পাঁচ দিনের বিশেষ অভিযান শুরু : ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে, রমরমা ইয়াবা ব্যবসা

images-14.jpeg

আজিম নিহাদ :
কক্সবাজারে শুরু হতে না হতে প্রায় বন্ধ হয়ে যায় মাদক নির্মূলের বিশেষ অভিযান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা না থাকায় এখন আবারও প্রকাশ্যে চলে এসেছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। চালিয়ে যাচ্ছে রমরমা ইয়াবা ব্যবসা।
সূত্রমতে, সারাদেশের বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত এবং ভয়ংকর মাদকের নাম ‘ইয়াবা’। মিয়ানমারে উৎপাদিত এই ইয়াবা সীমান্ত এলাকা (জল ও স্থল) হওয়ায় কক্সবাজার হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। গত এক দশকে ইয়াবার এমন আগ্রাসন হয়েছে, যা এক প্রকার নিয়ন্ত্রণহীন। তারপরও গেল রমজানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ায় সচেতন মহল ধারণা করেছিল এবার অন্তত ইয়াবা নির্মূলে একটা দিশা হবে। কিন্তু সেই আশা গুড়েবালি। ইয়াবার সা¤্রাজ্যে আঘাত হানার আগেই ‘বিতর্কের’ মুখে অভিযানে ভাটা পড়ে। এক পর্যায়ে অভিযান গুড়িয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সূত্র জানায়, গত ২৩ মে কক্সবাজারের কলাতলী বাইপাস সড়কের পাশের একটি পাহাড় থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মো. হাসান নামে এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর লাশ পাওয়া যায়। মূলত তখন থেকেই মাদকবিরোধী অভিযানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় কক্সবাজারে। এরপর মহেশখালী ও টেকনাফে দুইদিনের ব্যবধানে দুই ইয়াবা ব্যবসায়ীর লাশ পাওয়া যায়। এরমধ্যে একজন টেকনাফের সাবরাংয়ের ইউপি সদস্য ও এমপি বদির বেয়াই আখতার কামাল। এরপর মেরিনড্রাইভ সড়কের র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হন। এরপর এক পর্যায়ে অভিযান প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরুর আগে কক্সবাজারের ১১৫১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি পাঁচটি সংস্থা। সেখানে ৬০ জনকে গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শুরুর দিকে ওই ৬০ জন গডফাদারকে প্রাথমিক টার্গেট হিসেবে ইজ্ঞিতও দিয়ের্ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু সেই টার্গেট শুধু টার্গেটই রয়ে গেল।
অভিযান বন্ধের পর ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে চলে আসায় ফের সক্রিয় হয়েছে ইয়াবা ব্যবসা। প্রতিদিন টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট ও সাগর পথে ঢুকে পড়ছে লাখ লাখ ইয়াবা। টেকনাফ তথা কক্সবাজারে তেমন কোন চালান ধরা না পড়লেও চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একের পর এক ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে। অনেকেই মনে করেন, ইয়াবা বিরুদ্ধে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঝিমিয়ে পড়ার সুযোগ নিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন শরাফত উল্লাহ পেট্রোল পাম্পের সামনে ১০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ তিন মাদক বিক্রেতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা টেকনাফ থেকে ইয়াবা বহন করে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। আটককৃতরা হলেন- ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নবীনগর ঠাকুরবাড়ি এলাকার মো. সজিব (২২) টেকনাফের নাইট্যংপাড়া এলাকার মো. ইয়াসিন ও ভোলার ওবায়দুর রহমান।
চলতি মাসের শুরুতে (১ জুলাই) চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে বোরহান উদ্দিন (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তাকে তল্লাশি করে সঙ্গে থাকা একটি দেয়াল ঘড়ির ভেতর থেকে ৭ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
গত ১২ জুলাই কক্সবাজারের উখিয়ায় ১৫ হাজার পিস ইয়াবা এবং ১৮ ক্যান বিয়ারসহ যুবককে আটক করেছে র‌্যাব। তার নাম নুর আহম্মেদ (৩৫)। তিনি উখিয়ার পালংখালী আনজুমান পাড়ার মৃত ছগির আহম্মেদের ছেলে।
গত ৯ জুলাই টেকনাফের হ্নীলা পশ্চিম লেদায় অভিযান চালিয়ে ১০ হাজার ইয়াবাসহ দুইজনকে আটক করা হয়। তারা হলেন- হ্নীলার পূর্ব লেদার অজি উল্লাহর ছেলে মফিজুর রহামান (৩০) ও মোচনী নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আই ব্লকের মৃত ফজল করিমের ছেলে মো. ফয়সাল (২২)। গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রামে র‌্যাব-৭ শিশুসহ তিন ব্যক্তির পেট থেকে দুই হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে।
কয়েকদিন আগে লক্ষাধিক ইয়াবাসহ ঢাকায় গ্রেপ্তার হন কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী এলাকার আব্দুল্লাহ খানের ছেলে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী আরিফ খান। টানা কয়েকদিন আটকে রাখার পর মাত্র ১২ হাজার ইয়াবা সহ আটক দেখিয়ে তাকে চালান দেয় পুলিশ। এঘটনায় ঢাকার ওয়ারি থানায় দায়ের হওয়া ইয়াবা মামলায় কক্সবাজারের অনেকে আসামী হয়েছেন।
এদিকে কোস্টগার্ডের হিসেব অনুযায়ী, এই সংস্থাটি গত ৭ মাসে ৮০ লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। সর্বশেষ গত ১৩ জুলাই টেকনাফের সাইরং খাল এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০ হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে।
টেকনাফের পৌর এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, অভিযানের সময় কিছুদিন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিন ধরে আবারও বিচরণ বেড়েছে। এখন পুরোদমে ইয়াবা ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে তারা।
এদিকে অভিযানে গা ঢাকা দিলেও এখন এলাকায় দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইয়াবা গডফাদার হিসেবে তালিকাভুক্তরা। এরমধ্যে অনেক জনপ্রতিনিধিও রয়েছে। যদিও অভিযান চলাকালে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থিত হননি ইয়াবা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত জনপ্রতিনিধিরা। এরমধ্যে টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ, তার ছেলে সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজ উদ্দিন, সাবরাংয়ের ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন, সদস্য এনামুল হকসহ আরও ছিল। কিন্তু এখন তারা এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে।
এদিকে কক্সবাজার শহরের ইয়াবা গডফাদার শাহজাহান, বাসটার্মিনালের মো. ইদ্রিস, আবুল কালামসহ অনেকে দীর্ঘদিন পলাতক থাকলেও এখন শহরে অবাধ বিচরণ করছেন তারা। কিন্তু তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ নেই।
কক্সবাজার পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অভিযান নিয়ে অনেক আশা করেছিলাম। মনে করেছিলাম এবার অন্তত ইয়াবার বদনাম থেকে কিছুটা হলেও মুক্তিপাবে কক্সবাজার। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এভাবে চোর-পুলিশ খেললে কখনোই ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হবে না।’
অভিযান বন্ধ হওয়ায় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ফের এলাকা চলে আসার বিষয়টি স্বীকার করেছে খোদ জেলা পুলিশের একটি সূত্র। তবে পুলিশের দাবী, এখনো গডফাদারদের তেমন দেখা যাচ্ছে না। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যারা এলাকায় চলে ঘুরাফেরা করছে তারা ছোটখাটো ব্যবসায়ী ও পাচারকাজে নিয়োজিত।
এদিকে মাদক নির্মূলে গত সোমবার (১৫ জুলাই) রাত থেকে পুরো জেলায় বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। এবারের অভিযানে ‘সন্ত্রাস-নাশকতাকারীরাও’ পুলিশের টার্গেটে রয়েছে। বিশেষ এই অভিযান চলবে আগামী শনিবার পর্যন্ত।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল বলেন, ‘ইয়াবা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পাঁচদিনের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আটক করার। তবে এই পাঁচদিনের অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইয়াবার বিরুদ্ধে অভিযান নিয়মিত চলবে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top