বিশ্বকাপের যত আশ্চর্য ঘটনা!

e0d7e587b89e8ba50589a0cf573e03d6-5b13b86f27bf6.jpg
চলে এল বিশ্বকাপ ফুটবল। গত পর্বে ১৯৭৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই প্রাচীন সময়টার অনেক অদ্ভুত ঘটনা সম্পর্কে জেনেছিলাম। আজ আসুন চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ১৯৯৪ থেকে ব্রাজিল বিশ্বকাপ (২০১৪) পর্যন্ত অদ্ভুত সব ঘটনা সম্পর্কে! লিখেছেন নিশাত আহমেদ

ম্যারাডোনার পতন

১৯৮৬-তে বিশ্বকাপ জিতে দেশকে আনন্দে ভাসানো ডিয়েগো ম্যারাডোনা একটুর জন্য পরের টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনাকে আরেকটা শিরোপা এনে দিতে পারেননি। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হারে আর্জেন্টিনা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপটা ছিল আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির শেষ সুযোগ। কিন্তু সেবার ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে দুটো ম্যাচ খেলেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত যেতে হয় ম্যারাডোনাকে। আর আর্জেন্টিনাও বাদ পড়ে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে!
·
ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারের পর বিমর্ষ রোনালদো। ছবি: ফাইল ছবিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারের পর বিমর্ষ রোনালদো। ছবি: ফাইল ছবি

নিষ্প্রভ রোনালদো
১৯৯৪ সালে ব্রাজিলে নতুন তারকার উত্থান হয়, নাম তার রোনালদো নাজারিও ডি লিমা। পিএসভির হয়ে মাত্র ৪৬ ম্যাচে ৪২ গোল করা রোনালদো নজরে আসেন বার্সেলোনার। বার্সেলোনা তখন তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় বানিয়ে নিয়ে আসে। বার্সেলোনায় এক মৌসুমে ৩৭ ম্যাচে ৩৪ গোল করে রোনালদো আবারও বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হয়ে পাড়ি জমান ইন্টার মিলানে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে এই রোনালদোই ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা। ফাইনালের আগ পর্যন্ত ৪ গোল করে ফাইনালে ওঠায় বড় ভূমিকাও রেখেছিলেন রোনালদো। কিন্তু ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল শুরুর আগে ব্রাজিলের মূল একাদশে প্রথমে রোনালদো ছিলেন না!
কেন? কি হয়েছে রোনালদোর? চারদিকে সাড়া পড়ে গেল। জানা গেল, রোনালদো অসুস্থ। বলা হয়েছিল, রোনালদো ম্যাচের দিন ‘কনভালসিভ ফিট’ বা একধরনের মৃগীরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাই মূল একাদশে তাঁর জায়গায় এডমুন্ডোকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই পরিবর্তিত মূল একাদশে এডমুন্ডোর জায়গায় ফেরানো হয় রোনালদোকে। ফাইনালের পুরো নব্বই মিনিট রোনালদো যেন ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে, গোল করা দূরের কথা, স্বাভাবিক খেলাই খেলতে পারেননি। তার পাদপ্রদীপ কেড়ে নেন ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান, জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে জেতান অধরা বিশ্বকাপ।
আসলে কি হয়েছিল সেদিন রোনালদোর? অনেকে বলেন বিশ্বকাপ ফাইনালে দলের মূল খেলোয়াড় হিসেবে খেলার চাপটা নিতে পারেননি তিনি। ফলে আতঙ্কে তাঁর একধরনের ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন’ হয়। যাই হোক, ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জিতে সেই অপ্রাপ্তি ঘুচিয়ে দেন রোনালদো!
·
নির্লজ্জ বায়রন মরেনো
ফ্রান্সেসকো টট্টি, দেল পিয়েরো, বুফন, গাত্তুসো, ভিয়েরি সমৃদ্ধ প্রতিভাবান ইতালি দল ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জিততে পারে, এমনটাই ভেবেছিলেন অনেকে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দ্বিতীয় রাউন্ডে কোরিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় ইতালি। ১৮ মিনিটে ইতালিয়ান স্ট্রাইকার ভিয়েরির দেওয়া গোলটা ৮৮ মিনিটে শোধ করে দেন সিউল কি-হিউন। পরে ১১৮ মিনিটের ‘গোল্ডেন গোল’ করে ইতালিকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে ফেলেন আন জুন-হুয়ান। কিন্তু আন জুন-হুয়ান নন, এই ম্যাচে সবাই মনে রেখেছে রেফারি বায়রন মরেনোকে।
জঘন্যতম রেফারিং করেছিলেন মরেনো। ইতালিয়ানরা তো আজও তাঁকে শাপ-শাপান্ত করে! ইকুয়েডরের এই রেফারি বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত দেন যার মাশুল গুনতে হয়েছিল ইতালিকে। অতিরিক্ত সময়ে ড্যামিয়ানো টমাসির গোল খামোখাই অফসাইড ডেকেছিলেন মরেনো। এ ছাড়া বিনা কারণে টট্টিকে লাল কার্ড দেখান তিনি। ইতালি তো ম্যাচটা হেরে গিয়েছিল আসলে এই দুই সিদ্ধান্তের পরই! আন-জুন হুয়ানের গোলটা শুধু কাজ করেছিল কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে। যার ফলে তারকায় ঠাসা এক দল নিয়েও দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয় ইতালিকে—শুধু ন্যক্কারজনক রেফারিংয়ের জন্য!
·
জিদানের ঢুস!
২০০৬ সালের বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সের অবস্থা ছিল অনেক খারাপ। এতটাই খারাপ যে দলকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত দলের কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান, লিলিয়ান থুরাম প্রমুখ কে অবসর ভেঙে চলে আসতে হয়। জিদানের ছোঁয়ায় পুনরুজ্জীবিত ফ্রান্স উঠল ফাইনালে। নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে সমতায় থাকা ম্যাচটা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এর পরেই বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে আশ্চর্যজনক এক ঘটনার—চিরকালের ঠান্ডা মেজাজি জিনেদিন জিদান হঠাৎ করেই ইতালি ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে ঢুস মেরে বসেন!
মাতেরাজ্জিকে ঢুস মেরে ফেলে দিচ্ছেন জিদান। ছবি: ফাইল ছবিমাতেরাজ্জিকে ঢুস মেরে ফেলে দিচ্ছেন জিদান। ছবি: ফাইল ছবি

কী এমন হয়েছিল, যে কারণে জিদান মেজাজ হারিয়েছিলেন? পরে জানা গেল, জিদানকে উত্ত্যক্ত করতে তাঁর বোনকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছিলেন মাতেরাজ্জি। ফরাসি কিংবদন্তি তা সইতে না পেরে ঢুস মেরে বসেন মাতেরাজ্জিকে। পরিণামে দেখতে হয় লাল কার্ড! নিজের শেষ ম্যাচে জিদান এভাবেই বিশ্বকাপ উপহার দিয়ে আসেন ইতালিকে!
·
ল্যাম্পার্ডের না হওয়া গোল
২০১০ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড। ৩২ মিনিটেই মিরোস্লাভ ক্লোসা আর লুকাস পোডলস্কির গোলে এগিয়ে যায় জার্মানরা। ৩৭ মিনিট থেকে ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরতে শুরু করে ইংলিশরা। ডিফেন্ডার ম্যাথিউ আপসনের গোলে ব্যবধান কমায় ইংল্যান্ড। এরপর ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের এক গোল গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারকে পরাস্ত করে গোললাইন অতিক্রম করলেও গোল দেননি রেফারি! পরে সেই ম্যাচ ৪-১ গোলে হারে ইংলিশরা। অনেকের মতে, ল্যাম্পার্ডের সেই গোলটা হলে হয়তো ম্যাচে ভালোভাবেই ফিরতে পারত ইংলিশরা।
·
কিয়েল্লিনির কাঁধে কামড় দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন সুয়ারেজ। ছবি: ফাইল ছবিকিয়েল্লিনির কাঁধে কামড় দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন সুয়ারেজ। ছবি: ফাইল ছবি

লুইস সুয়ারেজের কামড়-কাণ্ড!
২০১৪ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালির বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এক কাণ্ড করলেন উরুগুয়ে স্ট্রাইকার লুই সুয়ারেজ। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে তিনি ইতালির সেন্টারব্যাক জর্জো কিয়েল্লিনির কাঁধে কামড় বসান! রেফারি মার্কো রদ্রিগেজের চোখে পড়েনি বিষয়টা, ফলে সুয়ারেজকে কোনো কার্ডও দেখতে হয়নি। কিন্তু কিয়েল্লিনি তা মানবেন কেন? রেফারিকে কামড়ের দাগ দেখাতে কাঁধের ওপর থেকে জার্সি সরিয়ে তিনি ছুটে বেড়ালেন কিছুক্ষণ। ওদিকে কামড়-টামড় দিয়ে সুয়ারেজ নিজেই দাঁতে আঙুল চেপে শুয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, যেন কিয়েল্লিনিকে কামড়াতে গিয়ে নিজেই দাঁতে বড় চোট পেয়েছেন! পরে এই কাণ্ডের জন্য সুয়ারেজকে এক লাখ সুইস ফ্রাঁ, নয় ম্যাচ ও চার মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top