যে কারণে ছাত্রী হলে ব্যতিক্রম

Presentation2-35.jpg

মেনে নেয়া এবং মানিয়ে নেয়ার এই সময়ে অন্যরকম এক নজির গড়লেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। অন্যায়ের প্রতিবাদে সরব হলেন তারা। এতেই থামেননি। জয়ও ছিনিয়ে এনেছেন। ঐতিহাসিক বিজয়। প্রচলিত রাজনীতির প্রতি যেন অনাস্থাও দেখালেন তারা।

শুরুটা করেন কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রীরা। ভোট কারচুপির প্রচলিত বয়ানের যেন প্রমাণ হাজির করলেন তারা। ঘটান রীতিমতো বিস্ফোরণ।

তারা সিল মারা ব্যালট পেপার উদ্ধার করে তা হাজির করে মিডিয়ার সামনে। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল করে তুলে ক্যাম্পাস। অবরুদ্ধ করে প্রভোস্ট, প্রক্টরকে। এর রেশ গিয়ে পড়ে রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল, সুফিয়া কামাল হলসহ সকল ছাত্রী হলে। বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক নির্বাচনী অনিয়ম। সোমবারের ডাকসু নির্বাচনে কলঙ্কের ছাপ নিয়ে সর্বত্র এখন আলোচনা, সমালোচনা। যে ছাত্রী হল থেকে অনিয়ম প্রকাশ্যে আসে সেই ছাত্রী হলগুলোর চারটিতে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্যানেলের শিক্ষার্থীরা। সর্বত্র বলাবলি হচ্ছে, ছাত্রীরা সরব ও সতর্ক ছিল বলেই এমন ফল হয়েছে। অন্যদিকে গোটা নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনের দিন সকালে হলে হলে নির্বাচনী সামগ্রী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েও তা রাখেনি। রাতেই নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে যায় হলে হলে। যদিও বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। কিন্তু কাজ হয়নি।

রাতের ভোট এখন বাংলাদেশে বহুল আলোচিত। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষের মুখে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে এটা। ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন আগের রাতেই হয়ে গেছে এমন মত এখন অনেকের। এতে ভোটের রাজনীতিতে আসে নতুন সংস্কৃতি। জাতীয় নির্বাচন কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে এমনটা হবে দেশবাসী মোটামুটি মেনেই নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস ঐতিহ্যের ডাকসু নির্বাচনে যে এমনটা ঘটবে তা কেউ আশা করেনি। ডাকসুর ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার এ নির্বাচন নিয়ে তাই দেশজুড়ে আলোচনা। মিডিয়ার কল্যাণে তা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। এমন ইতিহাস ডাকসুকে নিয়ে- যা কল্পনাতীত। তাইতো সোমবার নির্বাচনের দিনই সাধারণ ছাত্র ও ছাত্রীরা মাঠে নেমে আসে। অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে ঢাবি ক্যাম্পাস। মঙ্গলবার থেকে ডাকা হয় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট।

অন্যদিকে ভিপি পদ হারিয়ে ছাত্রলীগও মাঠে নামে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি নিয়ে। এ অবস্থায় লক্ষণীয় যে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সকল ছাত্র সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্যানেলও নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে আওয়াজ তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন কি করবে? যদিও এ অবস্থায় প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বিব্রত বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সোমবার ভোট বর্জন করা ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা তার দপ্তরে গেলে তিনি তাদের কাছে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তার অভিমত লিখেছেন একটি জাতীয় পত্রিকায়। সেখানে তিনি বলেছেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শুধু তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা আগ্রহ ও আশার সঞ্চার হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, সবাই আশা করেছিল ডাকসু নির্বাচন এর জবাব দেবে। অর্থাৎ উল্টোটা করে দেখাবে। বাস্তবে দেখা গেল ডাকসু নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শুধু ছাত্রলীগ ছাড়া সবাই প্রত্যাখ্যান করলো। এটা খুবই হতাশার বিষয়।

গতকালও ঘোষিত ভিপি নুরুল হক নুরু চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে শুধু ভিপি পদই নয় সকল পদে জয়ী হতেন বিরোধী প্যানেলের সদস্যরা। সুষ্ঠু নির্বাচনে ছাত্রলীগ যদি একটি পদেও জিততে পারে তাহলে তিনি ভিপি হয়েও পদত্যাগ করবেন। ওদিকে গতকালও নুরুসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনে অনিয়ম, আগে থেকে ব্যালট পেপারে ক্রস দিয়ে রাখা, অনেক শিক্ষার্থীকে ভোট দিতে না দেয়ার নানা অভিযোগ নিয়ে প্রথম হাজির হন কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রীরা। সেই কুয়েত মৈত্রী হলসহ চারটি হলেই জয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এখানে ভিপি পদে জিতেছেন সুস্মিতা দে। আর জিএস পদে জিতেছেন সাগুফতা বুশরা মিশান। শামসুন্নাহার হল ছাত্র সংসদে স্বতন্ত্রদের প্যানেলের আট প্রার্থীর সবাই জয়ী হয়েছেন। ভিপি পদে জয়ী হয়েছেন শেখ তাসনিম আফরোজ।

জিএস নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্যানেলের আফসানা ছপা। এছাড়া এজিএস পদে ফাতিমা আক্তার, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে সামিয়াজ জাহান প্রাপ্তি, সাহিত্য সম্পাদক পদে তাহসিন, সমাজসেবা সম্পাদক পদে শিরিন আক্তার, অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া সম্পাদক পদে খাদিজা বেগম ও সদস্য তামান্না তাসনিম উপমা নির্বাচিত হয়েছেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ভিপি হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রিকি হায়দার আশা। এই হলে জিএস পদে জয়ী হয়েছেন ছাত্রলীগের সারা বিনতে জামান। কবি সুফিয়া কামাল হলে ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্যানেলের তানজিনা আক্তার সুমা এবং জিএস পদে একই প্যানেলের মনিরা শারমিন জয়ী হয়েছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। আরও একবার তারা দেখালেন অনিয়মের প্রতিবাদে এখন তারা সম্মুখ সারিতে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top