রিকশা চালিয়ে ৯ বিদ্যালয় করেছেন আহমেদ আলী

Presentation1-107.jpg
আহমেদ আলী। ছবি : আইএএনএস

তার ছেলে যখন জন্ম নেবে, ঠিক তখনই তিনি বুঝতে পারলেন, সন্তানের জন্য সঠিক শিক্ষা পাওয়া হবে অনেক দূরের স্বপ্ন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পরের প্রজন্মকে আর অভাব-অনটনে ভুগতে দেওয়া যাবে না। নিজেই হাত লাগান বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে। এভাবে একে একে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ৯টি বিদ্যালয়ের।

মহান এই ব্যক্তির নাম আহমেদ আলী। পেশায় রিকশাচালক। বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা ভারতের রাজ্য আসামের করিমগঞ্জের একটি প্রান্তিক গ্রামের বাসিন্দা তিনি। রিকশা চালিয়ে জমানো টাকায় বিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

আহমেদ আলী বলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছা এবং গ্রামের মানুষের আশির্বাদে আমি যা চেয়েছি তা অর্জন করতে পেরেছি।’

‘দারিদ্রের কারণ আমি বিদ্যালয়ে যেতে পারিনি। আমার গ্রামের মানুষও ছিল গরীব এবং একই কারণে বাচ্চারা বিদ্যালয়ে যেতে পারত না, এটা আমাকে খুব কষ্ট দিত। িআমি এই গরীভ পরিবারের বাচ্চাদের আর বিদ্যালয় থেকে ঝড়ে পড়া দেখতে চাইনি।’

দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এ কথাই বললেন আহমেদ আলী। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।

জীবীকার জন্য আহমেদ আলী কখনো মাটি কেটেছেন; অন্যের জমিতে মজুরও খেটেছেন বহুদিন। শেষ পর্যন্ত রিকশা চালানোকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। এখন তার বয়স ৮২ পেরিয়েছে।

আহমেদ আলী প্রথম বিদ্যালয়টি চালু করেন ১৯৭৮ সালে তার গ্রাম মধুরবন্দে। এজন্য তিনি তার কিছু জমি বিক্রি করেন এবং একটি অংশ দান করেন বিদ্যালয়কে, যে জমিতে বিদ্যালয় ভবন নির্মিত হয়। বিদ্যালয়ের তহবিলের ব্যবস্থাও করা হয় তার জমানো অর্থ, প্রতিদিনের রোজগার ও দান থেকে। বিদ্যালয়ের অর্থ সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য তিনি দিনে রিকশা চালাতেন, আর রাতে কাঠ কাটতেন।

এভাবেই বিদ্যোৎসাহী আহমেদ আলী তিনটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তার গ্রাম মধুরবন্দ ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘মন কি বাত’ নামের  রেডিও অনুষ্ঠানে আহমেদ আলীর গল্পকে উদাহরণ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন জানলাম যে  করিমগঞ্জের একজন রিকশাচালক গরিব ছেলেমেয়েদের জন্য ৯টি স্কুল তৈরি করেছেন, তখন বুঝলাম আমার দেশের ইচ্ছাশক্তি কতটা বেশি।’

আহমেদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, গ্রাম থেকে করিমগঞ্জ শহরে গিয়ে রিকশা চালাতেন তিনি। সেখানকার ছাত্রদের দেখে ভাবতেন, স্কুল থাকলে তার গ্রামের ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনা করতে পারত। তাই স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের তিন বিঘা জমি স্কুলের নামে লিখে দেন।

আহমেদ আলীর উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। এখন ওই বিদ্যালয়ে ২২৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশুনা করে। প্রবীণ এই বিদ্যোৎসাহী বলেন, ‘আমি শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল দশম শ্রেণী পর্যন্ত ব্যবস্থা করতে পেরেছি। তাদের একাদশ-দ্বাদশ পড়ার ব্যবস্থা নেই। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি অনুমোদন ও তহবিল প্রয়োজন। এর পর আমি একটা মহাবিদ্যালয় (কলেজ) প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

মোদির সঙ্গে দেখা হলে কী চাইবেন? -এমন প্রশ্নে জবাবে আহমেদ আলী বলেন, ‘আমি চাইব আমার প্রতিষ্ঠা করা সব বিদ্যালয় সরকারি অনুমোদন পাবে যাতে তহবিলের আর সমস্যা না হয়। আর আমি চাইব, সম্ভব হলে একটা জুনিয়র কলেজ ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।’

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top