ভাগ্য বিড়ম্বনায় কক্সবাজারের জেলেরা

unnamed-2.jpg

আজিম নিহাদ :
গত চার দশক ধরে সাগরের সাথে যুদ্ধ করেই জীবন চলছে জেলে সুধাংশু জলদাসের (৫৫)। মাছ ধরলেই দু’মুঠো অন্ন জুটে। অন্যথায় মানবেতর জীবন চলে তাঁর। দীর্ঘ এই সময়ের সুধাংশু’র গল্পের কোন পরিবর্তন নেই।
ভাগ্য বিড়ম্বনায় সুধাংশুর মত কক্সবাজারের প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি জেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চললেও তাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়না।
জেলেদের কাছে শ্রম অধিকার বা মে দিবসের কোন মূল্য নেই। তারা এটাও জানেনা যে, মে দিবস কেন? শুধুই বুঝে ট্রলার যোগে সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা।
দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রমে পাওয়া মজুরিতে কোন রকম অভাব-অনটনে চলে জেলেদের সংসার। সাপ্তাহিক ছুটি, নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা, ন্যায্য মজুরী পাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্ন তাদের কাছে একেবারেই অবান্তর।
সুধাংশু জলদাসের বাড়ি কক্সবাজার শহরের জলদাস পাড়ায়। তাঁর দুই সন্তান। অর্থাভাবে কাউকেই তিনি পড়াশোনা করাতে পারেননি। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই সাগরে মাছ ধরে জীবন চলছে সুধাংশুর।
সুধাংশু জলদাস বলেন, সারা বছর জুড়ে সাগরে মাছ ধরতে হয়। যখন মাছ ধরা বন্ধ থাকে, তখন পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটে তাঁর। দুঃসময়ে তারা কোন ধরণের সহযোগিতা পান না বলে অভিযোগ করেন।
কালারাম জলদাস (৩৫) বলেন, সরকারিভাবে জেলেদের ভিজিএফ কার্ড বিতরণের কথা শোনা যায়। কিন্তু তিনি কোনদিনও পাননি। একারণে সাগরে মাছ ধরা বন্ধের সময় সংসার চালাতে ঋণগ্রস্ত হতে হয়। ওই ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে পথে বসতে হয় তাদের।
জেলে মো. সিরাজ মাঝি (৪০) বলেন, প্রতিবার সাগরে ৮ থেকে ১০ দিন অবস্থান করতে হয়। কূলে ফিরে মাছ বিক্রি করে যা টাকা পাওয়া যায় তা দুইভাগ হয়। একভাগ ট্রলারের মালিক পক্ষ, আরেক ভাগ জেলেরা পায়। এতে একজন জেলের ভাগে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা মিলে। অনেক সময় মাছ কম ধরা পড়লে খালী হাতে বাড়ি ফিরতে হয়।
জেলে মোহাম্মদ রফিক (৩২) বলেন, বর্ষা মৌসুমে জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ মাসে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। এছাড়াও ভাদ্র ও আশি^ন মাসে ২২ দিন সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই সময়ে সরকারিভাবে কোন ধরণের সহযোগিতা দেওয়া হয় না। এই সময় ধার দেনা করে চলতে হয় তাদের। সুদে জর্জরিত হয়ে জেলেদের জীবন আরও দুর্বিসহ হয়ে উঠে।
জেলে মোহাম্মদ রায়হান (২৭) বলেন, রোহিঙ্গারা সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ায় দেশীয় জেলেদের কদর কমে গেছে। কম টাকায় রোহিঙ্গা শ্রমিকদের পাওয়া যাওয়ায় ট্রলার মালিকেরাও রোহিঙ্গাদের নেয়। এতে করে জেলেদের কষ্টের শেষ থাকে না।
আরেক জেলে মো. সলিম উল্লাহ (৩৭) বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ডাকাতের কবলে পড়তে হয়। অনেক সময় জলদস্যূরা জেলেদের জীবনও কেড়ে নেয়। সাগরে ডাকাত রোধে প্রশাসনের কোন তৎপরতা দেখা যায় না।
অধিকার সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকা এবং শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবেই জেলেরা চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ শ্রমিক নেতাদের।
কক্সবাজার জেলে শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান উপদেষ্টা মিজানুর রহমান বাহাদুর বলেন, বাংলাদেশে শ্রম আইন হয়েছে। কিন্তু জেলে শ্রমিকদের এই আইনের আওতাভুক্ত করা হয়নি। তাদের বিষয়ে কোন নীতিমালাও হয়নি। শ্রমিকেরা যদি কোন সমস্যায় পড়ে, তাহলে অভিযোগ করারও জায়গা নেই। কারণ কক্সবাজারে শ্রম অধিদপ্তরের কোন শাখাও নেই। শ্রম আদালতও নেই। এতে করে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জেলেরা।
এদিকে শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হলে জেলেদের অধিকার কিছুটা হলেও সুরক্ষিত হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিভাগ।
কক্সবাজার সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মইন উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারে এখন পর্যন্ত নিবন্ধনের আওতায় এসেছে ৪৮ হাজার ৩৯৩ জন জেলে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে তখন সহজেই প্রকৃত জেলেদের সনাক্ত করা সহজ হবে। আর রোহিঙ্গারা সাগরে যেতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, সাগরে ২২ দিন সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার সময়ে জেলেদের ভিজিএফ এর আওতায় চাল বিতরণ করা হয়। গত দুই অর্থ বছরে চাল বিতরণ করা হয়েছে। ১০ হাজার ৫০ জন জেলে পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। তবে এটি পর্যাপ্ত নয়। আগামীতে সব জেলেকে বিতরণের চেষ্টা করা হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top