ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ

10-07-2018-800x420-12.jpg
তুষার আবদুল্লাহ
২০১৪-এর বিশ্বকাপ ফাইনালের একদিন পর ভুটানে পা রেখেছিলাম। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে বলা যায় পুরো শহর হেঁটে বেড়িয়েছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়েও মুগ্ধ করেছে শিশুরা। স্কুল থেকে দলে দলে পাহাড়ের পিচঢালা পথ বেয়ে নেমে আসছে স্কুলফেরত শিশুর দল। কেউ চলছে একা আনমনা হয়ে, কেউ কেউ দলবেঁধে। আমি ওদের পথচলার সঙ্গী হই। জানতে চাই বিশ্বকাপে ওরা কোন দলের সমর্থক ছিল। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বা অন্যকোনও দেশ ছিল ওদের পছন্দের? যতজনকে জিজ্ঞাসা করি, সবার মুখে এককথা, ভুটান। ভাবলাম ওরা মনে হয় বিশ্বকাপের খেলা দেখেনি। না, আমার ভাবনা ঠিক নয়। দেখলাম ব্রাজিলের হেরে যাওয়া। আর্জেন্টিনার মেসির খেলা। উরুগুয়ের সুয়ারেজ, পর্তুগালের রোনালদো সবাইকেও ওরা চেনে। কে কী ভুল করেছে, সেটাও জানা ওদের, কিন্তু কোনও দেশ নিয়ে আলাদা মাতামাতি নেই। জানতে চেয়েছিলাম ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, জার্মানির জার্সি পরেছিল কিনা, বাড়িতে পতাকা উড়িয়ে ছিল কিনা? আমার প্রশ্ন শুনে যেন ওরা পাহাড় থেকে পড়লো। এ কী কথা! অন্যদেশের পতাকা আমার বাড়িতে উড়াবো কেন? শিশুদের পেছনে হেঁটে আসছিলেন শিক্ষকরাও। কথা হয় একজন স্কুল কাউন্সিলরের সঙ্গে। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, মাত্র বিশ্বকাপ শেষ হলো। কিন্তু ভুটানে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগালের পতাকা দেখছি না। ছেলে-মেয়েরাও তাদের প্রিয়দল বলছে ভুটান। বিশ্বকাপে তো খেলেনি ভুটান। দক্ষিণ এশিয়াতেই নিচের সারির দল। হেসে স্কুল কাউন্সিলর বললেন, ভুটান যত নিচের রেটিংয়ের দলই হোক না কেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা ভুটানের কথাই বলবে। ওরা ফুটবলকে ভালোবাসে। যে দলগুলোর কথা বললেন, সেই দলগুলোর খেলাও দেখে। কিন্তু সেই দল বা দেশ নিয়ে অতি মাতামাতি নেই। ভুটানে অন্যদেশের পতাকা কোনও বাড়িতে উড়বে না। কারণ আমরা আমাদের সন্তানদের কাছে ভুটানকেই সবার আগে রাখি। ভুটানই আমাদের একমাত্র ব্র্যান্ডিং।
অথচ বাংলাদেশে ঠিক উল্টো চিত্র। আমরা নিজেরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইংল্যান্ড বলে চিৎকার করে যাচ্ছি। কোন দেশ কেমন খেলে জানি না কিন্তু সেই দেশ নিয়ে মাতমের শেষ নেই। বাড়ির ছাদে, বারান্দায় একাধিক দেশের পতাকা উড়াচ্ছি। জার্সি পরে শুধু খেলাই দেখছি না, অফিসও করছি। সন্তানকেও ভক্ত করে তুলছি ওই দেশগুলোর। সন্তানদের ফুটবলে অনুরক্ত করতে হবে ঠিক, ভালো-দুরন্ত খেলোয়াড় চিনবে সন্তান, তারও প্রয়োজন আছে। তাই বলে অজানা, অজ্ঞাত দেশের পতাকা নিয়ে মাতামাতি কেন? আমাদের মেয়েরা টি-টোয়েন্টিতে ক্রিকেটের বিশ্বকাপে গেলো, এই আনন্দে আমরা বাংলাদেশের পতাকা কত দীর্ঘ করেছি? বাড়িতে কি নিজ দেশের পতাকা উড়ালাম? সন্তানকে পরিয়েছি বাংলাদেশের জার্সি? ছেলেদের ক্রিকেটের সময় গ্যালারিতে পতাকা ওড়ে। বাড়িতে নয়। কারও কারও পরিবারে জার্সি হয়তো পরা হয়, কিন্তু সেটা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার তুলনায় খড়কুটোও নয়। আমাদের মেয়েরা ফুটবলে এশিয়া জয়ের পরেও আমরা বাংলাদেশের পতাকা মমতা ও গৌরবে কতটুকু জড়ালাম? সন্তানদের কাছে সেই সাদাকালো-আকাশী পতাকা বা জার্সির দিনের কথা কি বলেছি? আমাদের দেশেও মোহামেডান, আবাহনী, শেখ রাসেল, শেখ জামাল, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, ভিক্টোরিয়া, আরামবাগ, ফকিরাপুল ফুটবল খেলে। আমাদের সন্তানদের সেই কথা কতজন জানিয়েছি? আমাদের ফুটবলের সুদিন নেই। এই অভিযোগের ছুঁতো তুলছি, কিন্তু মাঠে গিয়ে যদি আবার সাদাকালো বা আকাশি জার্সির পাশে দাঁড়াই, তবে ফুটবল আবার ফিরে পাবে সুদিন। কিন্তু সেই তাড়না আমাদের নেই।
আমাদের মাঝে যে পরদেশ বা ভিনদেশপ্রীতি রয়েছে। তা এখন আমরা সন্তানদের মাঝেও বুনে দিচ্ছি। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য– ইতিহাসই এখনও ঠিকঠাক মতো জানাতে পারিনি। আছে নানা বিভ্রান্তি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার কোনও বিকল্প নেই। সন্তানদের জানাতে হবে, ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশের সে যে একজন যোগ্য প্রতিনিধি। বাংলাদেশের যেকোনও অর্জনে আমাদের পতাকা তুলে ধরতে হবে। আমরা দেশের মাটিতে বা প্রবাসে যেখানেই থাকি না কেন বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের গৌরবের কথা তুলতে হবেই। এই যে আমাদের যে ছেলেটি গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণজয় করে এলো, তার গৌরবের অংশীদার হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো বাংলাদেশের পতাকা ভেসে বেড়াতে দেখছি না। আপাতত জাওয়াদ চৌধুরীর সাফল্যে উড়ুক আমার পতাকা। কারণ ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশের ও একজন যোগ্য প্রতিনিধি।

জয়তু বাংলাদেশ।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top