ঢাকার গণপরিবহনের বাসগুলো বেহাল, চলেও বেতাল

e42fb7766955034a8fd2c9778d36bade-5ae147c1d099b.jpg

এমনই এক ব্যস্ত সময় ছিল ১৭ এপ্রিল, বেলা একটা। এ সময় বাবুবাজারে কাভার্ড ভ্যানের মতো একটি বাহনে বেশ কিছু যাত্রীকে উঠতে দেখা গেল। কাছে যেতে দেখা গেল এটি কাভার্ড ভ্যান নয়, একটি বাস। রং কমলা। এর পেছনের অংশে কোনো বাতি নেই। বাসের রং কোথাও উঠে গেছে, কোথাও মরচে ধরা, অসংখ্য ফুটো, কোথাওবা পোস্টার সাঁটা। বাসের উইনশিল্ডের ওপর লেখা ‘যানজাবিল পরিবহন (প্রা) লিমিটেড’। পেছনের অংশের মতো সামনে দিকেও বাসের রং চটা, চারটির মধ্যে একটি হেডলাইট নেই। নেই কোনো দিকনির্দেশক বাতি। রুট হিসেবে লেখা—‘বাবুবাজার থেকে গাবতলী’। চলার পথে আটটি স্থানে থামার কথা লেখা আছে যানজাবিলের। রং চটা লক্কড়ঝক্কড় বাসটি ১৯ কিলোমিটার চলার পথে থেমেছে অর্ধশতবার। এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে গাবতলী আসে বিকেল চারটার দিকে।

ভাঙা কাচ নিয়েই চলছে বাসের যাত্রা। গুলিস্তান, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালামভাঙা কাচ নিয়েই চলছে বাসের যাত্রা। গুলিস্তান, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালাম

গাবতলীতে যাত্রীদের নামার পর কথা হয় যানজাবিলের চালকের সঙ্গে। শতাধিক যাত্রী বহনকারী বাসচালকের নাম লিটন। বয়স আনুমানিক ১৫ বছর। ভাঙা বাস, তার ওপর রং উঠে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে লিটনের উত্তর, ‘এই বাস চালাইতে ভয় লাগে না। রং উঠছে রুটের অন্য গাড়ির লগে ধাক্কা লাইগা। তয় মালিকেই রং ঠিক কইরা দেয়। আমাগো কিছু না।’ বলে হাসতে হাসতে আমিনবাজারের দিকে যানজাবিলকে নিয়ে চলে যায় চালক লিটন।

যানজাবিল যখন ঘুরছিল, পাশেই পুলিশ ফাঁড়ির সামনে থেমে ছিল বসুমতী ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড নামে একটি মিনিবাস। এ/২৭ নম্বর রুটের এই বাস চলাচল করে গাবতলী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত। বসুমতীর রং নীল। এর সঙ্গে সাদা-বাদামি রঙের নকশা। কিন্তু বাসটির ওপর হাত দিতে নীল রং উঠে আসে। রং উঠে আসে কেন? জানতে চাইলে বাসের দুই কর্মচারী বলেন, ‘আমাগো বাসটা এমনই। চলনের সময় ট্যাপ খায়। তখন মালিক ঠিক কইর‍্যা দেয়। মালিক এক বছর চারবার রং কইরা দেয়।’

ট্রাফিক সার্জেন্টের নির্দেশ অমান্য
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মাজার রোডে দুজন সার্জেন্টের নেতৃত্বে যানবাহনের লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ পরীক্ষা করছিল ট্রাফিক বিভাগ। দারুস সালামের দিকে যাওয়ার সময় অছিম পরিবহনের একটি বাস থামানোর চেষ্টা করেন এক সার্জেন্ট। বাসটি চলাচল করে আমিনবাজার থেকে মিরপুর, কাকলী, নতুন বাজার হয়ে ডেমরা পর্যন্ত। সার্জেন্ট বাসের সামনে যাওয়ার পরও চালক ঘুরিয়ে দ্রুত চালিয়ে যেতে থাকেন। তবে ট্রাফিক সদস্য বাসটি আটকালে চালক হাতজোড় করে ক্ষমা চান। কাছে গিয়ে দেখা যায়, ‘অছিম পরিবহন’, স্টপেজসহ সব লেখা, রং মুছে গেছে। এর সঙ্গে রং চটা, দিকনির্দেশক বাতি নেই, ব্যাক লাইট ভাঙা তো আছেই। তবে বাস থেকে বের হয়ে হাসিমুখে কথা বলতে থাকেন চালক মো. সুমন। বাসের করুণ দশার কারণ জিজ্ঞেস করতে তিনি বলেন, ‘আমার বাসের বয়স দুই বছর। তয় পারাপারি কইরা চলতে হয়। অন্য বাসে ধাক্কা মারে। হুড়োহুড়িতে রং ঠিক থাকে না। মালিকে জরিমানা করে। তয় রং করে না।’ সার্জেন্ট পরীক্ষা করে দেখেন, অছিম পরিবহনের এই বাসের ফিটনেস সনদের মেয়াদ রয়েছে ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।

বাসের গায়ের রং নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অবস্থা রাজধানীর বেশির ভাগ বাসের। গুলিস্তান, ঢাকা, সাম্প্রতিক ছবি। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশবাসের গায়ের রং নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অবস্থা রাজধানীর বেশির ভাগ বাসের। গুলিস্তান, ঢাকা, সাম্প্রতিক ছবি। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

একই জায়গায় থামানো হয় যাত্রাবাড়ী থেকে গাবতলীর ৮ নম্বর রুটের একটি যাত্রীবাহী বাস। সাদার ওপর লাল, হলুদ, সবুজ, নীল রঙের নকশা। কিন্তু দুপাশে রং অন্য বাসের সঙ্গে ঘষা লেগে উঠে গেছে। তাই স্টপেজগুলোর নাম অস্পষ্ট। বাসচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘অন্য গাড়ির লগে চাপ লাগে। চাপ লাইগ্গা রং উইট্টা যায়।’

সবচেয়ে করুণ অবস্থা দেখা মেলে রবরব পরিবহনের একটি বাসের। এদের বাসগুলো গাবতলী থেকে মিরপুর, কালশী, মাটিকাটা হয়ে রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশান ঘুরে যায় নতুন বাজার পর্যন্ত। অথচ রবরবের যে বাসটি থামানো হলো, এর ছিল না ডিজিটাল নম্বর প্লেট; কাচ, জানালা ভাঙা, রং চটা। ব্যাক লাইট নেই। ফিটনেস সনদ ছাড়াই দিব্যি চলাচল করছে রাজপথে। এ কারণে বাসটিকে মামলা দিয়ে জরিমানা করা হয়।

কেবল বেসরকারি বাস নয়, রাজধানীতে বিআরটিসির বাসকে রং চটা অবস্থায় চলাচল করতে দেখা যায় হরহামেশা। প্রতিযোগিতা না করলেও এর ধকলের শিকার হতে হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বাসগুলোকে।

ঢাকার সড়কে নির্বিঘ্নে চলছে এমন রং চটা, ভাঙা বাস। মোহাম্মদপুর, ঢাকা, সাম্প্রতিক ছবি। ছবি: জাহিদুল করিমঢাকার সড়কে নির্বিঘ্নে চলছে এমন রং চটা, ভাঙা বাস। মোহাম্মদপুর, ঢাকা, সাম্প্রতিক ছবি। ছবি: জাহিদুল করিম

মালিকের ইচ্ছায় বাসের রং
বাসের রং বাছাইয়ের কাজটি মালিকপক্ষ ইচ্ছেমতো করে। সরকারের নীতিমালা না থাকায় এই সুযোগ নিয়ে থাকে তারা। দুই দশক আগেও রাজধানী ঢাকায় রুট অনুযায়ী গণপরিবহনের জন্য সুনির্দিষ্ট রং নির্ধারণ করত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংস্থাটির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বাসের রং উঠে গেলে সেটি চলাচলের অনুপযোগী হবে। বিআরটিএর সেই সার্কুলার পরবর্তী সময়ে নতুন করে জারি করা হয়নি। রাজধানীর ১৮০টি রুটে চলাচলকারী সাড়ে চার হাজার বাসের অধিকাংশই এখন রং চটা অবস্থায় চলছে।

ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিআরটিএ থেকে রং চটা বাসগুলোকে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়। এ কারণে আটকেও জরিমানা করা যায় না। আর জরিমানা করলেও বাসমালিক ও শ্রমিকেরা একজোট হয়ে আন্দোলন করেন, বাসসংখ্যা কমিয়ে দেন। তখন যাত্রীরা উল্টো ট্রাফিক বিভাগের ওপর চড়াও হয়।

রং করানোর নিয়মও অমান্য
চলাচলে যেমন হরহামেশা নিয়ম ভঙ্গ করেন চালকেরা, তেমন রং চটে যাওয়ার পরও নিয়ম মানা হয় না। এ বিষয়ে বিআরটিএর সাবেক এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ছয় মাস পরপর একটি বাসের রং করানোর নিয়ম। তবে কী ধরনের রং করতে হবে, সে বিষয়ে নিয়ম নেই। মালিকেরা সাধারণত বছরে একবার বাসের ফিটনেস পরীক্ষা করানোর আগে রং করিয়ে আনেন। রং চটার কারণে বাসকে জরিমানা করা হয় না। এর সঙ্গে ইঞ্জিনের সক্ষমতা, বাতি ভাঙাসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে জরিমানার হার নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। নির্ধারিত রঙে বাস চলার সুপারিশ করা হলেও সেটি এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

রং নির্ধারিত না থাকায় বাসযাত্রীদের চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়, এ মন্তব্য করেন ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মশিউর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রুট নম্বর অনুযায়ী বাসের রং করা হলে সুবিধা আছে। কোনো বাসে দুর্ঘটনা ঘটালে সেটিকে দ্রুত ধরা যায়। পরিবহন মালিক সমিতি নিজেদের উদ্যোগে বাসের রং করাতে পারে। এর ফলে দুর্ঘটনা কমবে, আবার কম লেখাপড়া জানা যাত্রীরাও নির্দিষ্ট বাসে যাতায়াত করতে পারবেন।

শ্রীহীন বাসের সামনের অংশ। মতিঝিল, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালামশ্রীহীন বাসের সামনের অংশ। মতিঝিল, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালাম 

অসম প্রতিযোগিতায় রং চটে, প্রাণ যায় যাত্রীদের
বাসের রং চটা বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার কারণে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরে দুর্ঘটনার হার বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জরিমানা না হাওয়ায় বেপরোয়া গতিতে বাসচালকেরা প্রতিযোগিতা করে রাস্তায় বাস চালাচ্ছেন। এর শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউবা চিরকালের মতো পঙ্গু হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা অনেকেই বলছেন, বাস কোম্পানিগুলোর মালিকপক্ষের নিয়মনীতি না থাকাতেই এই প্রাণঘাতী প্রতিযোগিতা।

মোহাম্মদপুর থেকে আবদুল্লাহপুর রুটের তেঁতুলিয়া পরিবহনের একজন বাসমালিক বলেন, বাস কোম্পানির মালিকেরা বাসের রং নির্ধারণ করেন। তবে রং ঘষায় উঠে গেল, না বাসের বডি বেঁকে গেল, এতে তেঁতুলিয়া পরিবহন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ মাসুমের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাঁরা কেবল লাভের হিসাব করেন।

তেঁতুলিয়া পরিবহন কোম্পানি লিমিটেডে ১২০টির বেশি বাস রয়েছে। এর অধিকাংশ বাসের রং চটা। মরিচা পড়া তো রয়েছেই। ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রতিদিন একটি বাস চলানোর জন্য ৭৫০ টাকা দিতে হয়। ওয়ে বিলের জন্য আরও ২০ টাকা তাঁর এক আত্মীয়কে দিতে হয়। সব মিলিয়ে একটি বাসের জন্য প্রতিদিন ৭৭০ টাকা। এই টাকা ওঠাতে গিয়ে অধিকাংশ বাসমালিক তাঁর চালককে দৈনিক ২ হাজার ৫০০ টাকা চুক্তিতে দিয়ে দেন। রাস্তায় নেমে বেশি করে ট্রিপ ও যাত্রী তুলতে গিয়ে অসম প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন চালকেরা। এই প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে গিয়ে বাসের রং চটে গেলেও কিছু করার নেই। কারণ, মালিকেরা চালক ও বাস কোম্পানির পরিচালকদের কাছে জিম্মি।

এ ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য তেঁতুলিয়া পরিবহনের এমডি আবদুল ওয়াদুদ মাসুমের মুঠোফোনের একাধিক নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। একইভাবে বন্ধ ছিল আজিমপুর থেকে গাজীপুর রুটে চলা বিকাশ পরিবহনের এমডি মো. সোহরাবসহ বেশ কয়েকটি বাস কোম্পানির পরিচালকের নম্বর।

ক্লান্ত চালক, যানজটে বিশ্রামের চেষ্টায়। গুলিস্তান, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালামক্লান্ত চালক, যানজটে বিশ্রামের চেষ্টায়। গুলিস্তান, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালাম
বাসচালকেরা বেশি লাভের আশায় মালিকদের কাছ থেকে বাস ভাড়া নিচ্ছেন বলে জানান ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তিনি বলেন, বেশি লাভের আশায় রাস্তায় চালকেরা তাড়াহুড়ো করে থাকেন। এ কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। আর কম বয়সী অদক্ষ চালকেরাও বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন।

বাসচালকদের কাছে মালিকেরা যাতে এভাবে বাস ভাড়া না দিতে পারেন, সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।
উদ্যোগেই সমাধান
গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনায় সুযোগ নেন বাসমালিক, চালক ও শ্রমিকেরা। এ কারণে জিম্মি হয় জনসাধারণ। কারণ, তাদের কাছে বাসে চলাচল করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক (এআরআই) ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। তিনি বলেন, ‘আমি চালকদের দোষ দেব না। দোষ দেব তাঁদের, যাঁরা বাস রুটের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার রেসিপি তাঁরাই তৈরি করে দিচ্ছেন।’

এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে বের হওয়ার উপায় রয়েছে বলে জানান অধ্যাপক সামছুল হক। তিনি বলেন, গুলশানে এখন ঢাকা চাকা নামে একটি প্রতিষ্ঠান বাস চালাচ্ছে। সেখানে তো যাত্রীরা নিয়ম মেনে বাসে চড়ছেন! ঢাকা চাকার বাসগুলোয় তো আঁচড় পড়ছে না, দুর্ঘটনাও ঘটছে না। গুলশানে এটি সম্ভব হলে রাজধানী ঢাকায় বাকি অংশে কেন অসম্ভব হবে। আসলে প্রয়োজন উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগ ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক নিয়েছিলেন।
রং উঠে গেলে একটি বাস অনুপযোগী হয়ে পড়ে বলে জানান বিআরটিএর পরিচালক (অপারেশন) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘আগের একটি নিয়ম ছিল যে রুটভিত্তিতে বাসের রং হবে। এখন সেটি নেই। রং ছাড়া বাস চালানোই নিষেধ। আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিক বৈঠকও করেছি। বিদেশে কোথাও এ ধরনের বাস চলে না, সেটিও তাদের জানিয়েছি। কোম্পানির মালিকেরা আশ্বাস দেন। কিন্তু বাস্তবায়ন করেন না।’

শ্রীহীন বাসের ভেতরটাও। আগারগাঁও, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: কমল জোহা খানশ্রীহীন বাসের ভেতরটাও। আগারগাঁও, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: কমল জোহা 

বাইরের মতো ভেতরটাও বিশ্রী  গতকাল বুধবার বিকেলের দৃশ্য।
‘ওস্তাদ, লোক তুইলেন না। গরমে মইর‍্যা যাইতাছি। জায়গা নাই…’—কিছুক্ষণ পরপর চিৎকার করে বাবু নামের চালকের উদ্দেশে কথাটি বলছিলেন এক যাত্রী। বিহঙ্গ পরিবহনের এই চালককে রাজধানীর পল্লবী থেকে পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্ক পর্যন্ত পুরো সাড়ে তিন ঘণ্টা কমপক্ষে ১৫ বার এ কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু চালকের কোনো হেলদোল নেই। ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সময় ওই চালক তাকিয়ে ছিলেন কেবল বাঁ দিকে। পথের ধারে যাত্রী ওঠা-নামা আর ভাড়া আদায়েই ছিল তাঁর নজর। সহকারী মো. জাহাঙ্গীরকে নির্দেশও দিচ্ছিলেন বাবু।

দুই কিলোমিটারে অর্ধশতাধিক যাত্রী
পল্লবী বাসস্ট্যান্ড থেকে গতকাল বেলা একটায় যাত্রা শুরু করে বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটি। মেট্রোরেলের কাজ চলার কারণে এক লেনে চলছিল বাস। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে তখন খুব একটা যানজট ছিল না। তবে ফাঁকা রাস্তায় চালকের স্টিয়ারিং ঘুরছিল ‘ধীরে চলো নীতিতে’। পল্লবী থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত প্রথম দুই কিলোমিটার পথে কমপক্ষে ১৫ বার ব্রেক কষেন তিনি। থামতে থামতে ৪৩ আসনের এই মিনিবাস যাত্রীতে ভরে যায়। গোলচত্বর আসতেই শুরু হয়ে যায় দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানোর হিড়িক। অতিরিক্ত প্রায় ২০ জনকে দাঁড় করিয়ে মোট ৬৩ জন যাত্রী নিয়ে ধীরলয়ে কাজীপাড়ায় আসে বিহঙ্গ। ঠেসে যাত্রী নিয়েও মুখে তৃপ্তির হাসি নেই বাসচালক ও তাঁর সহকারীর। তিনজন নেমে গেলেও আরও ছয় যাত্রী ওঠেন। বিহঙ্গের চাকা ঘুরতে থাকে শেওড়াপাড়া দিকে। আধা কিলোমিটারের কম দূরত্বে এখানে আরও দুই দফা থমকে দাঁড়ায়। শেওড়াপাড়া থেকে ওঠেন চার যাত্রী। প্রায় ৭০ যাত্রী নিয়ে বিহঙ্গের ভেতরে তখন দমবন্ধ হওয়ার দশা। চালকের মাথার ওপর থাকা ফ্যানটি সজোরে বাতাস ছড়ালেও বাকি তিনটি ফ্যানের গতি নেই বললেই চলে।

পৌনে দুই ফুট জায়গায় দুই যাত্রী
গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ঘাম ঝরতে থাকে যাত্রীদের শরীর থেকে। টপটপ করে গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছে ফেলারও উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না দাঁড়ানো যাত্রীরা। তাই তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ জামা দিয়েই শুরু করেন ঘাম মুছে ফেলার কাজ। সিটে বসে থাকা যাত্রীরাও ছিলেন না স্বস্তিতে। কারণ, প্রতি দুজন যাত্রীর বসার জায়গা মাত্র পৌনে দুই ফুট। তাই হাত-পা গুটিয়ে কোনোক্রমে বসেছেন সিট পাওয়া ৪৩ যাত্রী। একটু পরপর মাথার ঘাম তাই সিটকভারে মুছতে হচ্ছিল তাঁদের।

তবে প্রতি আঁটসাঁট সিটের কভারগুলো দুর্গন্ধময়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। বেশ কিছু সিটের পেছনের অংশ বাঁকা। বসার জায়গা প্রায় ইটের মতো শক্ত। দীর্ঘ সময় বসে থাকায় যাত্রীদের হাত-পা অসাড় হয়ে আসে।

ইচ্ছে করেই সিগন্যালের ফাঁদ
বিহঙ্গ যখন চন্দ্রিমা উদ্যান পেরিয়ে যায়, সময় তখন বেলা দুইটা। তবে খামারবাড়ির সামনে ইস্পাহানি ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটালের সমানে আসার পর ধীরে চলতে থাকে বাসটি। ট্রাফিক বক্সের সামনে সিগন্যালে আটকে আরেক দফা যাত্রী তুলে ফেলা হয়। তবে ফার্মগেট পদচারী-সেতুর নিচে এসে ২০ জন যাত্রী নেমে যান। উঠে পড়েন আরও ১০ জন। ১০ জন যাত্রী কমায় কিছুটা স্বস্তি আসে বাসের ভেতর। কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে আধা ঘণ্টা আটকে থাকে বাসটি। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে গ্রিন সিগন্যাল এলেও বাসচালক বাবুর কাছে যেন তা রেড সিগন্যাল! মিনিট পাঁচেক আরও অপেক্ষা। ক্ষোভে যাত্রীরা উত্তাল। তাতে চালক বাবুও বেশ ক্ষিপ্ত। মেজাজি কণ্ঠে এক যাত্রীকে তিনি বলেন, ‘গলা উঁচাইয়া কথা কইয়েন না। আপনি আইয়া গাড়ি চালান।’

সিগারেট ফুঁকছেন বাসের চালক, বাসের ভেতরেই। মতিঝিল, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালামসিগারেট ফুঁকছেন বাসের চালক, বাসের ভেতরেই। মতিঝিল, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালাম

বাসে চলে চালকের আয়েশি ধূমপান
শাহবাগ পেরিয়ে শিশুপার্ক। আবারও যানজট, আবারও সিগন্যাল। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিহঙ্গ আসে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সামনে। পাশে থাকা রমনা পার্কের গাছের ছায়া বাসের ওপর পড়ায় নেমে পড়েন বাসচালকের সহকারী জাহাঙ্গীর। দেশলাইয়ের কাঠি ঠুকে আগুন ধরিয়ে দেন সিগারেটে। প্রথমে নিজে দু-তিনটি সুখটান দিলেন। এরপর জানালা দিয়ে বাবুর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট ধরিয়ে দেন জাহাঙ্গীর। চলে পাঁচ মিনিটের ধূমপান পর্ব। ধোঁয়া ঢুকে যায় বাসের ভেতর। চালক নির্বিকার। ঘেমে-নেয়ে প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে যাত্রীরাও থাকেন নিশ্চুপ।

অবশেষে বিকেল চারটায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার গতি নিয়ে বিহঙ্গ চলে আসে পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্কে। যদিও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রুট পারমিটে বিহঙ্গের শেষ গন্তব্য সদরঘাট।

দিনের খরচ ছয় হাজার টাকা
ধীরগতিতে বাস চালিয়ে অবিরাম যাত্রী তোলা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই বিহঙ্গের মতো রাজধানীতে চলাচলকারী বাসগুলোর। বিহঙ্গ পরিবহনের বাসচালকের সহকারী জাহাঙ্গীর বলেন, প্রতিদিন মালিকের কাছে জমা দিতে হয় চার হাজার টাকা। বেতনসহ অন্যান্য খরচ আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। এরপর জ্বালানি খরচ রয়েছে।

সব বাসেরই করুণ হাল
সদরঘাট থেকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন রুটে একাধিক পরিবহন সংস্থার বাস যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এর মধ্যে মিরপুরের পল্লবীতে চলাচল করে ইউনাইটেড এবং মিরপুর-১ নম্বরে চলাচল করে তানজিল। সাভারে চলে স্বজন। টঙ্গীর আবদুল্লাহপুরে চলে সুপ্রভাত ও ভিক্টর পরিবহন। এগুলোর মধ্যে স্বজন পরিবহনের বাসগুলো তুলনামূলক ভালো। অন্যান্য কোম্পানির বাসগুলোর দশা বিহঙ্গের মতো করুণ। এদের বেহিসেবি ও অসম প্রতিযোগিতায় কাতর যাত্রীরা।

যাত্রীর সাক্ষাৎ বিপদ হয়ে আছে জানালার ভাঙা কাচ।   গুলিস্তান, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালামযাত্রীর সাক্ষাৎ বিপদ হয়ে আছে জানালার ভাঙা কাচ। গুলিস্তান, ঢাকা, ২৫ এপ্রিল। ছবি: আবদুস সালাম

মাদকের সঙ্গে চালক
দিনদুপুরে ধূমপান। আর রাতের বেলা মাদকসেবন। এভাবে চলতে অভ্যস্ত দূরপাল্লা-স্বল্পপাল্লার বাসচালক ও শ্রমিকেরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সঠিক সংখ্যা না থাকলেও যানবাহন চালক-শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নেশাগ্রস্ত। দূরপাল্লার চালকেরা একসময় মদ্যপান করতেন। ফেনসিডিল আসার পর সেদিকে ঝুঁকে পড়লেন তাঁরা। অনেকে ইয়াবাও সেবন করেন। তবে রাজধানী বা শহরে বাসশ্রমিকদের মধ্যে একটি বড় অংশের পছন্দ গাঁজা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খোরশিদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, যানবাহনের চালকদের সচেতনতার জন্য ২০১৬ সালে একটি কর্মশালার আয়োজন করে তাদের প্রতিষ্ঠান। মিরপুরে বিআরটিএর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই কর্মশালায় পরিবহনের ৩০০ চালক অংশ নেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top