সেলেসাওদের আরো একটি বিশ্বকাপ চ্যালেঞ্জ

31093413_1823165784413290_2042627896983420928_n-7.jpg

* বিশ্বকাপ ফুটবলের গত ২০ আসরে ইউরোপীয় দেশের শিরোপা জয় ১১ বার, ৯ বারই ট্রফি জিতেছে লাতিন আমেরিকার দেশ।
* ২০০২’র পর বিশ্বকাপের গত তিন আসরেই চ্যাম্পিয়ন ইউরোপীয় দেশ।
* ১৯৫৮’র পর, ব্রাজিলের পর আর কোন লাতিন আমেরিকার দল ইউরোপ থেকে বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে পারেনি।
* ২০১৪’র আসরেই লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল থেকে বিশ্বকাপ জিতেছে ইউরোপের জার্মানি।

এই তথ্য পরিসংখ্যানের পুনরাবৃত্তিতে বিশ্বাস করলে রাশিয়ায় এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে অংশ নিতে রাজি হওয়ার কথা নয় কোন অ-ইউরোপীয় দেশের! তবে রেকর্ড আর পরিসংখ্যানই তো সব নয়। মাঠের পারফরম্যান্সেই জন্ম দেয় নতুন কীর্তি আর রেকর্ডের। যেমন পরিস্থিতি প্রতিকূল আর কঠিন চ্যালেঞ্জের জেনেও রাশিয়াগামী উড়োজাহাজে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে এবারও উঠবে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা।

১৮১২ সালে ফরাসী বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও ১৯৪১ সালে জার্মান একনায়ক এডলফ হিটলারের রাশিয়া জয়ের অভিযান ‘অপারেশন বারবোসা’ ব্যর্থ হলেও বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের চোয়ালচাপা প্রতিজ্ঞা নিয়ে ভলগা তীরে বরফের দেশে হাজির হবেন লিওনেল মেসি, নেইমার’রা।

পাঁচবারের কাপ জয়ী ও দুইবারের ফাইনালিস্ট ব্রাজিলের জন্য এবারের বিশ্বকাপ ২০১৪’র জার্মানির কাছে ‘সেভেন আপ’ দুঃস্বপ্ন ভোলার সেরা দাওয়াই। বেলো হরিজন্তের চোখের নোনা জলে ভেসে যাওয়া সেই ম্যাচের চার বছরের মাথায় ব্রাজিলীয়দের আবার কোমর সোজা করে উঠে দাঁড়ানো রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে। ফিফা র‌্যাঙ্কিং’য়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির পর দ্বিতীয় স্থানে পেলে’র দেশ ব্রাজিল।

২০০২ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল

বিশ্বকাপ পূর্ব বাজির বাজারেও জার্মানির পর দুই নম্বরে (৬:১ অনুপাত) সেলেসাও’রা। বিশ্বকাপের গত ২০ আসরেই খেলেছে ব্রাজিল, প্রতিবারই প্রাক-টুর্নামেন্ট জরিপে ফেভারিট তারা। সাম্বার রাজাদের ফেভারিটের তালিকায় এগিয়ে থাকা এখন আর চাঞ্চল্য জাগায় না। তবে ব্রাজিলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে একজনের অবদান ছাপিয়ে গেছে সবকিছুকে। তিনি অধিনায়ক নেইমার নন। ৫৬ বছর বয়সী এক স্বপ্নবাজ ফুটবল সেনাপতি আদেনর লিওনার্দো বাচ্চি। ব্রাজিলীয়রা আদর করে ডাকে চিচ্চি। তবে সারা দুনিয়া তাকে চেনে তিতে নামে।

কোচ হিসাবে তিতেকে অনেকেই পেপ গার্দিওলা কিংবা হোসে মরিনহোর সমপর্যায়ের মনে করেন। দারুণ হাই-প্রোফাইল এই কোচ করিন্থিয়ান্স ক্লাব’কে দুইবার করে জিতিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা লিবার্তেদোরেস ট্রফি, ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল খেলেছে একবার।

ইউরোপের ফুটবল কোচিং নিয়েও তার রয়েছে সমৃদ্ধ জ্ঞান। ব্রাজিলের দায়িত্ব নেয়ার আগে ইউরোপের ফুটবলের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও ট্যাকটিক্স সম্পর্কে ধারণা নিতে তিতে ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালের কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের সঙ্গে কিছুদিন কাজ করেছেন। স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে এ সময়ের দুই তুখোড় কোচ জিনেদিন জিদান ও কার্লোস আনচেলত্তি’র সঙ্গে ফুটবলের ট্যাকটিক্স নিয়ে প্র্যাকটিক্যাল ও থিউরেটিক্যাল কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, লাতিন আমেরিকান ছন্দময় চোখ জুড়ানো ফুটবল ‘যোগো-বোনিতোর’ সঙ্গে ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবলের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন তিতে। ফলে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেকবেশি সুগঠিত, সংহত। পাশাপাশি নেইমারের নেতৃত্বে আক্রমণে সৃজনশীলতা-কার্যকারিতা প্রমাণিত।

তারকা খচিত এবং ব্রাজিলের মতো সমর্থকদের প্রত্যাশার চাপে পিষ্ট দলে স্ট্র্যাটেজি ও ট্যাকটিক্সের চেয়ে ম্যান ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা যে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেটাও মাথায় রেখে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলছেন। তার সাফল্যও পাচ্ছেন। ২০১৬ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর ব্রাজিল এপর্যন্ত হারিয়েছে জার্মানি, আর্জেন্টিনা, চিলিসহ প্রায় সব ফুটবল পরাশক্তিকে। তার কোচিংয়ে ১৯ ম্যাচের ১৫টিতে জয়, ৩টিতে ড্র আর একটিতে হেরেছে ব্রাজিল। প্রথমবারের মতো জিতেছে অলিম্পিক ফুটবলের স্বর্ণপদক, ব্রাজিলের মাঠে সেই জার্মানিকে হারিয়েই।

ব্রাজিল বাছাইপর্বের টানা সাত ম্যাচ জিতে লাতিন আমেরিকা থেকে প্রথম দল হিসাবে পেয়েছে রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকিট। ‘তিতে জমানায়’ কয়েকযুগ ধরে চলা ‘ট্যাকটিক্স’ নিয়ে আত্মপরিচয়ের সংকট কাটিয়ে উঠেছে ব্রাজিল। ইউরোপীয়দের ‘অ্যালট্রা ডিফেন্সিভ রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড পাওয়ার ফুটবলের জবাব কি হতে পারে এ নিয়ে অনেক গবেষণা আর তার প্রয়োগ ঘটিয়ে ল্যাজারোনি, ডুঙ্গা কিংবা স্কলারির মতো ‘ফুটবল দার্শনিকরা’ ব্রাজিলের ফুটবলকে লেজেগোবরে অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই যান্ত্রিকতা আঁকড়ে ধরে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যও আসেনি, বরং যোগো বনিতোর হত্যাকারী হিসাবে দৃশ্যপট থেকে তাদের বিদায় নিতে হয়েছে।

তিতে যুগে সেলেসাও’রা অ্যালট্রা ডিফেন্সিভ পাওয়ার বেইজড নাকি রিদিমিক টিপিক্যাল অ্যাটাকিং ফুটবল খেলবে সেই দ্বিধা কেটে গেছে। তাই বলে ব্রাজিলীয়রা মারিও জাগালো কিংবা টেলে সান্টানার, রোমান্টিক আর অ্যাডভেঞ্চারিজম সর্বস্ব ফুটবল ঘরানায় ফিরে গেছে সেটাও ভাবার কারণ নেই। বরং তিতে জমানায় সেলেসাওরা দেখাচ্ছে আক্রমণ আর রক্ষণাত্মক অ্যাফেক্টিভ ফুটবলের অপূর্ব যুগলবন্দী।

তিতের ফুটবল কৌশল সম্পর্কে জুতসই মন্তব্যটি এসেছে ফিফা ডটকমের সাংবাদিকের লেখনী’তে, ‘হি ডিডনট কপিড, হি অ্যাডাপ্টেড’।

কি করতে যাচ্ছেন সেটা জানেন বলেই বিশ্বকাপ শুরু’র চার মাস আগেই ব্রাজিল বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৫ জন সদস্যের নাম ঘোষণা করেছেন তিতে। যদিও ফিফার বাইলজ অনুযায়ী উদ্বোধনী ম্যাচের দশদিন আগে ৪ জুনের মধ্যে সবক’টি দলকে তাদের ২৩ জনের স্কোয়াড ঘোষণা করার শেষ সময়সীমা।

১৮ জুন সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করার আগে ব্রাজিল ৩ জুন ক্রোয়েশিয়া, ১০ জুন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে। তারও আগে আগামী মাসে রাশিয়ার সোচি’তে শুরু হবে সেলেসাও’দের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির চূড়ান্ত শিবির। স্কোয়াডের ফুটবলাররা ক্লাব ফুটবলে ব্যস্ত সময় পার করলেও কোচ তিতে’র বিশ্বকাপ প্রস্তুতি থেমে নেই। প্রতিদিনই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ফুটবলারদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে ফুটবলারদের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ সারছেন, রাখছেন সর্বশেষ ফিটনেসের খবর।

১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল

অনেক ফুটবলবোদ্ধার ধারণা বিশ্বকাপ আসরে ৪-১-৪-১ ফর্মেশনে খেললে ব্রাজিলের সাফল্যের জন্য অন্তত দু’জনকে দিতে হবে সামর্থ্যের শেষবিন্দু। প্রথমজন অবশ্যই অধিনায়ক নেইমার, অন্যজন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের হোল্ডিং মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরো। ইনজুরি সাথে লড়াই শেষে মাঠে ফেরার অপেক্ষায় বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার নেইমার। সমসাময়িক দুই কিংবদন্তি রোনালদো ও মেসি’র বিশালত্বের ছায়ায় ঢাকা পড়তে রাজি নন নেইমার। এজন্যই বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজি’তে যাওয়া। এই স্বপ্ন পূরণের সেরা সুযোগ রাশিয়ার আসরে। যদি ব্রাজিলকে হেক্সা জেতাতে পারেন তাহলে পারবেন নিজেকে রোনালদো-মেসি’র সারিতে তুলতে।

তবে টারটাসল ইনজুরি কাটিয়ে কতটা স্বরূপে ফিরতে পারবেন নেইমার তার উত্তর ভবিষ্যতই বলতে পারবে। বড় আসরে নেইমারের ইনজুরিতে পড়ার নজীর এবং তার প্রতিক্রিয়ায় পুরো ব্রাজিল দলের মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হওয়ার ইতিহাস দেখা গেছে ২০১৪’র আসরের সেমিফাইনালে। রাশিয়ার বিশ্বকাপ আসরে নেইমারের এক জোড়া পায়ের উপর বর্বর আক্রমণের পরিকল্পনা যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের থাকবে এটা নিশ্চিত! সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজেকে মেলে ধরা সহজ কাজ নয়।

অন্যদিকে ক্যাসেমিরো’র চ্যালেঞ্জটা যতটা না ব্যক্তিকেন্দ্রিক তার চেয়ে বেশি ব্রাজিল দলকেন্দ্রিক। দানি আলভেজ, থিয়াগো সিলভা, মারকুইনোজ, মিরিন্ডা, অ্যালেক্স স্যান্দ্রো, ডগলাস কস্তা ও মার্সেলোদের মধ্য থেকে বেছে নেয়া প্রথম একাদশের চার ডিফেন্ডারের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে থার্ড সেন্টারব্যাকের ভূমিকায় খেলে সাফল্য পেতে হবে ক্যাসেমিরো’কে। আবার দল আক্রমণে উঠলে হোল্ডিং মিডফিল্ডারের ভূমিকার পাশাপাশি আক্রমণেও অংশ নিতে হবে তাকে। গত দু’মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এই ভূমিকাটা কমবেশি সাফল্যের সাথে পালন করছেন ২৬ বছর বয়সী ক্যাসেমিরো। ইউরোপের ক্লাব ফুটবল আর বিশ্বকাপ আসরের যে আকাশপাতাল তফাৎ সেটা ঘোচানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে রাশিয়া বিশ্বকাপে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top