মাদকবিরোধী অভিযানের দুটো বড় গলদ

images-1-1.jpeg

শাহদীন মালিক

১৫ মে বাংলাদেশের সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। উদ্দেশ্য মাদকাসক্তি ও মাদকদ্রব্যের কেনাবেচা দমন করা। ভালো কথা।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭১ সালের ১৭ জুলাই ‘ওয়ার অন ড্রাগস’, অর্থাৎ মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ‘ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি’ নামে মাদক দমনের জন্য নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৪৫ বছর পরও যুদ্ধ অব্যাহত আছে। যুদ্ধে মিত্র থাকলে ভালো হয়, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বড় মিত্র এখন মেক্সিকো ও কলম্বিয়া। মিত্রদেশ মেক্সিকো ও কলম্বিয়াকে এই যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র অনুদান দেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। গত দুই-তিন বছরের হিসাবে দেখছি, যুক্তরাষ্ট্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রথমবারের মতো শতকরা ১০ ছাড়িয়ে গেছে।

মাদকের বিরুদ্ধে সর্বশেষ বড় যুদ্ধ ঘোষণা দিয়েছেন ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। এই যুদ্ধে ফিলিপাইনে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। দুতার্তে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ম্যানিলা বে’র জেলেরা বড়লোক হয়ে যাবে। অনেকটা আমাদের পদ্মা-মেঘনা সংযোগের চাঁদপুরের মাঝিদের মতো। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় যদি শত শত মানুষের লাশ ফেলা হয় আর সেই লাশের গলিত মাংস খেয়ে মাছগুলো যদি মোটাতাজা হয় আর জেলেরা সেই মোটা মোটা মাছ ধরে বিক্রি করেন, তবে তাঁদের আয়–উন্নতি হতে পারে। দুতার্তে ম্যানিলা বে’র জেলেদের এ রকম আশ্বাস দিয়েছিলেন। ওই জেলেদের আয়-উন্নতি হয়েছে কি না, সে খবর এই অধম এখনো পায়নি। দুতার্তে আরও বলেছেন, তাঁর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই যুদ্ধে দরকার হলে নারী মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের যৌনাঙ্গ তাক করে গুলি করবে। আমাদের যুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। নিক্সনের শুরু করা আর দুতার্তের চালিয়ে যাওয়া যুদ্ধগুলোর সবক আমাদের অভিযান-কর্তাদের হয়তো কাজে দেবে, উপকারে আসবে।

২.
গলদের কথায় আসি। এই সব তথাকথিত যুদ্ধের কেন প্রয়োজন হয়? কারণ একটা। যাঁদের দায়িত্ব ছিল মাদক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখা, মাদক অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা, তাঁরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতা চলছে বহু বছর, যুগ যুগ ধরে। সীমান্ত পেরিয়ে আগে আসত ফেনসিডিল, এখন ইয়াবা। অর্থাৎ মাদক এ দেশে পাচার হচ্ছে অবাধে, ডুগডুগি বাজিয়ে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, বাসে-ট্রাকে, লঞ্চে-স্টিমারে, রিকশা-ভ্যানে, গাড়িতে ও আরও বহু আকারে ও প্রকারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধাবিপত্তি নেই বললেই চলে।

মাদক কারবারিরা একেবারেই যে ধরা পড়ছে না, তা নয়। মামলাও হচ্ছে। কিন্তু ফলাফল শূন্যপ্রায়। এখান-ওখান থেকে জানা গেছে, হাজার হাজার, সম্ভবত লাখ লাখ মাদক মামলা বিচারাধীন বছরের পর বছর ধরে। তারিখের পর তারিখ পড়ে, সাক্ষী আসে না, জব্দ তালিকার সাক্ষী সম্পূর্ণ লাপাত্তা, তদন্তকারী কর্মকর্তা ইতিমধ্যে বদলি হয়ে গেছেন তিনবার তিন জেলায়, আর তাই বছরের পর বছর তারিখ পড়ে। বিচার হয় না, শাস্তিও হয় না। সরকারি কৌঁসুলিদের নিয়োগ সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে, প্রধানত রাজনৈতিক বিবেচনায়, দক্ষতা-যোগ্যতা যাচাইয়ের কোনো বালাই নেই। মামলা শেষ হলো কি হলো না, তাতে তাঁদের কিছু যায়-আসে না। সরকার বদল হলে তাঁদের চাকরি শেষ। দুই-চার বছরে যা পাওয়া যায়, উপরিসহ, সেটাই মুখ্য। আট-নয় মাস আগে এক সংবাদপত্র রিপোর্ট করেছিল যে তখন সারা দেশে ২ লাখ ১৬ হাজারের মতো মাদক মামলা বিচারাধীন ছিল। সেই অবস্থার অবনতি ছাড়া উন্নতি নিশ্চয়ই হয়নি, উন্নতি বা সংস্কারের জন্য কেউ তো কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

এই সব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অযোগ্যতা আর অদক্ষতার সমাধান গুলি করে মানুষ মেরে করা যাবে না। যখন এই সব প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে যায়, তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়। মাদকাসক্তি নিঃসন্দেহে এবং নিশ্চয়ই একটা মহা সমস্যা। মাদকের খপ্পরে পড়ে হাজার হাজার, লাখ লাখ তরতাজা তরুণ জীবন তিলে তিলে অতল গহ্বরের দিকে যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে মাদকাসক্তের ভাইবোন, মা–বাবা, ছেলেমেয়ে—সবার জীবন হয়ে যাচ্ছে এলোমেলো। কিন্তু জনগণ দেখছে প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন কিছু করতে পারছে না। তৈরি হয় অসন্তোষ, রোষ ও নিরাপত্তাহীনতা। জনগণ চায় সরকার ফলপ্রসূ কিছু করুক, এই রকম পরিস্থিতিতেই সাধারণত সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বহু দেশে এটা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুতার্তে ক্ষমতায় এসেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিলেন, ‘আমাকে ভোট দাও, আমি প্রেসিডেন্ট হলে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাব। সবাইকে মেরে সাফ করব।’

কিন্তু মাদক দমনের জন্য রাষ্ট্র বা সরকার যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করে, সেগুলো যদি ঠিকমতো তাদের দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের জায়গায় বা আগের অবস্থায় রেখে বন্দুকযুদ্ধ করে মাদক সমস্যার সমাধান করা যাবে না। ধরে নিলাম, হাজার হাজার মাদক কারবারির তালিকা সরকারের কাছে আছে। নিকট ভবিষ্যতে তাঁদের প্রত্যেকেই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হবেন, তাহলে কি সমস্যার সমাধান হবে? প্রতিষ্ঠানগুলোর যদি কোনো পরিবর্তন না হয়, সংস্কার না হয়, দক্ষতা-যোগ্যতা না বাড়ে, ঘুষ-দুর্নীতি বহাল তবিয়তে থাকে, তাহলে কি মাদক দমন হবে?

৩.
বছর বিশেক আগে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলাম। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে পল পট সরকার ভেবেছিল, ওই দেশের সব বদ মানুষকে মেরে ফেললে দেশটা সাংঘাতিক ভালো হয়ে যাবে। ওই সরকার চার বছরে মানুষ মেরেছিল ২০ লাখ। দেশের মোট জনসংখ্যার কমবেশি এক-চতুর্থাংশ। কী দেখেছিলাম, কী বুঝেছিলাম এই কথায় নাই-বা গেলাম। তবে এত মানুষ মারার চার দশক পরও কম্বোডিয়া যেখানে ছিল, সেখানেই আছে। সুইজারল্যান্ড হতে কত যুগ লাগবে, কে জানে। কথায় কথায় যখন সুইজারল্যান্ড চলেই এল, তখন বলেই রাখি, সুইজারল্যান্ডে কেন্দ্রীয় সরকার নেই বললেই চলে। যেমন নেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক।

এই সরকার ২০১৪ সালে এবারের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর কম্বোডিয়ার হুন সেন বাংলাদেশ সফরে আসা প্রথম সরকারপ্রধান। হুন সেন সরকারপ্রধান আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে। অকাতরে, নির্বিচারে মানুষ মেরে কোনো দেশ, জাতি বা সরকার সামাজিক কোনো সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে বলে জানা নেই। সরকার ১৫ মে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, যুদ্ধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই মাদক কারবারিরা শুধু যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে তা নয়, একে অপরের সঙ্গে ভীষণভাবে বন্দুক নিয়ে গুড়ুম গুড়ুম করতে লেগে গেছে। নিজেরাও মারছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেও মরছে। বিচার ছাড়া মানুষ মরছে। পুলিশের হাতে মানুষ মরছে, র‍্যাবের গুলিতে মানুষ মরছে। গত বিএনপি সরকারের প্রথম দিকে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি দমনে যৌথ বাহিনীর হাতে ‘হার্ট অ্যাটাকে’ মানুষ মরেছিল কমবেশি ৬০ জন। ওই মানুষগুলো মরার দেড় দশক পর সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি কি বিন্দুমাত্র কমেছে? তখন সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজি করত অপরাধীরা, এখন আমরা সবাই মনে করি যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা অংশ শুধু সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিই করে না, মাদক অপরাধও করে, এমনকি ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করেছে। আর কিছুদিন মানুষ মারলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা বড় অংশ অপ্রতিরোধ্য অপরাধী হয়ে পড়বে। যে দেশেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিচারবহির্ভূতভাবে মানুষ মারা হয়েছে, সেই সব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই এখন অপরাধ করছে অনেক বেশি। আর তারা সবচেয়ে আগে আইনের ঊর্ধ্বে। প্রতিষ্ঠানের সংস্কার না করে, আর মানুষ মেরে মাদক দমন হবে না, দেশের অবস্থা হবে খারাপ থেকে খারাপতর। যদিও এই মুহূর্তে অনেকেই মনে করবেন, সরকার তো ভালোই করছে।

ড. শাহদীন মালিক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top