এনজিওদের দখলে আবাসিক হোটেল ও ফ্ল্যাট ; পথে পথে পর্যটক

1_27900.jpg

ইমাম খাইর,
শীতের জীর্ণতা শেষে বইছে ফাগুণের হাওয়া। এরই মাঝে তিনদিনের টানা ছুটি। নতুন বছরের শুরুতে একটানা ছুটিতে পর্যটন নগরী ভরে গেছে দেশী বিদেশী পর্যটকে। বৃহস্পতিবার বিকালে থেকে পর্যটকদের ঢল নামতে থাকে। কক্সবাজার সাগর তীর, ইনানী সমুদ্র সৈকত, হিমছড়ি, সেন্টমার্টিন, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্কসহ দর্শনীয় স্থানসমূহে পর্যটকে ঠাসা। পর্যটন গল্প মাঠে চলমান বাণিজ্যমেলাতেও ভীড় জমেছে পর্যটকদের। শহরের আবাসিক হোটেলে থাকার জায়গা নাই। তাই অলিগলিতে রাত কাটাতে হয়েছে পর্যটকদের। খাবার হোটেলগুলোতে উপচেপড়া ভীড়।

কক্সবাজারে হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস, কটেজসহ প্রায় সাড়ে ৪শত আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব হোটেলের ৯০ শতাংশ রুম আগেই বুকিং হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ বাকিগুলোতেও বুকিং হয়ে গেছে। কোথাও থাকার কক্ষ নেই। অনেক আবাসিক হোটেল মালিক স্বাভাবিক ভাড়ার ৫ থেকে ৭ গুন বেশি হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পর্যটকদের।

এরপরও থেমে নেই পর্যটকদের স্রোত। মহেশখালীর সোনাদিয়া, আদিনাথ মন্দির, টেকনাফের মাথিনের কূপ, কদুম গুহা, রামুর রামকোট, ১শ ফুট সিংহশয্যা বৌদ্ধমূর্তি দেখতেও ভীড় জমাচ্ছে। কেনাকাটার জন্য শহরের বার্মিজ মার্কেট ও শুটকী মহালগুলোতে রাত অবধি পর্যটকে ভরপুর দেখা গেছে। শুক্রুবার পর্যটন শহরের অলিগলিতে শুধুই পর্যটক আর পর্যটক।

এদিকে, যাত্রীযাপনে হোটেলে রুম না পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নেয় কয়েক শতাধিক পর্যটক। সন্ধ্যার পর থেকে বেশ কিছু হোটেলে অতিরিক্ত ট্যারিফে রুম পেলেও অনেক পর্যটকের রাত্রীযাপনের ব্যবস্থা হয়নি। ফলে নানা ভোগান্তি ও সমস্যায় পড়ে কক্সবাজারে আসা পর্যটকমহল।

ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সী-হিলটপ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস এর স্বত্ত্বাধিকারী এস.এম কিবরিয়া খান বলেন, ৪০ বছর পরই এতগুলো পর্যটক একসঙ্গে কক্সবাজারে সমাগম ঘটেছে। গত দুই দিনে ৪ লাখের ওপর পর্যটক হবে। শহরের আবাসিক হোটেলগুলো আগেভাগেই বুকিং ছিল। পর্যটকদের কারণে রাস্তাঘাট প্রচুর জ্যাম দেখা দেয়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, ইনানী বীচ, সেন্টমার্টিন, হিমছড়িসহ জেলা সব দর্শণীয় স্থানে শুধু পর্যটক আর পর্যটক। থাকার জায়গা না পেয়ে অনেকে রাস্তায় কিংবা বাসে রাত কাটিয়েছে। তিনি পর্যটকদের সুবিধার্থে বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যাপ্ত পরিমাণ উন্মুক্ত চৌষাগার স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসন, বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবী তুলেন।

কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ নেতা মইন উদ্দীন ঢাকার কল্যাণপুর ও মিরপুর থেকে আসা ৫০ জনের একটি গ্রুপকে বিমানবন্দর সড়কস্থ একটি ফ্ল্যাট বাসায় থাকার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া শহরের ঝাউতলারস্থ একটি আবাসিক হোটেলের অডিটোরিয়াম হলে ২০ জন পর্যটকের রাত্রীযাপনের ব্যবস্থা করেন।

কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয় বলেন, ছাত্রলীগ মানবিক ছাত্র সংগঠন। হোটেলে রুম না পেয়ে অনেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলো। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক পর্যটকের রাত্রী যাপনের ব্যবস্থা করে আমাদের ছেলেরা। এনজিও কর্মকর্তারা কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলগুলোতে অফিস আর মাসিক ভিত্তিতে রুম নিয়ে নেয়ায় পর্যটকদের এ সংকটময় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করে ছাত্র লীগের এই নেতা।

২০০০ সালের শুরু থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে থার্টিফাস্ট নাইট, ইংরেজি বর্ষকে বিদায়-বরণ ও জানুয়ারির শীতকালিন ছুটির অবকাশ যাপনে কক্সবাজার আসতো লাখ লাখ পর্যটক। কিন্তু রামু ট্রাজেড়ির পর এ নিয়ম পাল্টে যায়। নানা আশংকায় তখন থেকে থার্টিফাস্ট নাইট পালনে ধরাবাধা নিয়ম বেধে দেয় প্রশাসন। মৌসুমের এ সময়টা তাই আগের মতো আর জমে না। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুর পর হতে সারা বছরই দেশী-বিদেশী সাংবাদিক, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারি, সরকারি নানা পর্যায়ের কর্মকর্তা মিলে সরবই রয়েছে পর্যটন জোনের সকল ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান। অনেক গেস্ট হাউজ ও ফ্ল্যাট পুরো মাসের জন্য বুকিং নিয়ে অফিস কার্যক্রম চালাচ্ছে এনজিও প্রতিষ্ঠান। হোটেলগুলো কমবেশি নিত্যদিন ব্যবসা করলেও বেশিরভাগ রুম খালি থাকত। তবে, সপ্তাহিক ছুটিসহ ভিন্ন ছুটি এক হলে পর্যটকে টইটুম্বুর হয়ে উঠছে কক্সবাজার। তেমনি ভাষা দিবসের ছুটির সাথে সপ্তাহিক ছুুটি মিলিয়ে টানা কয়েকদিন জমজমাট সৈকত নগরী। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জেলার পর্যটন স্পটগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। শুক্রবারও পর্যটকের স্রোত রয়ে গেছে।

কলাতলী পয়েন্টস্থ স্যন্ডিবীচের পরিচালক জি.এ খান বলেন, আশানুরূপ পর্যটক না আসাতে অনেক দিন ধরে আমাদের দেনা ছিল। দুই দিনের পর্যটকের সমাগমে তা অনেকটা আশা জাগিয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে পর্যটন ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে, ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বাড়তি আনন্দ যোগ করেছে পর্যটন গলফ মাঠে চলমান শিল্প ও বাণিজ্য মেলা। রাজপ্রাসাদের গেইটের আদলে গড়া প্রবেশ পথ ও শতাধিক নানা পণ্যের বাণিজ্যিক দোকান গুলো পর্যটকদের মনের খোরাক মেটাচ্ছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে স্থানীয় ভ্রমণ পিপাসুদের পাশাপাশি দূরের পর্যটকরাও মেলায় ঘুরে এটা, ওটা কিনছেন বলে জানান, মেলার প্রধান সমন্বয়ক সাহেদ আলী শাহেদ। নিরাপত্তা নিশ্চিত ও যেকোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মেলার ভেতর বাইরে পর্যাপ্ত সংখ্যক সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। কাজ করছে পুলিশসহ নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা।

কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, টানা ছুটি থাকলে ভ্রমন পিপাসুরা আগাম হোটেল কক্ষ বুকিং করেন। এবারও তেমনটি হয়েছে। প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ রুম বুকিং হয়েছে আগে আর বাকিটা বৃহস্পতিবার হওয়া শুরু হয়েছে। আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত কক্সবাজারের সর্বত্র জমজমাট থাকবে এমনটি আশা আমাদের।
এদিকে, পর্যটকদের আনন্দকে পূঁজি করে কিছু কিছু থাকা ও খাবার প্রতিষ্ঠানগুলোতে গলাকাটা দাম নেয়ার অভিযোগ করা হয় প্রায় সময়। তবে কোথায় অতিরিক্ত দাম নেয়ার অভিযোগ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম জয়।

কক্সবাজার ট্যুরিষ্ট পুলিশের পুলিশ সুপার জিল্লুর রহমান বলেন, নিরাপত্তা সেবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পর্যটকদের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিতে লাবণী, সুগন্ধা পয়েন্ট, মেইন বীচসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কয়েকটি টিম সার্বক্ষনিক কাজ করবে। মোটর সাইকেল নিয়ে সকাল ৮ থেকে রাত ৯ পর্যন্ত মোবাইল ডিউটিতে রাখা হয়েছে অপর টিম। এরা ছাড়াও জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা একাধিক টিমে বিভক্ত হয়ে মাঠে রয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, পর্যটন শহর হিসেবে সহজলভ্য সেবা নিশ্চিতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে। সে বিষয়ে বলা থাকে আবাসন সেবা প্রতিষ্ঠান গুলোকেও। যারা নীতি ভ্রষ্ট তারাই অভিযোগ সৃষ্টির কাজগুলো করে। পর্যটন এলাকায় ঘুরছে আমাদের ভ্রাম্যমান আদালতের কয়েকটি টিম। পর্যটকরা হয়রানির যেকোন অভিযোগ তাদের কাছে পৌঁছালে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top