নাইক্ষ্যংছড়িতে আনাইয়্যা বাহিনীর ভয়ে আতংকগ্রস্ত লক্ষাধিক মানুষ

Presentation1-4.jpg

মাইনুদ্দিন খালেদ :
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারি ও দৌছড়ি এবং কক্সবাজারের রামুর ঈদগড় ও গর্জনিয়ার পাহাড়ি এলাকা সমূহে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা দিনদিন বেড়েই চলেছে। ডাকাতি, খুন ও অপহরণ এখানকার নিত্য দিনের ঘটনা। যে সব ঘটনার নেতৃত্বে রয়েছে বহুল আলোচিত-কুখ্যাত আনোয়ার ওরফে আনাইয়্যা ডাকাত। যাকে র‌্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন খুঁজছে হন্য হয়ে বিগত ১ মাস। তার বাহিনী ও তার ভয়ে বর্তমানে এক লক্ষ মানুষ আতংকে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত দুই বছরে এ ৫ ইউনিয়ন থেকে শতাধিক বাসিন্দাকে অপহরণের পাশাপাশি সন্ত্রাসীরা বসতবাড়ি ও সড়ক ডাকাতি করেছে অর্ধশতাধিক। কোটি টাকার অধিক আদায় করেছে মুক্তিপণ। ফলে এই অঞ্চলের দু’লাখ বাসিন্দা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন এ আনাইয়্যা ডাকাতের আতংকে। এসবের নেপথ্যে রয়েছে এ আনোয়ার বাহিনী। সে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও খুন-অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে এ এলাকায়। তার সেকেন্ড-ইন কমান্ড হল গর্জনিয়া? হামিদ ডাকাত। তার বিরুদ্ধে ও পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে একই সাথে।
স্থানীয় সূত্রগুলো আরো জানান, নাইক্ষ্যংছড়ির বাঁকখালী নদীর মুখ, গর্জনিয়ার বেলতলী, বড়বিল, মাঝিরকাটা, কচ্ছপিয়ার ঘিলাতলী, কচ্ছপিয়া ঈদগড়-বাইশারি সড়কের ব্যাঙডেবা, করলিয়ামুড়া, চাইল্যাতলী, ইসলামাবাদের গজালিয়াসহ আশপাশ এলাকাজুড়ে আনোয়ার বাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব চলে। আনোয়ার বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অন্তত ৪০ জন। তাঁরা সবাই অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। সন্ত্রাসী আনোয়ারের গোয়েন্দা নেটওর্য়াক শক্তিশালী হওয়ায়, তার কাছে জনপ্রতিনিধি এমনকি পাত্তা পায়না পুলিশ কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক সময়ে খোদ বাইশারি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম ও বাইশারি পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) আবু মুসাকে মুঠোফোনে হত্যার হুমকি দেয় এ আনোয়ার। সম্প্রতি তাঁরা দুজন নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করেছেন এ বিষয়ে। এ বিষয়ে বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মূসা এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি প্রাণবাজি রেখে একাধিক অভিযানে আনোয়ার বাহিনীর ৯ জন দুর্ধষ সন্ত্রাসীকে আটক করেছেন সম্প্রতি।
গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বড়বিলের দুই সহোদর হত্যা ও নারাইম্যাঝিরিতে দুই ব্যক্তি খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল এ আনোয়ার ডাকাত । তাঁর বাহিনীর সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বর্তমানে। তাদের লাগাম টেনে ধরা উচিত। পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তার জন্যে গর্জনিয়ার মরিচ্যাচর এলাকায় একটি পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।’
বাইশারি ইউপির সদস্য আনোয়ার সাদেক বলেন, ‘আনাইয়্যা ডাকাতের ভয়ে ঈদগড়-বাইশারি সড়কে সন্ধ্যার পর যানবাহান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ইউনিয়নজুড়ে নেমে আসে অঘোষিত ‘কার্ফু। বাইশারির করলিয়ামুড়ার ঘোনারপাড়ায় নিজ বাড়ির পাশেই রয়েছে আনোয়ার বাহিনীর আস্তানা। সেখানে অস্ত্রধারীদের নিত্য আনাগুনো হলেও পুলিশ অনেকটা নিরুপায়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সন্ত্রাসী আনোয়ারের বাবার নাম মৃত আবদু সোবহান। তার স্ত্রী হামিদা বেগমকে সম্প্রতি একই গ্রামের ডাকাত আবদুল হাকিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। ওই মামলার প্রধান আসামি হলেন আনোয়ার। আনোয়ারের সঙ্গে অভ্যন্তরিন কোন্দলে ডাকাত আবদুল হাকিম খুন হন । এর আগে আনোয়ার বাহিনীর আব্দুর রশিদ ডাকাত ও সাহাব উদ্দিন ডাকাত কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারান। ডাকাত আনোয়ারের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় সাতটির অধিক অপহরণ, ডাকাতি এবং হত্যা মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ।’
এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, রাত নামলেই রামুর গর্জনিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারি এলাকায় আনাইয়্যা বাহিনীর তৎপরতা আরম্ভ হয়। ডাকাত আতঙ্কে রাতের বেলায় অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র রাত্রিযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। এরই মধ্যে আনাইয়্যার ভয়ে তার গ্রামের গোলজার বেগম ও মো.আবুর পরিবারসহ একাধিক পরিবার নানা স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এক সপ্তাহ।
অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত আনাইয়্যা লম্বাবিল, ঘোনাপাড়া, চাইল্যাতলী ও আলীক্ষ্যং সড়কে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। তার ভয়ে স্থানীয় আশপাশের লোকজন মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন।
অপরদিকে বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো: আলম জানান, আনোয়ার ডাকাত ভয়ংকর। সে তাকে খুন করবে বলে একাধিকবার ফোন করে। এ জন্যে তিনি থানায় জিডিও করেন। আনোয়ার ডাকাতের ভয়ে এ এক লক্ষাধিক মানুষ আতংকে রাত যাপন করছে। তার মধ্যে তিনি নিজেও।
এদিকে পুলিশের একাধিক সূত্র বলেছেন, বাইশারি এলাকাটির একদিকে মিয়ানমার এবং তিন দিকে অন্য থানা এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েও ফল পাওয়া যাচ্ছে না আশানূরূপ। নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশের তাড়া খেয়ে তারা অন্য থানা এলাকায় চলে যায়। এ অবস্থায় সুফল পেতে অনেকটা বেগ পেতে হচ্ছে তাদের ।
এ বিষয়ে নাই্ক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ আলমগীর শেখ এ প্রতিবেদককে জানান,আনোয়ার ডাকাতকে আটকের জন্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। বর্তমানেও অভিযান চলছে, এবং চলতে থাকবে সে আটক না হওয়া পর্যন্ত।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top