জেলার কর্ম সৃজন প্রকল্পে ১৩ কোটি টাকার কাজে দুর্নীতি

images-7.jpeg

ম.বেদারুল আলম :
জেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম লুটতরাজের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে জেলার ৮ উপজেলায় ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ১২ কোটি ৯৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়। উক্ত কর্মসৃজন প্রকল্পের জন্য জেলায় ১৬ হাজার ১শ ৬৯ জন বেকার হতদরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্টিকে উপকারভোগি শ্রমিকের আওতায় আনা হয়। নিয়ম অনুয়ায়ি ৪০দিনের মধ্যে স্থানিয় চেয়ারম্যান , মেম্বারগণ গ্রামিণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন , রাস্তাঘাট, সড়ক সংস্কার, পুকুর ডোবা, সাকোঁ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কারসহ উন্নয়নমূলক কাজ সমাপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়। উক্ত প্রকল্পের একজন শ্রমিক দৈনিক ২০০ টাকা মজুরি নির্ধারন করা হয় যার মধ্যে ১৭৫ টাকা কাজ শেষে অপর ২৫ টাকা সঞ্চয় হিসাবে রাখা কেটে রাখা হয়। সঞ্চয়ের টাকা ৬ মাস পরে ফেরত দেওয়ার নিয়ম থাকলেও শ্রমিকরা দরিদ্র এবং অশিক্ষিত হওয়ায় সঞ্চয়ের বিশাল টাকার আর নাগাল পায়না। উক্ত টাকা প্রকল্পের সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের ভাগে চলে যায় । গত এপ্রিলে কাজ শুরু হলে ও স্বল্প সময়ের মধ্যে ৫০ শতাংশ কাজ মাঠে অদৃশ্য হওয়ায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ব্যাপক দূর্নীতি , নানা অনিয়ম, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের তদারকির অভাব এবং ট্যাগ অফিসারদের ব্যাপকহারে উৎকোচ আদায়ের কারনে কাংখিত উন্নয়ন হয়নি বলে মনে করেন সচেতন মহল।
জানা যায়,ককসবাজার জেলায় ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে গ্রামিন অবকাঠামো উন্নয়নে হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের জন্য ১২ কোটি ৯৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়। উক্ত টাকায় সাড়ে ৩শ গ্রামিন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এদের মধ্যে ককসবাজার সদরের ২০২৬ জন শ্রমিকের জন্য ১ কোটি ৬২ লাখ ৮ হাজার টাকা, রামুর ২০৫৯ জনের জন্য ১ কোটি ৬৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা, চকরিয়ার ৩০৩৭ জনের জন্য ২ কোটি ৪২ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, পেকুয়ার ১২১২ জনের জন্য ৯৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, মহেশখালীর ৩১৩৫ জনের জন্য ২ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা, কুতুবদিয়ার ৮৭৭ জনের জন্য ৭০ লাখ ১৬ হাজার টাকা, উখিয়ার ১৭৬৫ জনের জন্য ১ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা, এবং টেকনাফের ২০৫৮ জনের জন্য ১ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। উক্ত প্রকল্পে উখিয়া ও টেকনাফের জন্য ৩ কোটি টাকার উর্ধে বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যাপক দূর্নীতির কারনে কাংখিত উন্নয়ন হয়নি বলে স্থানিয়দের অভিযোগ। কোন কোন জনপ্রতিনিধি কর্মসৃজনের শ্রমিকদের নিজেদের বাড়ির কাজে এবং পছন্দসই ব্যক্তিদের কাজে ব্যবহার করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ও রয়েছে। অনেক জনপ্রতিনিধি শ্রমিকদের কার্ড আটক রেখে টাকা আদায় করেছে বলে ও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে কম শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে রোষ্টার বানিয়ে অতিরিক্তি শ্রমিকের নাম দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে বলে ও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সদরের পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের সচিব নুরুল কাদের জানান, কর্মসৃজন প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো বেকার ও দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান কিন্তু প্রকল্পের সভাপতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দরিদ্র মানুষকে কাজে না লাগিয়ে বিভিন্ন যন্ত্র যেমন স্কেভেটর, ডাম্পার, রোলার মেশিনের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কারনে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছেনা। ফলে দরিদ্র মানুষের ন্যায্য পাওনা অর্থাৎ হক বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে রামু প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোঃ জোবায়ের হোসেন জানান, আমার রামু এবং চকরিয়ায় ১০৪ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। যা সবার উপকারে এসেছে। তিনি কোন অনিয়ম হয়নি দাবি করে বলেন, শ্রমিকরা তাদের মজুরী যথাযত পেয়েছে। কাজের মান ও ভাল হয়েছে। তবে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে অফিস খরচের নামে টাকা আদায়ের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, নিয়ম অনুযায়ি যা ব্যয় তা ছাড়া কোন অতিরিক্ত টাকা কোন চেয়ারম্যান কিংবা মেম্বারের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি।
টেকনাফ ও উখিয়ায় কর্মসৃজন প্রকল্পের কাজের মান অগ্রগতি বিষয়ে জানার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা পবিত্র মন্ডলের বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ করে কোন তথ্য না দিয়ে ১০ মিনিট পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ কেটে দেন। পরে আর যোগাযোগ না করেই সংযোগ বন্ধ রাখেন। ফলে কাজের অগ্রগতি ও নানা অনিয়মের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায় একই ( সুব্রত দাশ) পিআইও এবং ২জন কর্মচারি ৬ জন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে কর্মসৃজন প্রকল্পের অফিস খরচের নাম করে বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে নেয়ার কারনে কার্যকর উন্নয়ন করতে পারেনি বলেও জনপ্রতিনিধিরা জানান। এদিকে ২০১৩ সালে উখিয়া – টেকনাফের কর্মসৃজন প্রকল্পে ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজে ব্যাপক দূর্নীতির কারনে তৎকালিন উখিয়ার ৪ চেয়ারম্যানসহ ৭ জন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে হওয়া মামলা এখনো দুদকে তদন্তাধীন রয়েছে। উক্ত অভিযুক্ত ৭ জনপ্রতিনিধিকে ২০১৪ সালের ২৪ আগষ্ট দুদকের চট্টগ্রামের কার্যালয়ে হাজির হওয়ার র্নিদেশ ও দেয়া হয়েছিল। সেই মামলায় উখিয়ার তৎকালিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে দূর্নীতির দায়ে ২০১৭ সালে দুদক আটক ও করে। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।
এদিকে কাজ শুরু হতে না হতেই প্রায় ১৩ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের দুই তৃতীয়াংশ পানি হয়ে যাওয়ায় প্রতিটি উপজেলার প্রকল্পের কাজের অনিয়ম খতিয়ে দেখার জন্য দূর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন উন্নয়ন বঞ্চিত জনসাধারণ। প্রতিটি প্রকল্প তদারকি এবং নিয়োজিত শ্রমিকদের সাথে কথা বললে কর্মসৃজন প্রকল্পে যে নিরবে হরিলুট হয়েছে তার প্রমান সহজে পাওয়া যাবে বলে উন্নয়নবঞ্চিত সর্বসাধরনের বিশ্বাস। এ ব্যাপারে দূর্নীতি দমন কমিশন এবং সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা যদি গোপনে তদন্তে নামে জেলায় বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পসমুহের নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির শেঁকড় উঠে আসবে বলে বিশ্বাস সাধারণ মানুষের। দূর্নীতির রাঘব বোয়ালদের ধরতে দ্রুত মাঠ পর্যায়ে তদন্ত জরুরি।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top