সৃষ্টিশীলতার বাজারে আমি এক অপচয়: মোশাররফ করিম

34195433_643272606005484_2051116040850505728_n-12.jpg

ঈদের দুদিন বাকি তখন। ঢাকা শহর ছেড়ে যাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। বিভিন্ন পথে, বিভিন্ন যানে। শহর থেকে নগর, মফস্বল, গ্রাম মুখি প্রতিটি রাস্তা মানুষ বোঝাই যান বাহনে ঠাসা। এরমধ্যেই দুপুর সময়ে পূবাইলের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। উদ্দেশ্য ছোট পর্দার তারকা অভিনেতা মোশাররফ করিমের সাক্ষাৎ! কারণ ঈদে মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত ছবি ‘কমলা রকেট’।

তখনও তিনি ঈদের

নাটকে অভিনয় করছিলেন। পূবাইলের একটি শুটিং বাড়িতে। নির্ঝঞ্জাট পরিবেশে। কথা বলার আগে নানা বিষয়ে আলাপ জমে ছোট পর্দার এই তারকা অভিনেতার সঙ্গে। বাংলাদেশের এই সময়ের সিনেমা, ঈদের সিনেমা, নাটক এবং বিশ্বকাপ-এর নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ চলে পুরো বিকাল। এসময় সঙ্গে ছিলেন ‘কমলা রকেট’ নির্মাতা নূর ইমরান মিঠু। মোশাররফ করিমের সঙ্গে কথোপকথের আগে তাদের দুইজনের প্রথম পরিচয় হওয়ার বিষয়টি শোনেও আনন্দ পাবেন পাঠক!

নূর ইমরান মিঠু তখন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অ্যাসিস্টেন্ট। ঢাকার বাইরে টেলিভিশন সিনেমার শুটিং করছেন। মোশাররফ করিম এই ছবির অভিনেতা। তখন কিছুটা নাটকীয় ভাবে পরিচয় ঘটে মিঠুর সাথে। অ্যাসিস্টেন্ট হলেও মিঠু শিল্প, সাহিত্যে বেশ সরস। আর সেটা টেলিভিশনের শুটিংয়ে যেয়ে আবিষ্কার করেন মোশাররফ করিম। তিনি নিজেও সাহিত্য ভালোবাসেন, নিজেও এক সময় সাহিত্য চর্চা করেছেন। সিনেমায় শুটিংয়ে গেলে তার সাথে থাকে প্রচুর বই। কবিতা নিয়ে আড্ডায় অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে নতুন নিয়োগ পাওয়া মিঠুকে সঙ্গে রাখেন মোশাররফ করিম। সময় পেলেই সাহিত্য নিয়ে দুজন আলাদা হয়ে আড্ডা দিতে থাকেন। এরপর পরিচয় আরো গাঢ় হয়। মিঠুর কাজ করার ইচ্ছা, মানসিকতার কথা শোনে মিঠুর জন্য একটি নাটকও প্রযোজনা করেন মোশাররফ করিম।

‘কমলা রকেট’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে মোশাররফ করিম

এসব নিয়ে যখন কথা হচ্ছিলো, তখন মোশাররফ করিম কিছুটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘সৃষ্টিশীলতার বাজারে আমি এক অপচয়’! বোঝা গেল না বিষয়টা, তবে এটুকু তিনি পরিষ্কার করেন যে, প্রয়োজন আর কাজের চাপে জগৎ সংসারে অনেক কিছুই সেক্রিফাইস করতে হয় মানুষকে! জানালেন, মেধা আছে শিল্পবোধ আছে এমন তরুণদেরকেই তিন বাংলাদেশের নাটক সিনেমায় দেখতে চান। তাদের সঙ্গে ভালো কিছু কাজ করতে চান।
এরপর ফিরে আসেন নিজের অভিনীত ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ছবি ‘কমলা রকেট’ নিয়ে। ছবিটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি আপনা আপনি বলতে শুরু করলেন, যারা দেশকে ভালোবাসেন তাদের দেশের মৌলিক ছবিকেও ভালোবাসা উচিত বলে মনে হয় আমার। আমি যদি শাপলা ফুলকে ভালোবাসি, জাতীয় ফল বলে কাঁঠালকে ভালোবাসি, আমার নদী মা মাটিকে ভালোবাসি তাহলে যে সিনেমাটা আমার এবং আমাদের মৌলিক গল্পে নির্মিত সেগুলো ভালোবাসা আমার দায়িত্ব। আমার মানে এই নয় যে আমি মোশাররফ করিমের দায়িত্ব। এ দায়িত্বটা আসলে আপামর জনতার। সকলের দায়িত্ব। ‘কমলা রকেট’-মূলত এরকম একটি মৌলিক ছবি।

এই সিনেমার সঙ্গে আপনি যুক্ত হলেন কীভাবে?
‘কমলা রকেট’ নিয়ে মিঠু যখন আমার কাছে আসে তখন কনসেপ্টটা দেখেই আমি আমার ভালো লাগে। কারণ মিঠুর সিনেমার কনসেপ্টটা প্রকৃত অর্থেই মানুষের গল্প বলে। তারমানে এই নয় যে, বাকি সিনেমার গল্পগুলো মানুষের না! তাহলে ‘কমলা রকেট’কে কেনো আমি মানুষের গল্প বলছি। আসলে এই গল্পটার মধ্যে মানুষ এবং মানুষের যে শ্রেণি চেতনা, অর্থহীন শ্রেণি চেতনা দারুণভাবে উঠে এসেছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

‘কমলা রকেট’ আসলে কীভাবে শ্রেণিহীন মানুষের গল্প বললো?
আমরা যেভাবে সাধারণত বলি, ক্লাসের কথা বলি। যেমন ধরুণ, ও রিক্সাওয়ালা, ও কোটিপতি কিংবা ও মধ্যবিত্ত এই যে ক্লাসের বিন্যাস বা বার্লিনের দেয়ালের মতো গড়ে উঠেছে এগুলো যে ক্রাইসিসের মধ্যে গিয়ে ভেঙে যায়, খসে পড়ে। মানুষ যে প্রকৃত অর্থেই মানুষ হয়ে উঠে এটা এই সিনেমার গল্পে আছে। মানুষের ওর্দি, শ্রেণির পোশাকের অপসারণ ঘটিয়ে মানুষ যে নবজন্ম লাভ করে, সে যে আবার পোশাকহীন হয়ে উঠে, সরল হয়ে উঠে এবং প্রকৃত অর্থেই সবাই সমান হয়ে উঠে ‘কমলা রকেট’ তেমন একটা গল্প। ছবিটা নিয়ে আমার অবজার্ভেশন এরকম। শেষ পর্যন্ত মানুষ মানুষ-ই!

যেমন?
নানা ডিজাইন করে, নানা রঙ দিয়ে আমরা একেকজন মানুষকে একেক ধরনে তৈরি করি। বলি, উনি অমুক উনি তমুক। উনার দাম এতো,তার দাম এতো, উনার কোনো দাম নাই। এইজন্যই বললাম, ‘কমলা রকেট’ প্রকৃত অর্থেই মানুষের গল্প। এটা অবশ্যই একটা অসাধারণ গল্প। আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি, এটা যেকোনো মানুষেরই ভালো লাগার মতোন গল্প। যে কোনো বাঙালিই এই ছবির গল্পটি উপভোগ করবে। এবং সিনেমাটি দেখে ফিরে যাওয়ার সময় আমি নিশ্চিত তার মস্তিস্কে একটা ভাবনা কাজ করবে। আমার মনে হয় সিনেমাটি দেখে সেও নবজন্ম লাভ করবে।

‘কমলা রকেট’ সিনেমায় শ্রেণিহীন বা বৈষম্যহীনতার কথা বললেন, ব্যক্তিজীবনে মোশাররফ করিম কেমন?
আমার ব্যক্তিজীবনও এরকম-ই! এই যে এই মুহূর্তে তুমি একটা বেঞ্চিতে বসে আছো, আমি একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছি এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আবার এই মুহূর্তে এখানে বিশাল আরামদায়ক একটা গদি এনে দিলে সেখানে বসতেও আমার আপত্তি নেই। আমি খুব ফ্লেক্সিবল। আমি কিছুতেই ভারাক্রান্ত না। আমি জানি না, তোমার প্রশ্নের ঠিক উত্তর দিতে পারলাম কিনা!

টিভি খুললেই মোশাররফ করিম। সংখ্যার দিক দিয়ে এবার ঈদে মোট কতো নাটকে অভিনয় করলেন?
আমি গুনে গুনে কাজ করি না। সংখ্যা আমার কাছে কোনো গুরুত্বই বহন করে না। যে গুনে গুনে কাজ করে তাকেও আমি অবজ্ঞা করছি না, সে অধিকার আমার নাই। আমি আজকে যে কাজটি করছি সেই তীব্রতা নিয়েই থাকি। যতক্ষণ সেই কাজটি শুট না শেষ হয় সেই তীব্রতা আমি পুষে রাখি। সংশ্লিষ্ট কাজ নিয়ে আমি খুবই তীব্র থাকি, সেই কাজটি শেষ হলে আমি পরবর্তী কাজের তীব্রতায় প্রবেশ করি। আমি সবার কাছে দোয়া চাইবো যেনো আমার সেই তীব্রতাটা নষ্ট না হয়।

ছোট পর্দায় একইভাবে আপনাকে দেখে দেখে অভ্যস্ত দর্শক। একঘুয়েমিতারও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। কী বলবেন আপনি?
একঘেয়ে অভিনয় নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। এরকম অভিযোগ গত ৭/৮ বছর ধরেই নিয়মিত শোনে আসছি। এগুলো আসেই। তো এমন প্রশ্ন নিয়ে আমার মনে হয়, আমরা যারা এসএম সুলতানের আঁকা ছবি দেখি তা কিন্তু দেখলেই চিনতে পারি। ছবিতে যদি এসএম সুলতানের সাইন নাও থাকে তবু আমরা দেখেই ধরে নিতে পারি এটা তার আঁকা। এটা কেনো বলে দিতে পারি? হ্যাঁ, এটা তার স্টাইলের কারণে। তার স্টাইল আমাদের পরিচিত। আবার ঔপন্যাসিকের নাম নেই, হয়তো ছিঁড়ে গেছে। কিন্তু তার উপন্যাসের দুই পৃষ্টা পড়েই আমি বলে দিতে পারি যে এটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা। কেনো বলে দিতে পারি? কারণ, তার লেখার স্টাইল আলাদা। দুই লাইন পড়েই বলে দেয়া যায় এটা কার স্টাইল। তো স্টাইল আর টাইপ দুইটা বিষয়ের মধ্যেতো পার্থক্য আছে! আছে না! এখন আমি হাসলে যদি আপনি মনে করেন যে এটা উত্তম কুমারের মতো করে ফেলবো এটাতো সম্ভব হবে না। কারো দ্বারাই সম্ভব না। অমিতাভ বচ্চন যখন অভিনয় করেন, তখনতো তার একটা আলাদা স্টাইল আছে। আল পাচিনোর আলাদা একটা স্টাইল আছে। প্রত্যেকের আলাদা একটা স্টাইল আছে। এই যে এই অভিনেতারা ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন, কিন্তু ওইসব চরিত্রের মধ্যে উনারাও থেকে যান। তো আমার ক্ষেত্রেওতো তাই, আমি যখন কোনো চরিত্রে অভিনয় করি তখনতো আমি চরিত্রটায় ধারন করি, কিন্তু তারমধ্যেও মোশাররফ করিম থেকে যান। দ্যাট ইজ মাই স্টাইল। এটা প্রত্যেক অভিনেতার ব্যক্তিগত ধরন। তবে হ্যাঁ। একই জাতীয় ক্যারেক্টার আসলেতো একই ধরনের অভিনয় হয়ে যাওয়ারই সম্ভাবনা থাকেই।

স্ত্রী জুঁইয়ের সাথে মোশাররফ করিম

কতো কতো জনপ্রিয় সিরিজে আপনাকে দেখা যায়। জনপ্রিয়তা পাওয়ায় বেশকিছুতো এখন সিক্যুয়ালেও রূপ নিচ্ছে। শিল্পী হিসেবে সব কাজ করেই কি আপনি সন্তুষ্ট থাকতে পারেন?
অনেক কাজ করতে গিয়ে আমি অতৃপ্তও থাকি। সব কাজ যে আমাকে সেটিসফাইয়েড করে এমনতো না। আমি খুব টেকনিক্যাল উত্তর দিতেও রাজি না যে, সব সন্তান আমার কাছে সমান! সব সন্তান তার পিতা মাতার কাছেও সমান হয় না। সেটা সন্তানের কারণেই হয় না। একেকজনের ধরনতো একেক রকম। আর আমি কখনো আমার কোনো কাজ নিয়ে গলা বড় করে কিছু বলিও নাই কখনো, এ ধরনের লজ্জা আমার আছে। তারপরেও বেশকিছু কাজ করে আমিও সেটিসফাইয়েড।

ফিচার ছবি: আরিফ আহমেদ

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top