পরিবারও নিতে চাচ্ছে না তাদের

28056069_1861979803843924_6099235968184363816_n-10.jpg

দিসিএম ডেস্ক।।

সৌদি আরবে নির্যাতিত হয়ে শনিবার (২০ মে) দিবাগত রাতে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন লাবনী (ছদ্মনাম)। এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে রাত ৯টায় আরও ৬৫ জন নারী শ্রমিকের সঙ্গে তিনিও দেশে ফিরে এসেছেন।

আরও দু’বছর আগে রিয়াদ থেকে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার দূরে আল খারজ শহরে কাজের সন্ধানে যান লাবনী। অনেক স্বপ্নকে পুঁজি করে মাত্র এক হাজার রিয়াল বেতনের চাকরি নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে ১৫ দিন তাকে একটি কারাগারের মতো জায়গায় রাখা হয়। এরপর এক মালিকের কাজে তাকে আল খারজ শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর চার মাস সেখানে কাজ করেন তিনি। এই চার মাসে  দেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে তাকে কোনও কথা বলতে দেওয়া হয়নি বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান তিনি। লাবনী বলেন, ‘সেই বাড়িতে আমাকে ঝাড়ু দিতে হতো। তাদের বাসায় ১০টি রুম ছিল। কাজ করতাম কিন্তু খাবার ঠিকমতো দেওয়া হতো না। মালিক আমারে অত্যাচার করতো। আমি চাকরি ছাড়তে চাইলেও আমারে ছাড়তে চায় নাই মালিক। ছাড়ার কথা বললে আরও বেশি করে মাইর দিতো।’

লাবনী আরও বলেন, ‘মালিকের পরিবার ছিল চারজনের। সৌদি আরবে যাওয়ার আগে মিরাজ নামের এক দালালকে ৬০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছিল—অনেক ভালো জায়গা। কিন্তু সৌদি আরবে আমাকে টাকার বিনিময়ে প্রথম মালিকের কাছে বিক্রি করা হয়। মালিকের অত্যাচারে যখন পালিয়ে বের হয়ে যাই, তখন আমাকে ধরে একটা কোম্পানির মাধ্যমে ছয় লাখ টাকায় ‘মক্তবে’ বিক্রি করে দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, “আমার মতো আরও কয়েকশ’ মেয়ে আছে সেখানে। তাদেরকে দেহব্যবসা করাতেও বাধ্য করে। আমি একবার সুযোগ পেয়েছিলাম দেশে কথা বলার। আমার স্বামীকে ফোন দিয়ে সব বলি। তারপর আমাকে সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়।”

লাবনী আরও বলেন, ‘আমার সঙ্গে এত কিছু হওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমারে নিতে চায় না। আমার স্বামীও তার বাপ-মায়ের কথায় মুখ বন্ধ করে বইসা আছে। আমি এই কয়দিন বড় বোনের বাড়িতে আছি। আমারে মনে হয় আর নেবো না।’

এ বিষয়ে লাবনীর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি কথা বলতে রাজি না হলেও পরে বলেন, ‘আমার বাপ-মা চায় না অয় বাড়িত আসুক। এতকিছু হওয়ার পর তারে মাইনা নেওয়া সম্ভব না। বাপ-মা না চাইলে আমার কিছু করার নাই।’

লাবনীর মতো কিছুদিন আগে দেশে ফেরত এসেছেন আফসানা খানম। কাজের উদ্দেশ্যে মাত্র দু’মাস আগেই গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। ফিরে আসার কারণ জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেখানে যাওয়ার পর আমাকে সাতদিন একটা ঘরে আটকিয়ে রেখেছে। সেই ঘরে আরও  ছয়জন মাইয়া ছিল। এক দালালের মাধ্যমে ২০ হাজার ট্যাকা দিয়া গেছিলাম। ১০০০ রিয়াল বেতন দেওয়ার কথা আছিল। আরও বলেছে, কাজ একদম কম আর তারা নাকি ছোট ফ্যামিলি।’

তিনি বলেন, ‘সেখানে যাওয়ার পর প্রথম বাড়িতে মালিকের বউ অনেক মারতো। তাদের ভাষা বুঝতাম না। কাজের দেরি হইলেই লাঠি দিয়া মারতো। এরপর আমারে সেখান থেকে নিয়া আরেক জায়গায় দিছে। সেখানেও ঘরের কাজ। ছোট ফ্যামিলি বইলা আমারে পাঠায়ছিল। কিন্তু গিয়া দেখি অনেক মানুষ পরিবারে। পড়ে সেখান থেকে পালিয়ে বের হইয়া গেছিলাম। আমারে সেখানকার এক লোক ধরছে, ধইরা একটা ক্যাম্পে নিয়া গেছে। সেখানে নিয়া ইচ্ছামতো মারছে। লোহা গরম কইরা ছ্যাঁকা দিছে। এরপর আমারে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিছে।’

আফসানা খানম  বলেন, ‘আমার পাসপোর্ট পর্যন্ত দেয় নাই। কোন ট্যাকাও দেয় নাই। আমি খালি হাতে ফিরছি। ঢাকায় নাইমা বাড়িতে ফোন দিছিলাম। আমার ভাই বলছে সে কিছু করতে পারবে না। বাড়িতে যাইতে না করছে। এলাকার মানুষ নাকি অনেক খারাপ কথা কয় আমারে নিয়া। আমি অহন কই জামু জানি না।’
সীমাহীন দুঃখ আর নির্যাতনের দাগ  নিয়ে দেশে ফিরেও আপনজনের কাছে বা সমাজে মর্যাদা পাননি এই দুই নারী। তাদের মতো অনেকেই এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন। প্রাণ বাঁচাতে দেশে ফিরে এলেও পরিবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারছেন না ফিরে আসা বেশিরভাগ নারী শ্রমিক। আবার পরিবার নিতে চাইলেও সমাজের ভয়ে সম্পর্ক উপেক্ষা করে যেতে হয় তাদের।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারাও চেষ্টা করেছেন অনেকের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বুঝিয়ে রাজি করানো গেলেও তাদের একঘরে করে রাখা হয়। শতভাগ ক্ষেত্রেই এমন বঞ্চনার শিকার হন নারী শ্রমিকরা বলে মনে করেন তারা।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করি, তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বুঝানোর। অনেকে রাজি হলেও ফিরে আসা সেই নারী শ্রমিক অনেকটা একঘরে হয়ে যান। আমরা তাদের শেল্টার ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। এর জন্য যা দরকার তা হলো সামাজিক সচেতনতা আর মানবিকবোধ। এই যে নারীটি কাজের উদ্দেশ্যে গেলেন, গিয়ে নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরে এলেন, এখানে তার দোষটা কোথায়—প্রশ্ন শরিফুল ইসলামের।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top