টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত রোহিঙ্গা শিবির

base_1528926942-3.jpg

দিসিএম

স্বামী মারা গেছেন সহিংসতায়। নিখোঁজ হয়েছে পাঁচ সন্তানের একজন। বাকি চারজনকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। ঠাঁই মিলেছে উখিয়ার কুতুপালংয়ের তাজুনিরমা’রখোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সেখানেই পাহাড়ের ঢালে দেড় মাস আগে ঝুপড়ি ঘর ওঠান ফাতেমা বেগম। জন্মভূমি মিয়ানমারে জীবনের ৫০ বছরের বেশি সময় কাটিয়ে বাস্তুচ্যুত এ নারী ছোট্ট ওই ঝুপড়িকেই ঠিকানা জেনেছিলেন। রোববার থেকে টানা বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে তার নতুন ঠিকানা। ‘এখন কী হবে, চার সন্তান নিয়ে কই যাব? কোথায় থাকব, কিছুই জানি না’— একনিঃশ্বাসে বলে চলেন ফাতেমা বেগম।

তাজুনিরমা’রখোলার পাশে মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সেখানকার একটি তাঁবুতে মাটি খুঁড়ে চুলা বানিয়েছেন আয়েশা খানম। ওই চুলায় আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। আয়েশা বলেন, ‘বৃষ্টির পানির জন্য কিছুই রান্না করা যাচ্ছে না। চুলার নিচে পানি জমে থাকায় দুদিনে বহুবার চেষ্টা করেও আগুন জ্বালাতে পারিনি। ছেলে-মেয়েরা না খেয়ে আছে। কিছু বিস্কুট ছিল, খেতে দিয়েছি। দুপুরে খাওয়া হয়নি। রান্না করতে না পারলে রাতে ওদের কী খাওয়াব, জানি না।’

একটু দূরে ভেঙে যাওয়া তাঁবু ঠিক করার কাজে ব্যস্ত একই পরিবারের চারজন। তারা চার মাস আগে এসেছেন। ত্রাণসামগ্রী পেয়েছেন কিনা, জানতে চাইলে এ পরিবারের সদস্য নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘চাল-ডাল ছাড়া কিছুই পাইনি। বৃষ্টিতে তাঁবু তছনছ হয়ে গেছে। রান্নার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ছেলে-মেয়েদের খাবার দিতে পারছি না।’

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অবিরাম বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। গতকাল  সকালে পালংখালীর শফিউল্লাহ কাটা এলাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে চারজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন— ক্যাম্পের ডি-২ ব্লকের বাসিন্দা আলী আজগরের স্ত্রী মরিয়ম খাতুন (৪৫), মো. ইব্রাহীমের স্ত্রী সমুদা খাতুন (২৬), মো. শাকের আলমের স্ত্রী রোকেয়া (২৫) ও তাদের তিন বছরের কন্যা উম্মে হাবিবা।

ডি-২ ব্লকের রোহিঙ্গা নেতা (মাঝি) জয়নাল আবেদীন জানান, বৃষ্টিতে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ঢালে বসবাসকারী দুটি পরিবারের ঝুপড়িতে পড়ে। এতে চারজন আহত হন। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। টানা বৃষ্টি না থামলে আরো পাহাড় ধসে পড়তে পারে বলে তিনি জানান।

রোববার থেকে অবিরাম বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরের কমপক্ষে আড়াই হাজার বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অনেক পাহাড়েও ধস দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গারা প্রতিনিয়ত পাহাড় ধসের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। কুতুপালং ডি-৪ ব্লকের কামাল উদ্দিন জানান, পাহাড়ের ছড়ায় যারা বসতি গড়েছেন তারা যেমন আতঙ্কিত, তেমনি ঢালুতে যাদের বাস তারাও আছেন ভয়ে।

ল্যান্ডস্লাইড ফোরামের তথ্যমতে, দেশের সবচেয়ে ঢালপ্রবণ (স্লোপ গ্রেডিয়্যান্ট) পাঁচ জেলার একটি কক্সবাজার। গত ১০ মাসে আট লাখের বেশি মানুষ এ জেলায় আশ্রয় নিয়েছে। এ নিয়ে কক্সবাজারে রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। এত বিরাটসংখ্যক মানুষের ভারে কক্সবাজার হয়ে পড়েছে ভীষণ ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। জাতিসংঘের ইন্টার সেক্টরাল কোঅর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতি কিলোমিটারে জনবসতি এখন ৭ হাজার ৫৭৯ জন। কক্সবাজারের কৃষিজমি ও পাহাড়ি ঢালে ঠিকানা গড়েছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। হঠাৎ আসা এসব মানুষের প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠ জোগাতে গত আগস্ট থেকে কাটা পড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বনভূমি ও ঝোপঝাড়। এতে কক্সবাজারে পাহাড় ও ভূমি ধসের ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।

গত কয়েকদিনের বর্ষণে ২ হাজার ৩৩৪টি রোহিঙ্গা বসতি বিধ্বস্ত বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে গতকাল আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। আইওএমের গণযোগাযোগ কর্মকর্তা আকতার শিরিন জানান, বর্ষণে রোহিঙ্গাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে উখিয়া ও টেকনাফের ৩১টি ছোট-বড় রোহিঙ্গা বসতিতে চুলায় আগুন ধরানোই মুশকিল হয়ে পড়েছে। গ্যাসের চুলা যাদের নেই, সেসব পরিবারের দুর্ভোগ বেশি। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের লাকড়ি শুকানো যাচ্ছে না। শুকনা লাকড়ি থাকলেও আবার হয়তো চুলাতেই পানি জমে আছে। জ্বালানির অভাবে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার খাবারের কষ্টে ভুগছে। খাবার সংগ্রহ বা অন্য প্রয়োজনে বাইরে যেতেও বিপত্তি। ক্যাম্প ও আশপাশের চলাচলের রাস্তায় বৃষ্টির কারণে জমেছে হাঁটুসমান কাদা। ঘরের ভেতরে চুলায় পানি, ঘরের বাইরে রাস্তায় পানি। কিন্তু পানীয় জল সংগ্রহের জন্য কলসি নিয়ে কাদা পেরিয়ে বহুদূর যেতে হচ্ছে রোহিঙ্গা নারীদের। বিপত্তি আর বিড়ম্বনার পাশাপাশি এ যাত্রায় আছে পা পিছলে হাত-পা ভাঙার ঝুঁকি। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে শিবিরসংলগ্ন নালা-খাল ও নিচু এলাকাগুলো। এতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ চলাচল।

উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অধিকাংশ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পাহাড় কেটে বা পাহাড়ে অবস্থিত। এসব এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা আছে। এরই মধ্যে পাহাড় ধসের বেশি ঝুঁকিতে থাকা ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ঘর থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু নিরাপদ স্থানে তাদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top