আতঙ্কে বাস টার্মিনালের ইয়াবা গ্রামের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা

28056069_1861979803843924_6099235968184363816_n-1.jpg

আজিম নিহাদ :
সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও কক্সবাজারে গত বুধবার পর্যন্ত এর কোন প্রভাব ছিল না। একারণে এলাকায় প্রকাশ্যে দিব্যি ঘুরে বেড়ায় শহরের বাসটার্মিনাল ও আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা।
কিন্তু গতকাল ভোরে বাইপাস সড়কের পাশে কাটাপাহাড় এলাকা থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হাসানের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের পর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণে বাঁচতে গা ঢাকা দিচ্ছে অনেকে।
জানা গেছে, ইয়াবা ব্যবসায় ছেয়ে গেছে শহরের বাসটার্মিনাল, লারপাড়া, ডিককুল, নাপ্পাঞ্জাপাড়া এলাকা। একারণে এটি এখন ‘ইয়াবা গ্রাম’ হিসেবেই পরিচিত।
এক সময় বাসটার্মিনালের আশপাশে বসবাসকারি মানুষ গুলো আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছল না হলেও হাল সময়ে এদের বেশির ভাগই কোটিপতি। বিলাশবহুল বাড়ি, গেষ্ট হাউজ, পরিবহনসহ অঢেল ধন-সম্পদের মালিক। রাতারাতি তাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন তাক লাগানোর মতই।
জানা গেছে, এসব এলাকায় প্রায় ৮০ ভাগ মানুষই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। সম্প্রতি এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। দৈনিক কক্সবাজারের অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। এরা হলেন, পশ্চিম লারপাড়ার সৈয়দ আকবর, আহমদ কবির প্রকাশ ইয়াবা কবির, আবুল হোসেনের পুত্র ইমাম হোসেন (রাজমিস্ত্রী), বাসটার্মিনালের নাইটগার্ড নজির আহমদের ছেলে মনু ওরফে বাইট্টা মনু, আবু তালেবের পুত্র মোছা, রুবেল, ইয়ার মোহাম্মদের পুত্র আজিজ, মৃত মোজাফ্ফরের ছেলে চানমিয়া, কবির আহমদ, নুরুল মোস্তফা, দেলোয়ার হোসেন, কালাম, মোস্তাক আহমেদ ওরফে মনু, রবি, বশির আহমেদ, নুরু, সাফোয়া। পূর্ব লারপাড়ার আব্দু ছাত্তার আব্দু, মুফিজ, শামীম, আইয়ুব,আমির হামজা, সাহাব উদ্দিন, ধুল, কামরুল হাসান বাবু, বোরহান ও মানিক। এরমধ্যে কামরুল হাসান বাবুর মা সম্প্রতি ইয়াবা নিয়ে আটক হয়ে কারাভোগ করেন।
এছাড়াও উপজেলা এলাকার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী হলেন মো. ইদ্রিস। যিনি ১০ হাজার ইয়াবা আটক করে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। ইদ্রিস অঢেল সম্পদের মালিক। তাঁর অন্যতম সহযোগী জনৈক নেছার এবং তাঁর ভাই মিজান। নেছারের বিরুদ্ধে ইয়াবা মামলা রয়েছে।
দক্ষিণ ডিককুল এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ীরা হলেন- শাহ আলমের ছেলে আজিজ, আব্বাস, খোকন ড্রাইভার, সিএনজি চালক কামাল। উত্তর ডিককুল এলাকার অন্যতম ইয়াবা ব্যবসায়ী সিরাজ ও নুরুচ্ছবা। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই ইয়াবা পাচারের বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। বর্তমানে ইয়াবার টাকায় দুজনই ভবন নির্মাণ করছেন। এছাড়াও ওই এলাকার সৈয়দ হোসেন, জামাল হোসেনও ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত।
হাজীপাড়া এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ীরা হলেন, বকুল, চুট্টু, শাহ আলম, খোকন ও ইদ্রিস। নাপ্পাঞ্জাপাড়া এলাকার মোহাম্মদ আলম ও কলেজ গেইট এলাকার রানাও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানা গেছে।
জানা গেছে, ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ ওরফে মনু ও এবং কবিরের বাড়ি বাসটার্মিনাল সড়কের দক্ষিণ পাশে দক্ষিণ লারপাড়া এলাকায়। তিন বছর আগেও শ্যামলী পরিবহনের হেলপার ছিলেন তারা। হেলপার থাকাকালিন সময়ে জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা পাচার কাজে। এক পর্যায়ে ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শ্যামলী পরিবহন থেকে মনুকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু থামেনি তাদের ইয়াবা ব্যবসা। রমরমা ব্যবসা করে বর্তমানে কোটি টাকার মালিক।
জানা গেছে, তাঁর ইয়াবা পাচারের তথ্য পুলিশকে জানানোর কারণে কয়েক মাস আগে নিরীহ এক ব্যক্তিকে অপহরণ করেন মোস্তাক আহমেদ ওরফে মনু। পরে তাকে কলাতলীর পারমাণু শক্তি কমিশনের পাশে একটি হোটেলে আটকে রেখে টানা চারদিন নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেয়া হয়। তাঁর অন্যতম সহযোগি ঈদগাঁও এলাকার শাহিন নামে এক ব্যক্তি।
ইয়াবা ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি বাসটার্মিনাল সড়কের দক্ষিণ পাশে। তার পরিবারটি স্থানীয়দের কাছে স্ক্র্যাব ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত। দেলোয়ার স্ক্র্যাব ব্যবসার পাশাপাশি গাড়ির হেলপার হিসাবেও কাজ করতেন। তিন বছর আগেও পাহাড়ের উপর জরাজীর্ণ মাটির ঘরে গাদাগাদি করে থেকে জীবনযাপন করতো তাঁর পরিবার। কিন্তু এখন সেই হাল নেই। ইয়াবা ব্যবসা করে কোটিপতি দেলোয়ার। ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে দুবার গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগও করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ইয়াবা তালিকায়ও তার নাম শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু তাঁর ইয়াবা ব্যবসায় বিন্দু পরিমাণ ভাটা পড়েনি।
স্থানীয়রা জানান, হাসান বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উচিত তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদেরকে সনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, বাসটার্মিনাল, লারপাড়া ও ডিককুল এলাকা থেকে ২০১৭ সালে অন্তত অর্ধশতাধিক ইয়াবা পাচারকারি ও ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। কিন্তু তারা জামিনে বের হয়ে পূণরায় ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দীন খন্দকার বলেন, কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। কেউই রেহায় পাবে না।
র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানী কমা-ার মেজর মো. রুহুল আমিন বলেন, এখন একটাই চ্যালেঞ্জ মাদক ব্যবসায়ী নির্মূল। সুতরাং কেউ পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top