শ্রমিক শ্রেনীর অধিকার আজও প্রতিষ্টা হয়নি

photo-1523984638-1.jpg

ছৈয়দ আলম :
আজ পহেলা মে ২০১৮। মহান মে দিবস। শ্রমিক সংহতি দিবস। এই দিন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। পৃথিবীর শ্রমরাজ্যের ইতিহাস অতি ভয়াবহ ও অমানবিক। এই রাজ্যে প্রতিনিয়ত চলছে শ্রমিকদের প্রতি মালিকের শোষণ। চাকুরী আজ আছে তো কাল নেই। কিছু বলতে গেলেই ছাঁটাই কিংবা বিভিন্ন হুমকি-ধমকি। আইন না মেনেই শ্রমিকদের দিয়ে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিত্রার্থ করার লক্ষ্যে রাতারাতি টাকার পাহাড় গড়ে তোলার জন্য ৮ ঘণ্টা কাজের পরিবর্তে শ্রমিকদের ১২ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করানো হচ্ছে।
মূলত মালিকপক্ষ-শ্রমিক পক্ষের দেনা-পাওনা ও ন্যায়-অন্যায়ের দরকষাকষির প্রেক্ষাপট থেকেই যুগে যুগে উৎপত্তি হয়েছে বহু যোগান্তকারী ঘটনার। বাংলাদেশে শ্রমিকদের দূরাবস্থার কথা নতুন করে আর কী বলার আছে? নানান সমস্যায় তাদের জীবন জর্জরিত। দিনের বেশির ভাগ সময়ই পরিশ্রম করে পেট ভরে খেতে পারে না তারা। এমনকি মাথা রাখার ঠাঁইটুকুও নাই অনেকের। সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে শিশুশ্রমও। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা সে বয়সে তারা দরিদ্র পরিবারের ব্যয়ভার পরিচালনা করার জন্য লেখা-পড়া বাদ দিয়ে জীবিকা নির্বাহে জড়িয়ে পড়ছে এবং মালিকপক্ষ তাদের অত্যন্ত স্বল্প পারিশ্রমিক দিয়ে বিভিন্নভাবে ঠকাচ্ছে।
একদিন সুদিন আসবেই, এমন চিন্তা চেতনায় পুনরায় শক্তি সঞ্চার করে মে দিবসের এইদিনে প্রগাঢ় মনোবল ও প্রত্যাশা নিয়ে পৃথিবীর তাবৎ শ্রমিক এ দিবস উদযাপন করে। মনিবদের শোষণ-নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে একদিন মুক্তি মিলবেই এমনটি আশা তাদের।
নানা উত্থান-পতন, নিপীড়ন-লাঞ্ছনা ও জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শ্রমিক আন্দোলন আজ এক বিশেষ লগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। শ্রমের ন্যায্য মজুরী থেকে বঞ্ছিত করে, তাদের শ্রম শোষণ করে মালিকরা বিরাট অর্থের পাহাড় গড়ে তোলে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করে। পরিণামে শ্রমিকদের কপালে জোটে অসীম দুঃখ, কষ্ট ও বেদনা। তারা অনাহারে ধুঁকে-ধুঁকে মরতে পারে, অথচ ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পিছু হটে। এটাই হচ্ছে তাদের একমাত্র দুর্বলদিক।
দিনটি ছিলো ১লা মে ১৮৮৬ সাল। পুরো বিশ্বজুড়ে চলছে কঠোর ধর্মঘট। সেদিন ছিল শনিবার, কাজের দিন। অথচ কাজ বন্ধ! সকাল থেকেই সবখানেই চলছে অবিরাম ধর্মঘট। চতুর্দিকে নেই কোন মানুষের কোলাহল ; এই যেন মনে হচ্ছে ছুটির আমেজ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শ্রমিক জনতাদের ভিড় লক্ষণীয় ছিল অতিমাত্রায়। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে-ধর্মঘট কিংবা মিছিলে অংশগ্রহণ করা। শ্রমিকদের জন্য এই মিছিল হচ্ছে জীবন-মরণের মিছিল। রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েন দাবি আদায়ে অনড় থাকা শ্রমিকরা। তখন বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেয়। বিক্ষোভকালে পুলিশের গুলিতে ১৬ শ্রমিক দফায় দফায় ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। এ ঘটনায় সারা বিশ্বে শ্রমিকরা তীব্র নিন্দা জানাতে থাকে। অবস্থার বেগতিক দেখে শেষমেশ যুক্তরাষ্টের সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী মেনে নেয়।
বলতে গেলে-মৃত্যু শ্রমিকজাতির দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রামের পথকে বেগবান করেছে। এনেছে শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ভিত্তি। এনেছে সংগ্রামী চিন্তা-চেতনায় আন্দোলিত ভাব। তার ফলপ্রসূ আজকের এই শ্রমিক সংহতি দিবস। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই এখন মর্যাদার সাথে পালিত হয় এই দিবস। স্মরণ করা হয় এই সফল দিনটিতে সেইসব শ্রমিকদের মহান আত্মত্যাগের কথা।
এখনো বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হচ্ছে। এখনো অনেক শ্রমিককে মজুরির চেয়েও বেশি খাটুনি দিতে হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক শ্রমিককে কর্মক্ষেত্রে ১২ ঘন্টারও বেশি পরিশ্রম করানো হচ্ছে। যা আইনের পরিপন্থী। মজুরির ক্ষেত্রেও চলছে মালিকের জুলুমনীতি। ঈদ পার্বণে বোনাস দেওয়ার নিয়ম থাকলেও মালিকপক্ষ তা কিছুতেই মানছে না। তাছাড়া কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় চলে শ্রমিকদের উপর বঞ্চনা শোষণ-নির্যাতন। কথায় কথায় কর্মচারী ছাঁটাই নীতি বদলাতে হবে। খেটে খাওয়া মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের যথার্থ শ্রমের মর্যাদা কি আমরা পাব না? আর কতদিন অপেক্ষার প্রহর গুণতে হবে শ্রমিকদের?
এদিকে প্রতিবছরের তুলনায় কক্সবাজার জেলায় শ্রমিকরা জুলুমের শিকার হয়েছে বেশী। কোন না কোন স্থানে কর্ম এলাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে না খেয়ে কোন কাজ ছাড়াই জুলুম-শোষনের শিকার হচ্ছে। রাজনৈতিক কারনে অনেকের চাকরীও চলে যাচ্ছে। তার কারনে পরিবারের মধ্যে চরম হতাশা ও উপোষ এর মত হাহাকার পর্যন্ত নেমে আসছে। তার কোন খবর এক পরিমান পর্যন্ত কেউ কি নিছে?
অপরদিকে আজ মে দিবস উপলক্ষে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও পেশাজীবিরা যথাযত মর্যাদায় দিনটি পালন করতে বিভিন্ন কর্মসুচি গ্রহন করেছে। শ্রমিক কল্যান ফেডারেশন কক্সবাজার শহর শাখার সেক্রেটারী এমইউ বাহাদুর জানান, যুগ যুগ ধরে এখনো সময় অতিবাহিত হলেও শ্রমজীবিদের কোন অধিকার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বরাবরের মত অধিকার হারা ও শোষনের শিকার হয় সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিকরা। জাতীয় শ্রমিকলীগ কক্সবাজার জেলা সাধারণ সম্পাদক শফি উল্লাহ আনসারী জানান, আমরা শ্রমিকদের ন্যায্য মুল্য আদায় করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে যাব। শ্রমিকদের কল্যানে সবসময় মাঠে ময়দানে কাজ করে যাব। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনসহ সর্বস্তরের শ্রমিকদের মুল্যায়ন হচ্ছেনা বলে তিনি আরো বলেন, সরকার ও মালিকপক্ষকে খেটে খাওয়া শ্রমিকদের পাশে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান। আজ মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে র‌্যালী, আলোচনা সভা অনষ্টিত হবে। শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের উদ্যোগে র‌্যালী ও শ্রমিকদের মাঝে খাবার পরিবেশ করা হবে। অপরদিকে জাতীয় শ্রমিকলীগ কক্সবাজার জেলার উদ্যোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন আগামি ১০ মে র‌্যালী শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এ কর্মসুচির কারনে জেলার সকল শ্রমিকরা কাজকর্ম থেকে বিরত থাকছে বলে জানা গেছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top