যার চুলো নেই, থাকার ঘর নেই সে কিভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ী হয়?

FB_IMG_1527492002599.jpg

দিসিএম

‘পর পর তিনবার টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পরও থাকার একটি বাড়ি করতে পারেননি একরামুল হক। পৈত্রিক বাড়িতে পাওয়া একটি কক্ষে গাঁদাগাদি করে সন্তানদের সাথে দিনাতিপাত করতেন তিনি। সেই ব্যক্তি কিভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ী হয়?’
র‌্যাবের সাথে ‘কথিত’ বন্দুকযুদ্ধে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন সব নির্মম স্ট্যাটাস দিয়ে শোক ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে যুবলীগের সাবেক-বর্তমান নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ। র‌্যাবের এই বন্দুকযুদ্ধের তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকে দাবী করেন, জনপ্রিয়তাই কাল হয়েছে একরামের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটি চক্রকে ব্যবহার করে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবী উঠছে।
কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) ও জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি খোলা চিঠি প্রেরণ করেছেন। ওই খোলা চিঠি গণমাধ্যমেও এসেছে। সেখানে মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, সারা দেশব্যাপী মাদক বিরোধী অভিযানকে যখন দেশের আবাল বৃদ্ধ বনিতা স্বাগত জানিয়েছেন, ঠিক তখনই আপনার (প্রধানমন্ত্রী) এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠে পড়ে লেগেছে প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা একাত্তরের দোসররা। তারা ইয়াবা বিরোধী অভিযানের দোহাই দিয়ে আপনার সন্তানকে হত্যা করেছে। ২৭ মে গভীররাতে টেকনাফে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে আজন্ম আওয়ামী লীগ পরিবারের অহংকার টেকনাফ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও পর পর তিন তিন বার নির্বাচিত কাউন্সিল’র একরামকে হত্যা করা হয়েছে। মাগো এমনভাবে চলতে থাকলে আওয়ামী লীগ তথা বাংলাদেশ নিঃশেষ হতে খুব বেশী সময় লাগবে না।
জানা গেছে, ২৭ মে দিবাগত রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নোয়াখালীয়া পাড়ায় র‌্যাবের সাথে ‘কথিত’ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর একরামুল হক। এসময় তার কাছ থেকে ১০ হাজার ইয়াবা ও দুটি অস্ত্র পাওয়া যায় বলে দাবী করে র‌্যাব।
র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানী কমা-ার মেজর মো. রুহুল আমিন বলেন, একরাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী। ইয়াবা পাচারের খবর পেয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে র‌্যাবকে উদ্দেশ্যে করে একরাম গুলি ছুড়ে। এতে আত্মরক্ষার্থে র‌্যাব গুলি ছুড়লে নিহত হন একরাম।
এদিকে পরিবারের দাবী একরাম কোনদিনও মরণনেশা ইয়াবার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার তারা বিচার চায়।
জানা গেছে, টেকনাফ পৌরসভার মরহুম আব্দুস সাত্তার ছিলেন জমিদার। তার ৪র্থ সন্তান হলেন একরামুল হক। বাবা মারা যাওয়ার পর সবাই আলাদা হয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে সম্পত্তি গুলো শূন্যের কৌটায় চলে আসে। বাবার পৈত্রিক বাড়ি থেকে ভাগাভাগির মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে একটি কক্ষ পান একরাম। একরামের দুটি মেয়ে রয়েছে। দুজনই টেকনাফ বিজিবি স্কুলে পড়াশোনা করে। এরমধ্যে বড় মেয়ে ৮ম শ্রেণিতে আর ছোট মেয়ে ৭ম শ্রেণিতে। পৈত্রিকভাবে পাওয়া ওই একটি কক্ষেই দুই মেয়েকে নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করতেন একরামুল হক। তার সম্প্রতি বলতে ছিল শুধুমাত্র একটি মোটর সাইকেল এবং একটি কালো চশমা। ওই মোটর সাইকেল নিয়ে কলিজার টুকরো দুই মেয়েকে প্রতিদিন স্কুলে পৌছে দিতেন আর নিয়ে আসতেন।
জানা গেছে, একরাম নির্লোভী এবং তুমুল জনপ্রিয় একজন রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধি। একারণে টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের টানা ১২ বছর সভাপতি এবং টেকনাফ পৌরসভার পর তিনবার নির্বাচিত কাউন্সিলর হওয়ার পরও লোভ তাকে বিন্দু পরিমাণ টানতে পারেনি। তাই সন্তানদের পড়াশোনা এবং সংসার চালানোর জন্য আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের দ্বারস্থ হতে হতো তাকে।
জানা গেছে, ২০০০ সালে টেকনাফ পৌরসভার গঠিত হলে একরাম পৌরসভা যুবলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। টানা ১২ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়াও ২০০২ সালের ২ এপ্রিল প্রথমবারের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর তিনি। এসব ক্ষমতা নিজের স্বার্থের জন্য বিন্দু পরিমাণ ব্যবহার করেননি একরাম।
সবার সহযোগীতায় ২০০৭ সালে কাইয়ুকখালীয়া পাড়ায় পৈত্রিকভাবে পাওয়া জমিতে একটি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু ভবন বলতে সেখানে দৃশ্যমান করতে পেরেছেন শুধুমাত্র কয়েকটি পিলার। টাকার অভাবে ছাদ করতে না পারায় সেই পিলার গুলো ঝোপ জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, প্রাণের সংগঠন যুবলীগ এবং সাধারণ মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন একরাম। তার বিরুদ্ধে বিচার শালিস অথবা ক্ষমতার প্রভাব কাটিয়ে কোন কিছু আদায় করেছেন এমন কোন অভিযোগ নেই। মানুষের ভালবাসার প্রতিদান দেওয়ার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত ছুটতেন নিঃস্বার্থভাবে।
জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু হওয়ায় বন্ধুদের সাথে যৌথভাবে সিএন্ডএফ ব্যবসা চালু করেন একরাম। কিন্তু রোষানলে সেটিও হাত ছাড়া হয়ে যায়। এরপর টেকনাফ পৌরসভার বাসস্টেশন এলাকায় তাইফিং নামে একটি খাবার হোটেল চালু করেন। ধীরে ধীরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। তাই আর্থিক কষ্টের মধ্যেই সংসার চলতো তার।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাংসদ আব্দুর রহমান বদির সাথে পারিবারিক বিরোধ ছিল একরামের। কয়েক বছর আগে বেসরকারি টেলিভিশন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে এর ‘তালাশ’ প্রোগ্রামে একরামকে মাদকের শীর্ষ ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হয়েছিল। পরে সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান পরিস্কার করেন এবং মিথ্যা সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানান। কিন্তু ওই সংবাদের পর ষড়যন্ত্রকারিরা তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণলয়ের ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় তালিকাভুক্ত করেন। শেষ পর্যন্ত ওই মিথ্যা অপবাদ নিয়ে তাকে প্রাণ দিতে হলো।
এদিকে বাবার কাছে দুই মেয়ে ছিল কলিজার টুকরো। তাদের পড়াশোনার জন্য সবার কাছে হাত পাততেন একরাম। কিন্তু বাবার মৃত্যুর কারণে এখন সন্তানদের পড়াশোনা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গতকাল রোববার রাত ১০ টায় নিহত একরামের জানাযার জন্য নির্ধারিত ছিল টেকনাফ ঈদগাহ মাঠ। কিন্তু লোক সমাগম বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে টেকনাফ পাইলট স্কুলের মাঠে একরামের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শোকার্ত মানুষের ঢল নামে।

সূত্র,   দৈনিক কক্সবজার

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top