প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা শিবিরে নারী নেতৃত্ব

d6ed252a-270a-46e6-a727-f8feb5e8b045-1.jpeg

দিসিএম ডেস্ক

প্রথমবারের মতো একজন নারী কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। টেকনাফে শালবাগান নামে রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ২০ হাজার রোহিঙ্গার এই নেতার নাম রমিদা বেগম (২৫)।

মিয়ানমারের রাইম্ম্যাবিল থেকে ১০ মাস আগে পালিয়ে এসে শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেন রমিদা।

পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো নারী স্বাধীনতা নেই। নারীর ক্ষমতায়নও তাঁদের কাছে সহজ বিষয় নয়। এমন অবস্থায় রোহিঙ্গা শিবিরে নারী নেতৃত্ব মেনে নিতে নারাজ রোহিঙ্গাদের একটি অংশ।

তবে কক্সবাজার জেলার ইউএনএইচসিআরের সিনিয়র পাবলিক অফিসার ক্যারলিন গ্লাক বেনারকে বলেন, “একটি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গারা নিজেদের এক নারী সদস্যকে ক্যাম্প কমিটির প্রধান হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এটি একটি অসাধারণ কৃতিত্ব।”

“শালবাগানের রোহিঙ্গারা সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁদের প্রতিনিধিদের অর্ধেক হবেন নারী। সে লক্ষ্য তাঁরা বাস্তবায়ন করেছেন। এর জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানাই,” বলেন ক্যারলিন গ্লাক।

স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার লক্ষ্যে এ নির্বাচনে সহায়তা করেছে বলেও জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বেনারকে বলেন, “টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা শিবিরে নির্বাচনের মাধ্যমে একজন রোহিঙ্গা নারীকে চেয়ারম্যান করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের এই নির্বাচন, গণতান্ত্রিক ধারায় রূপান্তরের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করল।”

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনা নির্যাতনের ফলে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন। পুরানোসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন।

শিক্ষাসহ নানা দিক থেকে পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গা সমাজে নারীর অধিকার বলে কিছু নেই। সেখানে শিবিরের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথমবারের মতো কোনো নারীর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক বলেন বাংলাদেশের নারী নেত্রীরা।

মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গারা ভীষণভাবে পিছিয়ে পড়া এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠী। সেখানে তারা আলাদা করে নারীর অধিকার ভাবেইনি কোনোদিন।”

“রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আলোচনা চলছে। আশ্রিত এই বিরাট জনগোষ্ঠীর মধ্যে যদি নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন বিষয়গুলো শিখিয়ে দেয়া যায়, তাহলে দেশে ফিরে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে তারা সচেতন হবে,” বলেন আইনজীবী সালমা।

গণতন্ত্রের শিক্ষাও পাবেন তাঁরা

জেলার ইউএনএইচসিআর সূত্রে জানায়, এক মাস আগে শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সর্বশেষ জুলাই মাসের শুরুতে নির্বাচনের মাধ্যমে শালবাগান ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা কমিটির প্রধান নির্বাচনের পাশাপাশি তাঁর ডেপুটি ও সহকারী এবং ১২টি ব্লকের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিলেন নারী প্রতিনিধি।

ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার লক্ষ্যে কমিটি নির্বাচনের আয়োজন করে। অ্যাডভেন্টিস্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিলিফ এজেন্সি-এডিআরএ এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এতে সহায়তা করে।

শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান রমিদা বেগম বেনারকে বলেন, “টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে ২০ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। তারা সবাই আমাকে পছন্দ করে, তাই আমাকে নির্বাচিত করেছে। এতো লোকের নেতৃত্ব দিতে পেরে আমি খুবই খুশি। তবে এটি একটি চ্যালেঞ্জ।”

“সকল রোহিঙ্গা আমার জন্য সমান। কাউকে ভিন্ন চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা জাতি মিয়ানমারে খুব নির্যাতনের শিকার ও বঞ্চিত হয়েছে। আমি কাউকে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত করব না,” বলেন তিনি।

“আমরা যে দেশে আশ্রয় পেয়েছি সেদেশের সরকার প্রধান নারী। বিষয়টি রোহিঙ্গা শিবিরের প্রধানের কাজে আরো বেশি সাহস জোগাচ্ছে,” বলেন রমিদা বেগম।

রমিদার সঙ্গে আরো পাঁচজন রোহিঙ্গা নারী মেম্বার রয়েছেন। তারা হলেন; জুহুরা বেগম, রেহেনা বেগম, ইশারা, লাল জান ও লাইলা বেগম।

মেম্বার রেহেনা বেগম বলেন, “শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে এখন থেকে নারীরা দেখভাল করবে। এতো মানুষের সুযোগ-সুবিধার খোজঁ খবর রাখা খুব কঠিন। তবে আমরা যারা নারী নেতৃত্ব রয়েছি এক সঙ্গে কাজ করলে খুব সহজভাবে কাজ করা সম্ভব। আমরা পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাব। যাতে কোনো মানুষের অসুবিধা না হয়।”

শালবাগানের এক রোহিঙ্গা নারী বেনারকে বলেন, “আমরা নারী চেয়ারম্যান পেয়ে খুব খুশি হয়েছি। এখন থেকে নারীরা সকল কষ্টের কথা বলতে পারবে। নারী হওয়ায় সে (চেয়ারম্যান) সকল নারীদের দুর্দশা বুঝবে। তাছাড়া এই রোহিঙ্গা শিবিরে নারী বেশি রয়েছে।”

তবে ওমর হামজা নামে এক রোহিঙ্গা বৃদ্ধ বেনারকে বলেন, “এই রোহিঙ্গা শিবিরের ২০ হাজারের মতো মানুষ রয়েছে। নারীরা কীভাবে এসব মানুষের খোজঁ খবর রাখবেন আমি জানি না। তাদের দ্বারা এ কাজ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কারণ, নারীর কাজ ঘরে, বাইরে নয়।”

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top