রমজানের সময়ে কেন ৮০ শতাংশ আমেরিকান মুসলিম রোজা রাখেন?

195981_1.jpg

President Barack Obama hosts an Iftar dinner celebrating Ramadan in the East Room of the White House, June 22, 2015. (Official White House Photo by Lawrence Jackson)

ওমর সোলাইমান: সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে। রমজান মাস এলেই মুসলিমদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। মুসলিমরা কেন সারাদিন কোনো কিছু খান না বা পান করেন না- এনিয়ে স্কুলে মুসলিম শিশুরা এবং কর্ম ক্ষেত্রে বয়স্করা নানা কৌতূহলের সম্মুখীন হন বা এমনকি অবজ্ঞার শিকারও হয়ে থাকেন।

আপনি যদি রোজাদারের সম্মুখে কফি পান করেন, তবে আপনি নিশ্চই আপনার মুসলিম সহকর্মীদের কাছে নিজেকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন অনুভব করবেন না। কিন্তু অন্য ধর্মের লোকেরা বুঝতে পারেন না যে তারা আমাদের আধ্যাত্মিক অনুশীলনে অংশ নিচ্ছেন, মুসলিমদের ইচ্ছাশক্তিকে আরো দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করছেন।

‘এনবিএ’ হলের সাবেক হাকিম একবার বলেছিলেন, ‘যদি লোকজন আপনার সামনে খাবার খান এবং পান করেন, তবে মুসলিমের ইচ্ছাশক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। এটাই হচ্ছে মুসলিমদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ। এটা হচ্ছে কারো জন্যে একটি সুইমিংপুলে সাঁতার কাটা এবং কারো জন্য সমুদ্রের মধ্যে সাঁতার কাটা। সমুদ্র অ্ধিক শক্তিশালী, তাই এটি একজন ভাল সাঁতারু তৈরি করতে পারে।’

গত বছর পিউ রিসার্চ সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমেরিকান মুসলমানদের ৮০ শতাংশই পবিত্র মাসে উপবাস করেন। এই ৮০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া বা অভিবাসী মুসলিম, শ্বেতাঙ্গ বা কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম, নারী বা পুরুষ মুসলিম।

ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক স্তম্ভের হচ্ছে একটি নামাজ। কিন্তু আশ্চর্যজনক যে আমেরিকান মুসলমানরা নামাজের জন্য খুব বেশি সময় ব্যয় করেন না। আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী মুসলিমদের ৩৯ শতাংশ এবং বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মুসলমানদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ বলেছে, তারা দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করেন। তার মানে হচ্ছে- অন্যরা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন না।

এটা অনেকের কাছে শুরুতে বিভ্রান্তির মনে হতে পারে।দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়ে কেন রমজানের সময় অধিকাংশ মুসলিম এত কষ্ট করে কঠিন এই ধর্মানুশীলনটি করেন?

সাম্প্রতিক ‘সিগনা’ গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে একটি ইঙ্গিত নিহিত থাকতে পারে। এতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে একাকিত্বতা মহামারী আকারে ধারন করেছে। প্রায় অর্ধেক আমেরিকান একাকিত্ব অনুভব করেন বা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে আলাপচরিতার মতো দৈনন্দিন সামাজিক ক্রিয়াকলাপে অর্থহীনতা খুঁজে পান।

মানুষ সাধারণত অন্যদের দ্বারা মূল্যায়িত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন, সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযুক্তির অনুভব করেন এবং সেই কারণেই হয়ত অনেক মুসলমান রমজান মাসে রোজা রাখেন।

অনেক মুসলমান আছেন যারা সারা বছর সমজিদে পা রাখেন না, কিন্তু রমজান মাসজুড়ে তারা মসজিদে ভিড় করেন। রমজানের প্রতিটি রাতে মসজিদে মুসল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা মসজিদে নামাজ আদায়, ইফতার, সামাজিকতা এবং তহবিল সংগ্রহ করতে এখানে ভিড় করেন।

প্রকৃতপক্ষে, এ সময়ে প্রায় প্রতিটি মুসলিম বেশি বেশি করে কোরআন পড়তে এবং নামাজ আদায় করতে পছন্দ করেন। ১১ মাসে যতটা ধর্মকর্ম করেন, রমজানের এই এক মাসে তার চেয়ে বেশি করেন। আসলে এটি একটি দলীয় প্রচেষ্টা।

এটাও ইতিবাচক। বৈচিত্র্য এবং সংস্কৃতির মধ্যে অধিকাংশ মুসলমানই ঐক্যের প্রতিনিধিত্ব করার অনুভূতি অনুভব করেন এবং সেইসাথে বিশ্বকে গর্বের সঙ্গে তা প্রকাশ করতে চান।

কিন্তু ইসলাম একটি পরিচয়ের থেকেও বেশি কিছু। ইসলামের মধ্যে দৃঢ়ভাবে নিহিত রয়েছে মানবিক সব অনুশীলন যা আমাদের সব জন্য উপকারি। নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর ঐতিহ্য অনুসারে নামাজের মতোই রোজা রাখাও আল্লাহর আন্তরিক ভক্তি প্রদর্শন করাকে নির্দেশ করে।

আমাদের শরীরের জন্য খাদ্যের ওপর ফোকাস করে আমরা ১১ মাস ব্যয় করি। এই মাসের সুযোগটি গ্রহণ করা মূল্যবান। আমরা এর মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারি এবং প্রতিদিন আমরা মাবুদের যে আশীর্বাদ ভোগ করছি, তার জন্য আমরা তার কাছে স্মরণীয় ও কৃতজ্ঞ থাকব।

এবং সহজেই পাওয়া এমন আশীর্বাদ থেকে নিজেদের সংযম প্রদর্শন প্রক্রিয়ায় আমরা স্বাভাবিকভাবেই যারা সৌভাগ্যবান নয় তাদের জন্য সহানুভূতির পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি। এটা একটি বিশেষ ধরনের উপাসনা যা অবিশ্বাস্যভাবে পবিত্র এবং আত্মার পরিপূরক।

আমার বন্ধু হুসেন আব্দুল্লাহ একজন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়, যিনি খেলার সময় উপবাস করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমি এটা আল্লাহর জন্য করি …আমি একজন কঠিন লোক, তা বলার জন্য আমি এটা করি না।’

যখন আমেরিকান সব মুসলিম পেশাদার ক্রীড়াবিদ নয়, তখন আমরা অবশ্যই হুসেন আব্দুল্লাহর অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে পারি। আল্লাহকে সন্তুষ্ঠ করার জন্য আমাদের এই উপবাস কেবল তার প্রতি আমাদের উচ্চতর সচেতনতা নয়, অধিকন্তু এটি আমাদের এবং আমাদের চারপাশের মানুষের কাছেও একই রকম।

সুতরাং আপনার উপবাসরত মুসলিম বন্ধুর সামনে খাবার খেতে সংকুচ করার কিছু নেই। তারা ইতোমধ্যে এতে অভ্যস্থ হয়ে গেছেন এবং সম্ভবত এটির সঙ্গে আসা স্বতন্ত্রতাকে মেনে নিয়েছেন এবং আপনি যদি আমেরিকান মুসলিমের রমজানের অভিজ্ঞতা সত্যিই দেখতে চান, তাহলে আপনার স্থানীয় মসজিদ পরিদর্শন করতে দ্বিধা করবেন না। আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি যে, আমরা আপনাকে আঘাত করব না।

সিএনএন অবলম্বনে

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top