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চৈত্রের শেষে চৈত্র সংক্রান্তি ও ১লা বৈশাখের প্রথম প্রহরে তিতা খাবার মুখে দিয়ে পর পান্তা ভাত খাওয়া (ইদানিং যোগ হয়েছে ইলিশ মাছ), বাদুর-বাঘ-বানর-হনুমান-পেঁচা-রাক্ষস-খোক্ষস ইত্যাদি জান্তব মুখোশ পড়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে রাস্তায় নারী পুরুষের নৃত্য, মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, কাঁসার ঘন্টা ও শাঁখ বাজানো, গলায় পৈতা, গেরুয়া রঙের পোষাক পড়ে বৈরাগীর একতারার সাথে নাচ গান আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সাজগোজ, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা, আনন্দ উল্লাস প্রভৃতি বিষয়ের মিশ্রিত রূপ দিয়ে শ্বাশত বাংলার নববর্ষ উদযাপন নামক ‘তেমন উৎসব বাঙালির নববর্ষ’। আরো আরো পরে দেবতা গণেশের পূজাও ভিন্ন আঙ্গিকে শুরু হয়ে যায় কিনা – ভবিতব্যই বলতে পারে। সেদিন এক টিভি টকশো’তে নাট্যকার জাকারিয়াকে বলতে শুনলাম যে, চারুকলা ইনস্টিটিউটের কতিপয় শিক্ষক-ছাত্র মিলে একটি মিছিল করলেন, ছায়ানট রমনা বটমূলে গানের আসর বসালেন, আর তাকে বলা হচ্ছে জাতীয় ঐতিহ্য। সেটা কীভাবে হলো ? আবহমান গ্রাম বাংলার মানুষের নববর্ষ কেন্দ্রিক আচরিত রূপটিকে সামনে আনা হচ্ছে না কেন ?
আমার শ্রদ্ধেয় অগ্রজ অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন গতকাল ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ দৈনিক আজকের দেশবিদেশ পত্রিকায় একটি কলামে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি, ‘সুতরাং এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বাঙালী ঐতিহ্যের সাথে গুলিয়ে ফেলা নিতান্ত ভুল ধারণা। এখানে মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে উলঙ্গ বক্ষের নারীর প্রতিমা, দূর্গার বাহন পেঁচা, অশুর রাক্ষস, আর হাতী কোনটাই থাকার কথা নয়।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘আমি দেখেছি মঙ্গল শোভাযাত্রায় ছেলে মেয়েদের যে যুগলবন্দীর কাজ চলে। … তাই বলছিলাম কি মিডিয়ামেনরা বর্ষবরণে এসব নোংরামি, শ্লীলতাহানি জামাতশিবিরের ঘাড়ে চাপালেও আদৌ তা নিজেদের যুগলবন্দীদের কাজ কিনা তা ও ভেবে দেখার বিষয়। … এর পর এই শোভাযাত্রাকে বাধ্যতামূলক করার কথা উঠেছে কেন? পান্তা ইলিশ তো কেউ খেতে মানা করেনি। … কেউ যদি মঙ্গল শোভার পক্ষ নিতে চায় নিক। কেউ যদি এর পক্ষে বলতে চায় বলুক। তবে আমি চাই যাকিছু হোক মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে যেন আমার বোনের শ্লীলতা হানি না হয়। শ্লীলতা হানির যেন বিচার হয়। সংস্কৃতি এবং তার অনুসঙ্গ গ্রহন বর্জনের অধিকার থাকুক ১৭ কোটি বাঙালীর হাতে।’
আলোচনায় একটি বিষয় পরিষ্কার হলো যে, হিন্দু ও বৌদ্ধরা নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজনে তাঁদের ধর্ম বিশ্বাসকে সামনে এনেছেন এবং পুরো অনুষ্ঠানটিকে সেই আলোকেই সাজিয়েছেন। স¤্রাট আকবর প্রবর্তিত বাংলা সনই যদি তাঁরা মানেন তাহলে তাঁদের ধর্ম প্রবর্তনের বহু বছর পরের এই বাংলা সন বরণ অনুষ্ঠানকে তাঁরা কীভাবে ধর্মীয় লেবাসে মোড়ালেন- বুঝে আসে না। হয়তো ধর্ম প্রবর্তনের অনেক অনেক পরেও তাঁদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যোগ বিয়োগের সুযোগ অবারিত আছে, তাই। যা কিনা ইসলাম ধর্মে শুধু অকল্পনীয়ই নয়, অমার্জনীয় অপরাধও বটে। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান পালনকালে সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের ইতিহাস-ঐতিহ্য স্মরণ করা, সেই বিশেষ কর্মটির আরো উৎকর্ষতা সাধনে অনুপ্রাণিত ও সচেষ্ট হওয়া আর নির্মল আনন্দ উদযাপন করা যায়। সে সকল আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম যেমন ঐতিহ্য সচেতন ও সত্য সন্ধানী হয় সাথে সাথে স্বীয় স্বকীয়তা বজায় রেখে আনন্দ উৎসব করতে পারে তার ব্যবস্থা নেতৃস্থানীয়দেরই করা উচিত। অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হওয়ার পর বন্ধুবেশী দুষ্ট কীটের ব্যাপারে সতর্ক থাকা অতি জরুরি এবং বন্ধুত্বের ছুঁতায় আগ পিছ না ভেবে যে কোন তৎপরতায় জড়ানো চরম মূর্খতা বৈকি। তথাকথিত কিছু প্রগতিবাদী (পশ্চাৎবাদী!) ব্যক্তির অপরিণামদর্শী চটকদার অনুষ্ঠানের শিকার হয়ে অপসংস্কৃতির গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দেয়া কোন মুসলমানের কাজ হতে পারে না। নতুন মাস বা চাঁদকে স্বাগত জানানোর পদ্ধতি কিন্তু আমাদের নবীজী মুহাম্মদ সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম শিখিয়েছেন এই ভাষায়, ‘আল্লাহ্ মহান, হে আল্লাহ্, এই নতুন চাঁদকে আমাদের নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে এবং যা তুমি ভালবাস আর যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও, সেটাই আমাদের তৌফিক দাও। তিনি আমাদের ও তোমার (চাঁদের) প্রভু।’
(রিপ্রিন্টেড আফটার মোডিফিকেশন) সেল : ০১৮৬৯ ৮৬৬৯০০ কক্সবাজার ১৪.০৪.২০১৯

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top