অভিযানেও থেমে নেই ইয়াবা পাচার : এলাকায় ফিরছে কারবারিরা

images-1-1.jpeg

গোলাম আজম খান কক্সবাজার

চলমান মাদকবিরোধী অভিযানেও মাদক পাচার থেমে নেই। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেফতারের পাশাপাশি কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রতিদিনই বেশ কিছু মাদককারবারি নিহত হলেও থেমে নেই ইয়াবা পাচার। প্রতিদিনই অভিনব পন্থায় ইয়াবা পাচার অব্যাহত রয়েছে। এখনো বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে আসছে নাফনদী ও সাগরপথে ইয়াবার চালান। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইয়াবা প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান চালালেও এটি বন্ধ হচ্ছে না। টেকনাফে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে ২৭ ও ২৮ জুন রাতে দুই দিনে ছয় নারীসহ ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। সেই সাথে পাঁচ হাজার ৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
টেকনাফ থানার ওসি রনজিত বড়ুয়ার নেতৃত্বে পুলিশ একটি দল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে প্রায় ছয় হাজার ইয়াবাসহ ৯ জন ইয়াবা কারবারিকে আটক করতে সম হয়েছে। আটক ৯ জনের মধ্যে ছয়জনই নারী।
এর মধ্যে চলতি মাসে সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবির সদস্যরা দেড় লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করেছেন। সূত্র জানায়, চলতি বছরের (জানুয়ারি থেকে মে মাস) পাঁচ মাসে এক কোটি ৭২ লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার করেছেন বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ড সদস্যরা।
টেকনাফ দুই বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর শরীফুল ইসলাম জোমাদ্দার বলেন, সীমান্তে বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোরভাবে জওয়ানরা টহল দিচ্ছেন। এতে করে ইয়াবার চালানও জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসে দুইজন পাচারকারীসহ এক লাখ ৫১ হাজার ৬৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ২৫ মে সাবরাং ইউপির সদস্য আক্তার কামাল ও ২৭ মে র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর ও সাবেক উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মো: একরামুল হকসহ টেকনাফের চারজন ইয়াবা বিক্রেতা নিহত হয়েছেন।
বিশেষ করে কাউন্সিলর একরামুল হক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর সেই অভিযানটিই মুখ্যত ভাটা পড়েছে। তবে এ অভিযানে টেকনাফ সীমান্তে ১৪ জন খুচরা ইয়াবা কারবারিকে আটক ও অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মোবাইল কোর্টে শাস্তি দেয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে আকস্মিক ইয়াবার দাম বেড়ে গেছে। বাড়তি দামের কারণে মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালেও সীমান্তে অব্যাহত রয়েছে ‘নীরব ইয়াবা কারবার।’ নাফনদীর তীরে ইয়াবা খালাসের প্রধান ঘাট যথাক্রমে খুরেরমুখ, সাবরাং নয়াপাড়া, মৌলভী পাড়া, শাহপুরীর দ্বীপসহ সীমান্তের বিভিন্ন ইয়াবা মোকামে প্রতিটি ইয়াবা বড়ির দাম বেড়েছে কমপে পাঁচ টাকা।
টেকনাফ সীমান্তের লোকজন এখন নিজের পরিচয় দিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। তবে সরকারের ইয়াবাবিরোধী অভিযানের প্রতি সাধারণ মানুষের অসাধারণ সমর্থন রয়েছে। এটার প্রমাণ মিলে- সীমান্ত এলাকাজুড়ে অভিযান বিরোধী কোনো ব্যক্তিকেও খুঁজে না পাওয়া। এমনকি সীমান্ত এলাকার সরকার বিরোধী প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃবৃন্দও এমন অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে আসছেন।
টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর আলম মেম্বার এবং উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদের সাথে কথা হয় ইয়াবাবিরোধী অভিযান নিয়ে। বর্তমান সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপ হিসেবে ঘোষিত বিএনপির তৃণমূলের রাজনৈতিক এই নেতাদ্বয়ও বলেছেন- ‘সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের বিরোধিতা করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। কেননা ইয়াবার মতো সর্বনাশা এমন জঘন্য মাদক আমাদের চোখের সামনেই বছরের পর বছর ধরে পাচার হয়ে আসছে। এতে করে জাতির সর্বনাশ হচ্ছে।’
অভিযানের সময়েও কেন ইয়াবা পাচার অব্যাহত রয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে সর্বাগ্রে উঠে এসেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কথা। সীমান্তের লোকজন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন-‘যদি কিনা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেম লালন করে থাকেন তাহলে একটি ইয়াবাও পাচার হতে পারবে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে করণীয় দরকার-ইয়াবা কারবারিদের তালিকার সাথে সীমান্তে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার অসাধু সদস্যদেরও তালিকা করে ব্যবস্থা নেয়া।’
এদিকে ইয়াবা গডফাদাররা আবারো নিজ নিজ এলাকায় ফিরে এসেছে। সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে সীমান্ত শহর টেকনাফসহ কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ইয়াবা গডফাদাররা তাদের ‘রাজপ্রাসাদ’ ছাড়া। এমনকি কোটি কোটি টাকার প্রাসাদে থাকার জন্য একজন পাহারাদারও পাওয়া যায়নি। অভিযান চলাকালে বিশেষ করে টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার শহরে ইয়াবা গডফাদারদের হরেকরকম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তাদের দেখা মেলেনি। এক ধরনের মালিকবিহীন চলছিল ব্যবসায়। পাশাপাশি বিলাসাবহুল গাড়ি, মোটরসাইকেলেরও বিচরণ দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে আবারো তাদের বেপরোয়া বিচরণ বেড়েছে। আর তাদের নির্মিত রাজপ্রসাদগুলোও ফিরে পেয়েছে প্রাণ। এ দিকে স্থানীয়দের দাবি, সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ীদের নামে যারা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে তাদের বেশির ভাগই ছিল খুচরা ব্যবসায়ী। যদি তালিকাভুক্ত ইয়াবা গডফাদারদের মধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা যেত তাহলে মাদক নির্মূল অনেকটা সফল হতো বলে দাবি তোলেন নানা পেশাজীবী মানুষ।
২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুদ জামান চৌধুরী জানান, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানেও চোরাচালান বা ইয়াবা পাচার দুঃসাহসের বিষয়। সীমান্তে মাদক পাচার প্রতিরোধে কঠোর পদপে নেয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান ছিল, এখনো অব্যাহত রয়েছে। অভিযানে কোনো ধরনের পেশিশক্তিই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। মাদক কারবারি বা ইয়াবার গডফাদার যতই শক্তিশালী হোক তাদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া চলছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top