শহরের নুনিয়ারছড়ায় বাঁকখালী নদী প্রবাহে ভরাট করে দখলের মহোৎসব

bakkali-pic-2-810x540-810x540.jpg

আজিম নিহাদ :
কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া এলাকায় নদীর পানি চলাচলের অংশে ভরাট করে বাঁকখালী নদী দখলের মহোৎসব চলছে। এর ফলে নদীর পানি চলাচলের পথ দিনদিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানায়, শহরের কস্তুরাঘাট থেকে উত্তর নুনিয়ারছড়া পর্যন্ত নদীর পশ্চিমপাশে নদীর সাথে লাগোয়া বসবাসরত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ টি পরিবার নদীর প্রবাহের জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি তৈরী করেছেন। প্রশাসনের নজরদারির বাইরে থাকায় বর্তমানে সেখানে দখল উৎসব চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দখলদারেরা নদীর প্রবাহের অংশে ভাটার সময় দেয়াল স্থাপন করে বাঁধ তৈরী করে। পরে সেখানে ইটের কণা ও ময়লা আবর্জনা ফেলে। এরপর আবর্জনা গুলো জমে থাকার কারণে ধীরে ধীরে জায়গাটি ভরাট হয়ে উঠে। পরে সেখানে পূণরায় মাটি ও ইটের কণা ফেলে নদীর জোয়ারের অংশ থেকেও উচু করে ভরাট করা হয় জায়গাটি। এরপর সেখানে টিনের ঘরবাড়ি তৈরী করা হয়। আর নদীর দখল উৎসবের ফলে ধ্বংস হচ্ছে প্যারাবনও।
সরেজমিনে উত্তর নুনিয়ারছড়া বাঁকখালী নদীর পশ্চিমপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পানি চলাচলের অংশে ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ শতক একটি জায়গা। সেখানে ইটের কণা ও ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নদীর জোয়ারের অংশ থেকে কিছুটা উচু হয়ে গেছে। এরপাশে নদীর জায়গায় ভরাট করে তৈরী করা আরও ১০ থেকে ১৫টি টিনের বাড়ি দেখা গেছে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করা জায়গাটি দখল করেছেন ওই এলাকার সৈয়দ করিম ও তাঁর ভাই মোহাম্মদ করিম। শুধু সেটি নয়, এরপাশে তৈরী বাসাবাড়ি গুলোও নদীর জায়গা ভরাট করে তৈরী করেছেন তারা। সেখানে সৈয়দ করিম, তাঁর ভাই মোহাম্মদ করিম ও বোন সাজেদা বেগম মিলে গত তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮০ শতক নদীর পানি চলাচলের জায়গা অবৈধভাবে দখল করেছেন।
দখলদার সৈয়দ করিম বলেন, নদীর পানি চলাচল দূরে চলে যাওয়ায় তারা খালী জায়গা গুলো ভরাট করেছেন। তাঁর দাবী, শুধু তিনি একজন নন, নদীর সাথে লাগোয়া প্রায় বাড়িতেই নদীর জায়গা দখল করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাঁকখালী নদীর পূর্বপাশে কস্তুরাঘাট থেকে পেশকারপাড়া পর্যন্ত এলাকায় জেগে উঠা নদীর জায়গায় অবৈধ দখলদারের তালিকা প্রশাসনের কাছে রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমপাশে নুনিয়ারছড়া অংশে নীরবে নদী দখলের মহোৎসব চললেও প্রশাসন অথবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে সেখানকার দখলদারের কোন তালিকা নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নুনিয়ারছড়া নতুন ফিশারীপাড়া (মগচিতাপাড়া) এলাকায় বাঁকখালী নদীর প্রবাহে ভরাট করে দখল করেছেন সুলতান আহমেদ ও বদিউল আলম। এই দুই দখলদার প্রায় ৩০ শতকের মত নদীর জায়গা দখল করেছেন।
মগচিতাপাড়ার পর মধ্যম নুনিয়ারছড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি নদীর জায়গা দখল করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ আজাদের প্রশ্রয়ে দিনদিন দখলদার বাড়ছে সেখানে। সেখানে ভরাট করে নদীর জায়গা দখল করেছেন স্থানীয় আবু বকর, আব্দুল মজিদ ওরফে মজিদ মাঝি, সৈয়দ হোসেন, সৈয়দ করিম, মোহাম্মদ করিম, সাজেদা বেগম, মো. শফিক, কালা মিয়া, জনৈক জয়নাল কোম্পানী। এর মধ্যে সৈয়দ করিম, তাঁর ভাই মোহাম্মদ করিম ও বোন সাজেদা বেগম দখল করেছেন প্রায় ৮০ শতক। দখল করা বাঁকখালী নদীর অংশে তাঁরা টিনের তৈরী কলোনী (বাড়ি) তৈরী করেছেন। বাসা গুলোতে পানি সুবিধা দেওয়ার জন্য ভরাট করা জায়গায় নলকূপও স্থাপন করা হয়েছে।
এরপর উত্তর নুনিয়ারছড়া নদী দখল করেছেন মো. আজিজুল হক, মো. আলম, শফি মাষ্টার, মো. নাসির ও মোহাম্মদ ওরফে টাওয়ার সেলিম। এর মধ্যে আজিজুল হক, মো. আলম ও শফি মাষ্টারের বিরুদ্ধে প্যারাবন দখলের অভিযোগে বন আইনে মামলাও রয়েছে। নদীর জায়গা দখল করার জন্য তারা প্যারাবন গুলো কেটে ছিলেন। এছাড়াও ফিশমার্ক, নয়ন ফিশ ফ্যাক্টরীসহ নদীর সাথে লাগোয়া বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্টানও ভরাট করে বাঁকখালী নদী দখল করে। সব মিলিয়ে পুরো নুনিয়ারছড়া এলাকায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে।
নুনিয়ারছড়া প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আলম বলেন, পানি চলাচলের জায়গা ভরাট করে নদী দখল করতে গিয়ে ব্যাপক প্যারাবন ধ্বংস করেছে দখলদারেরা। তিনি বলেন, পুরো নুনিয়ারছড়া এলাকায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন দখলদার থাকবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দখলের কারণে নুনিয়ারছড়া অংশে বাঁকখালী নদী দিনদিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
নুনিয়ারছড়া এলাকাটি পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের প্রধান অংশ। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বলেন, উত্তর নুনিয়ারছড়া ঠুইট্টাপাড়া এলাকায় বাঁকখালী নদীর পানি চলাচলের জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি তৈরী করা হচ্ছে। একাধিকবার মৌখিকভাবে জানানোর পর কয়েকদিন আগে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক এলাকাটি পরিদর্শন করেন। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয় সূত্র জানায়, বাঁকখালী নদীর সীমানা নির্ধারণের জন্য গত দুই সপ্তাহ আগে জরিপের কাজ শুরু হয়। এখনও এটি চলমান। এই জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাঁকখালী নদীর কোন অংশে কতজন দখলদার রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা বের হয়ে আসছে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে অধিদপ্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক সাইফুল আশ্রাব বলেন, সম্প্রতি তিনি নুনিয়ারছড়া ঠুইট্টাপাড়া পরির্দশন করেছেন। সেখানে বাঁকখালী নদী দখল করে ১৫ থেকে ২০ টি বাড়িঘর নির্মাণ করতে দেখেছেন তিনি। আগে নির্মাণ করা ঘরবাড়িও রয়েছে সেখানে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট, নুরপাড়া ও পেশকারপাড়া এলাকায় নদীর জায়গা দখলের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে তিনটি মামলা হয়। একটি মামলার অভিযোগপত্র ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। অপর দুটিরও শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) নাজিম উদ্দিন জানান, বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট, নূরপাড়া, পেশকারপাড়া ও টেকপাড়া এলাকায় প্রায় ৭৩ জন দখলদার রয়েছে। এসব এলাকায় বাঁকখালী নদী থেকে জেগে উঠা প্রায় ১০০ একর জমি দখলদারদের অবৈধ দখলে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত ২২ মার্চ তিনি শহরের ৬নং ঘাট এলাকায় নদীর প্রবাহে বাঁধ দিয়ে বাঁকখালী নদী দখলের অভিযোগে ওসমান গণি টুলু নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেন। পরে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- দেন তিনি।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, নানা কারণে বাঁকখালী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। এরমধ্যে উচ্ছেদ তহবিল না থাকা অন্যতম কারণ। তবে এটা প্রক্রিয়াধীন। শিগগিরই ঢালাওভাবে সকল দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top