কুতুবদিয়াতে চুনোপুঁটিরা খাঁচায়,শীর্ষ মাদক কারবারিরা অধরা

images.jpg

নিজস্ব প্রতিবেদেক:

দেশজুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। এখনো টনক নড়েনি দ্বীপ এলাকার শীর্ষ মাদক চোরাকারবারিদের। এলাকার সাধারণ জনগণ এখনো শংকিত তাদের স্কুল,কলেজ পড়–য়া ছেলে সন্তানদের নিয়ে।

দেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া উপজেলা। যা মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে খ্যাত। সাগর পথে সহজ যোগাযোগে প্রভাবশালী শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা এখানে গড়ে তুলেছে একাধিক মাদক সিন্ডিকেট। যাদের দিয়ে নিয়মিত চালাচ্ছে ইয়াবা,বেয়ার,ভোটকা কিংবা বিদেশী মাদকের রমরমা ব্যবসা।

সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযানে কক্সবাজার জেলা হতে অন্তত অর্ধশতাধিক মাদক সম্রাট পালিয়ে ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান নিয়েছে। যদিও এখনো অধরা কুতুবদিয়ার প্রভাবশালী তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিরা।

ফলে রাঘববোয়ালদের ধরতে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানায় পুলিশের অভিযান সীমিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কুতুবদিয়া পুলিশের খাঁচায় ধরা পড়ছে ২৯ চুনোপুঁটি মাদকসেবী।

সূত্রে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকা তালিকায় কুতুবদিয়া বসবাসরত মাদকের শীর্ষ চোরাকারবারিদের অনেকেই বহাল তবিয়তে। মাদক সম্রাটরা তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আশ্রয়ে এখনও মাদক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তালিকা ধরে অভিযান শুরু করলে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ট্রলারেও ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। এমন খবর গণমাধ্যমে আসছে।

সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকাভুক্ত কুতুবদিয়া উপজেলার শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকায় রয়েছে, যুবদল নেতা হারুন মেম্বার (৩০) পিতা মোঃ বারেক আলি (আকবর ডেইল),আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ মাতবর পিতা আবু তাহের (মাতবর পাড়া),উত্তর ধুরং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদক কফিল (৩৮), বিএনপি নেতা আক্তার কামাল মেম্বার পিতা আবুল খায়ের (আলি আকবর ডেইল), যুবলীগ কর্মী রাসেল মাতবর পিতা আবু তাহের (মাতবর পাড়া), আরাফাত মাতবর পিতা আবু তাহের( মাতবরপাড়া), জামাত কর্মী আদিল মাতবর পিতা গোলাম রশিদ সাং ঐ, ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ পিতা ইউছুফ মাতবর, সাং ঐ,সোহেল মাতবর সাং ঐ গিয়াস উদ্দিন, পিতা আবুল কাশেম সাং ঐ দিদার পিতা শামছুল আলম (কইয়ার বিল),
খলিল পিতা আব্দুল জলিল সাং ঐ, ইছহাক মেম্বার সাং (লেমশিখালি) তার ভাই মিজান, সোহেল পিতা জালাল আহমেদ (দক্ষিণ ধুরং), কোয়েশ পিতা নুরুল কবির সাং (মাতবর পাড়া),জাফর সাং (কৈয়ারবিল),যুবদল নেতা হুমায়ন পিতা আবু ছৈয়দ সাং (লেমশিখালি) এদের মধ্যে বেশ কজন পলাতক থাকলেও বেশির ভাগেই সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত বলে তথ্য রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, এরা বেশিরভাগেই এলাকায় প্রভাবশালী এবং দাপুটে। কেননা মাতবরবাড়ির একজন জেলা পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা ও বিএনপি জামাতের নেতারা এসব মাদক কারবারির আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা। যার প্রভাবে কুতুবদিয়ার পুলিশও অভিযানে যেতে সময় নিচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিমত। ফলে এখনো অধরা থেকে যাচ্ছে কুতুবদিয়ার মাদক ব্যবসায়ীরা।

সূত্রে আরো জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে যাদের নাম তালিকায় রয়েছে, সেসব গডফাদার, সরকারদলীয় প্রভাবশালী আশ্রয়দাতা, বিনিয়োগকারীসহ পৃষ্ঠপোষক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাও জনপ্রতিনিধিদের আইনের আওতায় আনা না গেলে,কুতুবদিয়ায় মাদকের মূলোৎপাটন সম্ভব নয় বলে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

না হয় দিনদিন মরণ নেশা ইয়াবার বিষাক্ত ছোঁবলে সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া নিঃশেষ হয়ে যাবে অচিরেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অন্য মাদকের পরিবর্তে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এই দ্বীপে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কুতুবদিয়ায় মাদকাসক্তের শতকরা ৭৫-৮০ ভাগই এখন ইয়াবাসেবী। পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও সেবন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় দ্রুত ইয়াবার বিস্তার ঘটছে। মাদক কারবারিদের এ দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে, এসব প্রতিরোধ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে দ্বীপের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। যদিও পুর্বের চেয়ে অনেকটা কমেছে জলদস্যুতা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফ হতে সমুদ্রপথে সরাসরি কুতুবদিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়ন বড়ঘোপের স্টীমারঘাট, লেমশীখালী ইউনিয়নের দরবারঘাট, উত্তর ধূরুং ইউনিয়নের ধূরুংঘাট ও আকবরবলী ঘাটসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা দ্বীপে নিয়ে আসে।

জানা যায়, কুতুবদিয়া হাসপাতালের পেছনের পুরাতন ভবন, বড়ঘোপের মগডেইল এলাকার কয়েকটি বাড়ি, কলেজ গেইটের লাশঘর, কুতুবদিয়া আদালত ভবন, উপজেলা গেইট, অমজাখালীর আল আমীন মার্কেট, সমূদ্র বিলাস হোটেল, মুরালিয়ার কয়েকটি বাড়ি, স্টীমার ঘাট কৈবর্ত্য পাড়া, লেমশীখালী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, দরবার ঘাটের বিশ পরিবার কলোনি, ধুরুং বাজারের পুরাতন খাদ্য গুদাম, কুতুব শরিফ দরবার, দরবার রাস্তার মাথা ধুরুং বাজারের কয়েকটি দোকান ঘর, ধুরুং ঘাট, উত্তর ধুরুং এর কুইলার পাড়া, ইফাদ কিল্লা, আকবর বলির ঘাট এলাকা, কৈয়ারবিল পুরাতন কমিউনিটি সেন্টার ভবন, আইডিয়াল হাইস্কুল এলাকা, আলী আকবর ডেইল শান্তি বাজার এলাকা, পূর্ব আলী আকবর ডেইল ঘাটঘর, তাবালের চর এলাকাগুলো যেন মাদক সেবনের গোপন আস্তানা নামে পরিচিত এবং এসব স্থানে নিয়মিত বসে মাদক সেবনের আসর।

আর এসব আসরে গাঁজা সাধারণত ‘শুকনা’, ‘সবজি’ নামে পরিচিত, ইয়াবা বা বাবা দু-তিন প্রকার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় ছোট মাথা এবং ৫০০ থেকে ৬০০টাকায় বিক্রি হচ্ছে বড় মাথা। আর মাত্র ২০ টাকায় পাওয়া যায় গাঁজার পুঁটলি। অনেকে গ্রাম হিসেবে কিনে থাকেন। মাঝে মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের অভিযানে এলাকার চিহ্নিত কয়েকজন চুনোপুঁটি ইয়াবা ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও রহস্যজনক কারণে বড় বড় লাঘববোয়ালেরা বহাল তবিয়তে রয়েছে।

এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতও এখনো পর্যন্ত মাদক বিরোধী কোন উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেননি। তবে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়।

কক্সবাজার জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সুমন বলেন, “তাদের কোনো অস্ত্রধারী লোকবল নেই। পুলিশের সাহায্য ছাড়া তাদের পক্ষে অভিযান পরিচালনা বা গ্রেফতার করা প্রায় অসম্ভব”।

কুতুবদিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দিদারুল ফেরদৌস বলেন, “মাদকের ব্যাপারে প্রশাসন জিরো টলারেন্সে আছে। সারাদেশের ন্যায় কুতুবদিয়াতেও মাদক নির্মুলে অবিরত অভিযান চলছে”।

তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে ১২/১৩টি মামলা রুজু হয়েছে এতে ২৯জন মাদক কারবারি ধরা পড়েছে। অভিযানের মুখে বেশ কয়েকজন মাদক কারবারি গা ঢাকা দিলেও তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং মাদক ব্যবসায়িরা যতই শক্তিধর হোক না কেন, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে জানান তিনি।

কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আফরুজুল হক টুটুল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত আছে। পুলিশ আইন মেনেই এ অভিযান পরিচালনা করছে এবং চলবে বলে জানান।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top