সাতক্ষীরায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত আজীজ মাদক ব্যবসায়ী নয়, ছিলেন কৃষক

Gunfight_27-05-18-1.png

ফাইল ছবি

চ্যানেল আই অনলাইন।।

এলাকাবাসী ও পরিবারের দাবি, ওই ব্যক্তি মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন না। ঘটনার আগে তাকে ডেকে নিয়ে যায় পুলিশের একজন সোর্স।

পুলিশের দাবি, গত ২৪ মে কালিগঞ্জের ভাড়াসিমলা ইউনিয়নের চৌবাড়িয়া গ্রামে দুইদল মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হন আবদুল আজীজ (৫০)।

তবে চ্যানেল আই অনলাইনের অনুসন্ধানে উঠে আসে ভিন্ন ঘটনা। নিহত ব্যক্তির পরিবার, তার এলাকার রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন আবদুল আজীজকে ভালো লোক বলেই অভিহিত করছেন।

সাতক্ষীরার সদর উপজেলার পরানদহ গ্রামের সদর থানার বাসিন্দা ছিলেন আবদুল আজীজ। পেশায় ছিলেন একজন কৃষক। অভ্যস্ত ছিলেন সাদামাটা জীবনে। নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি ও জমিজমা দেখভাল করেই কাটতো তার দিন।

তার মেয়ের জামাই রেজাউল ইসলাম চ্যানেল আই অলাইনকে বলেন, ‘ছয় রমজানের দিন ইফতার করে মাগরিবের নামাজের পর বাড়িতে ছিলেন আবদুল আজীজ। এসময় পুলিশের ফোর্স হিসেবে কাজ করা আসাদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বাজারে যাওয়ার কথা বলে তাকে ডেকে নিয়ে যায়।

‘তারপর থেকেই তার সাথে সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে খবর আসে তার গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে আছে পার্শ্ববর্তী চৌবাড়িয়া গ্রামে।’

বন্দুকযুদ্ধ-মাদকবিরোধী অভিযান
ফাইল ছবি

ঘটনার পর পুলিশ ধারণা করে, আবদুল আজীজ মাদক ব্যবসায়ীদের দু’দলের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়।

আবদুল আজীজের পরিবারের দাবি, ২০০৬ সালে টাকা না পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশ মাদকের মামলা দিয়ে  আবদুল আজীজকে গ্রেপ্তার করে। সেসময় পুলিশ তার পকেটে হিরোইন ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

ওই মামলায় আবদুল আজীজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। পরে হাইকোর্ট থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

এরপর তিন মাস আগে মাদক ব্যবসায় জড়িত অভিযোগে স্থানীয় একটি বাজার থেকে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ধরে নিয়ে যায় আবদুল আজীজকে। এরপর তার পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা।

টাকা না দেওয়ায় ২০ পিস ইয়াবাসহ তাকে চালান দেয়া হয় আদালতে। এই মামলায় তার ১ মাস ৭ দিন জেল খাটতে হয়। পরে জামিন পান তিনি।

ব্যক্তি জীবনে আবদুল আজীজের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। মেয়েরা বিবাহিত। একমাত্র ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র। আজীজের বাবা কেমারত আলী ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি। ইবাদাত বন্দেগীতেই কাটতো তার দিন।

আজীজের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িত। তার বিরুদ্ধে থানায় অন্তত ১৪টি মামলা রয়েছে।

তবে নিহতের পরিবার পুলিশের দাবি অস্বীকার করে বলছে, তিনি কোনো ধরনের মাদক ব্যসার সাথে জড়িত ছিলেন না। তার নামে থানায় কোনো মামলাও ছিল না।

রেজাউল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে আরো বলেন: ‘আমার শ্বশুর ভালো লোক ছিলেন। এলাকার মানুষও জানে তিনি কোন ধরনের মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন না। বাসায় যতক্ষণ থাকতেন পত্রিকা পড়ে, টিভি দেখে আর নামাজ পড়ে সময় কাটাতেন।

‘যেদিন ইফতারের পর তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিনও তিনি বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। অাসাদুল ইসলাম নামে একজন তাকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি আসাদের নামে থানায় ১৭/১৮ টি মামলা আছে। বর্তমানে সে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে।’

আবদুল আজীজের বোন তাহমিনা খাতুন জানান, মাছের ঘের নিয়ে বিরোধের জেরে প্রথম মিথ্যা মামলায় তার ভাইকে জেলে যেতে হয়। এরপর সাতক্ষীরা যাবার পথে তাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। সেসময় তার পকেটে মাদক গুজে মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

‘সেসময় আবদুল আজীজের স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ আরও একজন তার কাছে মাদক ছিল না বলে সাক্ষী দিলেও ধোপে টেকেনি কিছুই। তৃতীয় পক্ষের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাকে।’

তিনি আরো জানান, এরপর থেকে ৩/৪ মাস পর পর ধরে নিয়ে যাওয়া হতো তার ভাইকে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে আটক করে পুলিশ। বলা হয় মাদকসহ আটক করা হয়েছে তাকে।

‘একদিন ছেলের স্কুলের আঙিনা থেকে তাকে আটক করা হয়। সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে জমা দেয় তার পরিবার। সেই ফুটেজে দেখা যায় স্কুলের আঙিনায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন আবদুল আজীজ। সেসময় পুলিশের দুই সদস্য এসে তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।’

এ ঘটনার পর ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আজীজকে জামিন দেন এবং একই সাথে  পুলিশ সুপারকে একটি কারণ দর্শানো নোটিশ দেন। এরপর পুলিশের সেই দুই সদস্য এসে আবদুল আজীজের হাতে পায়ে ধরে তাদের চাকরি বাঁচানোর জন্য সহায়তা করতে বলে।

এই বিষয়টিকেই আবদুল আজীজের বোন তার ভাইয়ের সাথে শত্রুতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে কে বা কারা তাকে বুধবার ধরে নিয়ে গেছে সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন তিনি।

জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য
ওই এলাকার ওয়ার্ড অাওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইউনূস আলী বলেন: ‘তিনি খুব ভালো লোক ছিলেন। এলাকার আসহায় দরিদ্র মানুষকে প্রচুর সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তার বাবাও অত্যন্ত সৎ ব্যক্তি ছিলেন। তার মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার কথা কখনো শুনিনি।

তাকে মাদক ব্যবসা করতে দেখেননি উল্লেখ করে ওয়ার্ড অওয়ামী লীগের সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম বলেন: ‘তিনি খুব ভালো লোক ছিলেন। মানুষজনকে অনেক দান করতেন। তার কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে আসেনি। তবে লোকমুখে শুনেছি তার নামে মামলার পাহাড় ছিলো। কিছুদিন পরপরই পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যেতো। তবে আমারা কখনো তাকে অনৈতিক কিছু করতে দিখিনি।’

পুলিশের বক্তব্য:
সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ থানার ওসি হাসান হাফিজুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: গত বৃহস্পতিবার সকালে খবর পেয়ে তারা ভাড়াসিমলা ইউনিয়নের চৌবাড়িয়া গ্রাম থেকে নিহত আবদুল আজীজের লাশ উদ্ধার করে। সেসময় তার লাশের পাশ থেকে ৪৮ বস্তা ফেন্সিডিল, ইয়াবা ও গুলির খোসা উদ্ধার করে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top