ঢাকার এসওএস পল্লিতে রয়েছেন বেতনভুক্ত ১৫ মা

2446e3d88f16477bbd22070b911e7677-5af7e8974184e.jpg

দিসিএম ডেস্ক

মমতাপাড়া, সোনালিপাড়া ও দিশারিপাড়ায় থাকেন ১৫ জন বেতনভুক্ত মা। প্রতিদিন এই মায়েরা বিভিন্ন বয়সী আট থেকে নয়জন সন্তানের জন্য স্কুলের টিফিন তৈরি করেন। তিন বেলা খাবার তৈরি, পড়ানো, রাতে ঘুম পাড়ানো সবই সামলান। প্রতিদিন এসব করতে করতে এই বেতনভুক্ত মায়েরা ভুলে যান এটা তাঁদের চাকরি। সত্যিকারের মা হয়ে যান। একসময় সন্তানের সামনে মা মানেই ভেসে ওঠে এই মায়ের চেহারা।

ঢাকার শ্যামলীতে এসওএস শিশুপল্লিতে এই মায়েদের বাস। ১৫ জন মায়ের আছে ১৫টি পরিবার। পল্লিতে মুসলমান শিশুদের পাশাপাশি হিন্দু ও খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী শিশুদের জন্য আলাদা দুটি পরিবারে দুজন মা আছেন। প্রতিটি পাড়ায় আছে পাঁচটি করে পরিবার। এই পরিবারে একেকজন মায়ের বর্তমান সন্তানসংখ্যা আট থেকে নয়। বর্তমানে এই পল্লিতে আছে ১২৬ জন ছেলেমেয়ে। তারা সবাই নিজেদের ভাইবোন বলে পরিচয় দেয়। এরা এতিম অথবা কোনো কারণে বাবা-মায়ের যত্নবঞ্চিত, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারহারা শিশু ছিল। মায়েদের সহায়তার জন্য আছেন বেতনভুক্ত খালাম্মা। পল্লির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এই শিশুরা ভাইয়া ডাকে। সব মিলে পল্লির ভেতরে বিশাল পরিবারে সবাই বাস করছে।

১৫ জন মায়ের মধ্যে কোনো কোনো মা ১৮-১৯ বছর বা আরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। সেই হিসাবে সন্তানসংখ্যা বাড়তে থাকে। কোনো কোনো মায়ের সন্তান ১৭-১৮ জনও আছে। এই সন্তানদের কেউ অধ্যাপক, কেউ চিকিৎসক, কেউবা বিদেশে পিএইচডি করছেন। আবার কোনো সন্তানের বয়স হয়তো সাড়ে তিন মাস বা কয়েক বছর বয়স। ছয় বছরের কম বয়সী যে বয়সেই আসুক, সেই ছেলেমেয়েদের বিয়ে এবং চাকরি না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ২৬-২৭ বা তারও বেশি বয়স পর্যন্ত তাঁদের দেখভালের দায়িত্ব এই মায়েদের। এই দীর্ঘ সময়ে মা ও সন্তানের সম্পর্ক এতটাই গাঢ় হয় যে তারপর আর চেষ্টা করলেও বন্ধন আলগা হয় না। তাই ঈদ, পূজা, বড়দিন বা যেকোনো উৎসবে এই মায়েদের দায়িত্ব কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এমনও হয়, হয়তো যে মা এর আগে দায়িত্ব পালন করতেন, তিনি আর নেই, কিন্তু আগের মায়ের মেয়ের জামাই, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি এসে হাজির। তখন বর্তমান মাকেই সব সামলাতে হয়। ছেলেমেয়েরাও খালি হাতে আসেন না, মায়ের জন্য নিয়ে আসেন নানা উপহার। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠিত ছেলেমেয়ে মাকে আর পল্লিতে না রেখে সঙ্গে করেও নিয়ে যান নিজের সংসারে।

গতকাল শুক্রবার এই অন্য রকম মায়েরা কেমন আছেন, তা জানতেই এসওএস শিশুপল্লিতে যাওয়া। প্রায় আড়াই একর জায়গায় লাল ইটের ছোট ছোট দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়ি। সবুজ ঘাসের মধ্যে সিমেন্টের ছোট রাস্তা দিয়ে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাওয়া যায়। বাড়িগুলোর চারপাশ আম, পেয়ারা, কামরাঙা, সুপারি, কাঁঠালসহ নানান বড় বড় গাছে ঘেরা। সবুজ ঘাসের বড় মাঠ। জবা, কামিনী, গোলাপসহ নানান ফুলের গাছ। প্রকৃতির এই বিশালতার মধ্যেই বড় হচ্ছে বিভিন্ন বয়সী শিশুরা।

রাজধানীর হারম্যান মেইনার স্কুল ও কলেজসহ ছেলেমেয়েরা পড়ছে বিভিন্ন জায়গায়। খেলার পাশাপাশি ছবি আঁকা, গান শেখাসহ তারা নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। আর বিভিন্ন বায়না মেটানোর জন্য মা তো আছেনই। তবে কিশোর বয়স থেকেই ছেলেদের চলে যেতে হয় মিরপুরের যুবপল্লিতে। যুবপল্লির ছেলেমেয়েরা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল থেকে ছুটিতে চলে আসেন মায়ের কাছে। বিয়ের পর মেয়েরা নাইয়র আসেন এখানে।

এসওএস শিশুপল্লি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা। বাংলাদেশসহ ১৩৫টি দেশে কাজ করছে এ সংস্থা। ১৯৪৯ সালে অস্ট্রিয়ার হারম্যান মেইনার এসওএস শিশুপল্লি প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ঘরহারা শিশুদের জন্যই প্রথম এ উদ্যোগ ছিল। বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে তখনকার শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকাসহ বর্তমানে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও সিলেটে ছয়টি শিশুপল্লিসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলছে।

শ্যামলীর শিশুপল্লিতে তিনটি পাড়ায় মায়ের অধীনে যে বাড়িগুলো আছে, তার নাম হচ্ছে সোনালি, রুপালি, পুবালি, কাকলি, শ্যামলী, মমতা, সমতা, জনতা, একতা, সততা, দিশারি, রূপসী, মায়াবী, জোনাকি ও সন্ধানী। বাড়িগুলো টেলিভিশন, ফ্রিজ, আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। মা ঠিক করেন, কোন সন্তানের জামা কিনতে হবে বা কোন সন্তানের জুতা প্রয়োজন। আর এই মায়েদের মুখে শুধু সন্তানদের প্রশংসা। কার ছেলে বা মেয়ে সমাজে কত প্রতিষ্ঠিত, তা বলছিলেন।

মমতাপাড়ার ঝুমা কোরাইয়া, দিশারিপাড়ার লতিকা রানী মণ্ডল, শিরিনা বেগমসহ একাধিক মায়ের সঙ্গে কথা হলো। শুক্রবার, বন্ধের দিন এই মায়েদের ব্যস্ততা বেড়েছে। ছেলেমেয়েদের স্কুলের ড্রেস ধোয়া, তাদের বায়না অনুযায়ী একটু ভালো খাবার রান্না করাসহ দম ফেলার ফুরসত নেই।

এসওএস পল্লিতে এক পেশাদার মায়ের সঙ্গে শিশুরা। ছবি: প্রথম আলোএসওএস পল্লিতে এক পেশাদার মায়ের সঙ্গে শিশুরা। ছবি: প্রথম আলো

শিরিনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি পেশাদার মা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। কিন্তু কখন যে সত্যিকার মা হয়ে গেছি, তা নিজেও জানি না। এই সন্তানদের বায়না মেটাতে মেটাতে ভুলেই যাই বাড়িতে আমার নিজের একটি ছেলে আছে। এই ছেলেমেয়েরাও আমার দিকে খেয়াল রাখে। মন খারাপ হলে আদর করে।’ এই মায়ের চার মেয়ে ও চার ছেলে। সবার ছোটটার বয়স পাঁচ বছর। সে এসেছিল মাত্র তিন মাস বয়সে।

দুপুরে খাবার টেবিলে দেখা গেল, একবার এক ছেলের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তো আবার অন্য মেয়ের পাতের দিকে নজর দিচ্ছেন। এই মায়ের ঘরেই তাঁর ছবির বদলে আরেক মায়ের সঙ্গে বিভিন্ন ছেলেমেয়ের ছবি টাঙানো। শিরিনা বেগম জানালেন, তাঁর আগে এই মা এই পরিবারে ২৪ বছর দায়িত্ব পালন করে মারা যান। তাঁর ছেলেমেয়েরা যাঁরা বিভিন্ন জায়গায় আছেন, তাঁরা তো এই মাকেই দেখতে আসেন। তাই ছবিটি আর নামানো হয়নি।

কর্মজীবী, দুই সন্তানের মা নার্গিস বেগমের সঙ্গে দেখা হলো শিশুপল্লিতে। এক বছর বা দুই বছরের মাথায় তিনি পল্লিতে এসেছিলেন। এখানে থেকেই তাঁর বিয়ে হয়েছে। চাকরি বা ব্যক্তিগত জীবনে কোনো সমস্যা হলে বা দুই মেয়ে নিয়ে প্রায়ই বেড়াতে আসেন এখানে। তিনি তাঁর নিজের জীবনের ইতিহাস জানতে পেরেছিলেন এসএসসি পরীক্ষার পর। বিয়ের সময় ছেলেপক্ষকে সব জানিয়েই বিয়ে হয়েছে।

এসওএস শিশুপল্লির ন্যাশনাল অফিসের ডেপুটি ডিরেক্টর হোসাইন আসিফ খান চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, এখানে সাধারণত বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত নারীরা মা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আসেন। নিয়োগের পর তিন মাস চলে প্রশিক্ষণ। এরপর যত দিন কর্মক্ষম থাকেন, তত দিন মায়ের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মায়েরা প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং পেনশন বা অবসরভাতা পান। কোনো মায়ের যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকলে তিনি শিশুপল্লির ভেতরে ‘মাদারস রিটায়ার্ড হোম’-এ বিনা মূল্যে থাকতে পারেন।

শ্যামলীর এসওএস শিশুপল্লির পরিচালক এ কে এম আজিজুর রহমান বলেন, পরিবারের শিশু সদস্যরা বড় হলে মেধা অনুযায়ী যত দূর পড়তে চায়, যেখানে পড়তে চায়, সে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বিদেশের ব্যক্তি ও সংগঠনের সহায়তায় চলছে এখানকার বিভিন্ন কার্যক্রম। এই সহায়তা না পেলে বর্তমানে যাঁরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তাঁরাই জীবনের উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের দিকে যাত্রা করায় বিভিন্ন সহায়তার পরিমাণ কমে আসছে। তাই সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শ্যামলীতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই শিশুপল্লির উদ্বোধন করেছিলেন। সংস্থার চার দশক উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top