মাদক সম্রাজ্ঞী পারুলের সহযোগী ৪০ নারী ৩০ শিশু কিশোর

33422702_116269422590273_2790972699306885120_n.jpg

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম মহানগরীর মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত সদরঘাট থানার বরিশাল কলোনী। ১২ বছর আগে এ মাদক স্পটের অন্যতম হোতা ফারুক-ইউসুফ গ্রুপের নারী সদস্য হিসেবে এ পেশায় আধিপত্য বিস্তার করে ভাবি পারুল বেগম। কলোনিতে তিনি ‘পারুল আপা’ নামে পরিচিত হলেও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে যার পরিচয় ‘ভাবি’ হিসেবে। এক যুগ ধরেই ৪০ জন নারী ও ৩০ জন শিশু কিশোরকে কাজে লাগিয়ে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে ছিলো এ মাদক সম্রাজ্ঞী ।

২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর র‌্যাবের সাথে বন্ধুকযুদ্ধে ফারুক নিহত হলে এ দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয় ছালামত। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রশাসনের উদ্ধতন কর্মকর্তাদের মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারির পর যখন পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও অভিযানে নামে, তখন স্পট ছেড়ে পালিয়ে যায় ইউছুফ ও ছালামত। কিছুদিন পর নিহত ফারুকের ভাই মো. শুক্কুরকে সাথে নিয়ে বরিশাল কলোনী হিসেবে নগরীর প্রধান এ মাদকস্পটি নিয়ন্ত্রণে নেয় পারুল।

১৯ মে সদর ঘাট থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে তাদের সিন্ডিকেটের তিন সদস্য গ্রেফতার হলে স্পট ছেড়ে শুক্কুরও গাঁ ডাকা দেন। সর্বশেষ ২৩ মে সদরঘাট ও কোতয়ালী থানা পুলিশ যৌথভাবে মাদক স্পটের ৩০টি খুপড়ি ঘর উচ্ছেদ করে দিলে এ স্পটে একদিন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে মাদক বেচাকেনা। বৃহস্পতিবার রাতে পারুল ল্যাঙ্গা লোকমানের কলোনিতে সহযোগীদের নিয়ে মজুদ রাখা মাদক অন্যত্র সরিয়ে নিতে গেলে খবর পেয়ে অভিযানে নামে পুলিশ।

গোপন তথ্যে খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১ টা থেকে ভোররাত সোয়া ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৪ ঘন্টার অভিযান পরিচালনা করে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এসএম মোস্তাইন হোসাইনের নেতৃত্বে সদরঘাট থানা পুলিশ এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে প্রথমে স্পট নিয়ন্ত্রক পারুল বেগম ও তার সহযোগী জহুরা বেগমকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে নালার ভেতরে সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ৪ বস্তায় ৬৫০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পারুল বেগম সরাসরি ভারত থেকে এসব ফেনসিডিল নিয়ে আসেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন।

.

রাতভর অভিযান শেষে সকালে প্রেস ব্রিফিং করে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিএমপির অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার সৈয়দ আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, গত ২৩ মে বরিশাল কলোনীর মাদকস্পটের প্রায় ৩০টি খুপড়ি ঘর উচ্ছেদের একদিন পর পুনরায় এ স্পটটি নিয়ন্ত্রণে নেয় মাদক ব্যবসায়িদের কাছে ভাবি হিসেবে পরিচিত পারুল বেগম।

লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থানার চর রুহুতি এলাকার মো. জাহাঙ্গীরের স্ত্রী পারুল বেগম বরিশাল কলোনীতে গত ১২ বছর ধরে মাদকের ব্যবসার সাতে জড়িত জানিয়ে রউফ বলেন, পারুল বরিশাল কলোনির সাথে লাগানো স্টেশন কলোনির মাদক ব্যবসায়ী মো. লোকমান প্রকাশ ল্যাঙ্গা লোকমানের ঘর ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া মাদক ব্যবসা প্রসারের লক্ষ্যে বরিশাল কলোনী ও মালি কলোনীতেও তৈরি করেছে পৃথক পৃথক খুপড়ি ঘর। যেখান থেকে পাইকারী ও খুচড়ায় বিকিকিনি হতো মাদক। বরিশাল কলোনীর এ স্পটটি মাদকমুক্ত করতে কয়েকদফা অভিযান পরিচালনা করলেও বার বার পালিয়ে যায় এ স্পটের মূল নিয়ন্ত্রকরা। সর্বশেষ বৃহস্পতিার রাতে অভিযান চালিয়ে বরিশাল কলোনী মাদকের আখড়ার অন্যতম নিয়ন্ত্রক পারুল বেগমকে তার সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়।

.

সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দিন জানান, পারুলের অধীনে প্রায় ৪০জন নারী মাদক বেচাকেনার কাজ করে। এছাড়া ১২-১৪ বছর বয়সী শিশু কিশোর রয়েছে ৩০ জন। দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেতনে এসব শিশু কিশোরদের দিয়ে মাদক বিক্রি ও পাচারের কাজ করিয়ে নেন পারুল বেগম। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পারুল এতবড় গ্যাং তৈরি করে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিলেও সুকৌশলে সবসময় ধরা ছোঁয়ার বাইরেই ছিল। এই প্রথম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তার সহযোগী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া থানার মানিক মিয়ার বাড়ির আবুল হোসেনের স্ত্রী জহুরা বেগমসহ ধরা পড়েছে বরিশাল কলোনীর মাদক সম্রাজ্ঞী পারুল বেগম।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় সদরঘাট থানার এস আই শিমুল চন্দ্র দাস বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মাদক আইনে দায়ের করা এ মামলায় পারুলসহ ১৩ জনকে আসামী করা হয়। অন্যান্য আসামীর মধ্যে রয়েছে বরিশাল কলোনির একসময়ের নিয়ন্ত্রক ফারুকের ভাই শুক্কুর, শ্যালক ওমর ফারুক রানা, ল্যাঙ্গা লোকমান, জহুরা বেগম, শাহ জাহান, হেলাল, জুয়েল, মোশাররফ হোসেন লিটন, সিরাজ, রাজু, কালা মনির এবং কাশেম ওরফে টেরা কাশেম।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top