বন্ধুদের ডেকে নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করলেন বাবা!

Presentation1-47.jpg

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দিল্লি: নিজের মেয়েকে ধর্ষকদের হাতে তুলে দিল বাবা। তার পর নিজেও যোগ দিল অপরাধে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সীতাপুরে এই জঘন্য ঘটনা বলে আনন্দ বাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে।

পুলিশের অ্যাডিশনাল সুপারিন্টেনডেন্ট মার্তণ্ডপ্রকাশ সিংহের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, ঘটনাটি গত ১৫ এপ্রিলের। পরের দিনই বছর পঁয়ত্রিশের মহিলা পুলিশে অভিযোগ জানান।

ঘটনাটি জানাজানি হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। অভিযুক্তদের মধ্যে এক জন ধরা পড়েছে। কিন্তু ওই নারীর বাবা ও আর এক অভিযুক্ত পলাতক।

পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘তরুণীর একটি ছেলে আছে। প্রায় বিশ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তার পর থেকে বাবার সঙ্গে থাকতেন।’

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার দিন, অর্থাৎ রবিবার মেয়েকে লখনউ থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে কমলাপুরের একটি মেলায় নিয়ে যায় অভিযুক্ত বছর পঞ্চাশের ব্যক্তি। সেখানে তার বন্ধু মান সিংহকে ডেকে নেয় সে। তারা তরুণীকে মোটরবাইকে উঠতে বলে। বাবার কথায় আপত্তি করেননি তিনি। তরুণীকে মোটরবাইকে চাপিয়ে আর এক অভিযুক্ত মিরাজের বাড়িতে নিয়ে যায় তারা। সেখানেই ১৮ ঘণ্টা ধরে চলে অত্যাচার-পর্ব। প্রথমে বাবার বন্ধুরা ধর্ষণ করে তাকে। তার পর বাবাও যোগ দেয়।

পরের দিন অর্থাৎ সোমবার সন্ধ্যায় মিরাজের বাড়ি থেকে কোনও মতে পালান তরুণী। বাড়ি ফিরে মাকে গোটা ঘটনা জানান তিনি। সোমবারই দুই মহিলা থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয় মিরাজকে। কিন্তু তরুণীর বাবা ও মান সিংহ পলাতক।

উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর ও হামিরপুরে আরও দু’টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দুই ক্ষেত্রেই নাবালিকা ধর্ষণ করা হয়েছে। সিদ্ধার্থনগরে একটি ছ’বছরের শিশুকে বিয়েবাড়িতে তার পড়শি যুবক ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ। হামিরপুরে চোদ্দো বছরের এক কিশোরীকে রাস্তার ধারে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে ধর্ষণ করে তিন যুবক। তিন জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।

আরো পড়ুন…
ভারতে কেন ধর্ষণ কমার লক্ষণ নেই
মেয়েটির বয়স নয় থেকে ১১ বছরের হবে। সম্প্রতি গুজরাটের সুরাট শহরের একটি খেলার মাঠের কাছে ঝোপের ভেতর তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরের ৮৬টি জখমের চিহ্ন ছিল।

যে চিকিৎসক ময়না তদন্ত করেছেন, তার ধারণা এক সপ্তাহ ধরে হয়তো নির্যাতন করা হয়েছে মেয়েটিকে। পুলিশেরও ধারনা মেয়েটিকে আটকে রেখে এভাবে নৃশংসভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।

কিন্তু মৃতদেহ পাওয়ার দশ দিন পরও মেয়েটির পরিচয় বের করতে পারেনি পুলিশ। গুজরাটের ৮০০০ নিখোঁজ শিশুর ফাইল ঘেঁটেও কোনো সুরাহা করতে পারেনি তারা।

দিল্লিতে বিবিসির সৌতিক বিশ্বাস বলছেন, ভারতে দুর্বলদের ওপর সবলদের কর্তৃত্ব ফলাতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। শ্রেণী-বৈষম্য এবং পুরুষ-শাসিত যে সমাজে হিংসা ছড়িয়ে ভোট পাওয়ার চেষ্টা আশঙ্কাজনক-ভাবে বাড়ছে, সেখানে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের ঘটনাকে স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখছেন অনেকেই।

মূলত মেয়ে ভ্রূণ হত্যার কারণে ভারতে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম। প্রতি ১০০ মেয়ে শিশুর জন্মের তুলনায় ১১২ টি ছেলে শিশু জন্ম নেয়। এ কারণে, স্বাভাবিকের চেয়ে নারীর সংখ্যা ভারতে প্রায় ছয় কোটি ৩০ লাখ কম।

পুরুষ ভর্তি দেশ
অনেকেই বিশ্বাস করেন, পুরুষের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেশি হওয়ার কারণে নারীর ওপর যৌন নির্যাতন বাড়ছে।

নারী ও পুরুষের সংখ্যার অনুপাতে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের চিত্র সবচেয়ে খারাপ। এবং এ রাজ্যে গণ ধর্ষণের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি।

এক জানুয়ারি মাসেই, ১০ বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণ করার দায়ে ৫০ বছরের এক পুরুষকে আটক করা হয়, সাড়ে তিন বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৫ বছরের একটি বালককে আটক করা হয়, ২০ বছরের এক বিবাহিতা নারীকে ধর্ষণ করে দুই পুরুষ; চাষের জমিতে পাওয়া যায় একটি মেয়ে শিশুর ক্ষত-বিক্ষত দেহ। এসব ঘটনা পুলিশের খাতায় উঠেছে। এমন অনেক ঘটনাই পুলিশের কাছেই আসেনা।

ভারত শাসিত কাশ্মীরে একটি মুসলিম যাযাবর সম্প্রদায়ের আট বছরের একটি মেয়ে শিশুকে মন্দিরে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা পুরো ভারতকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। বলা হচ্ছে, মুসলিম ঐ যাযাবররা যেন তাদের এলাকায় ছাগল চরাতে না আসে, সেটা নিশ্চিত করতে ঐ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

অনেক মানুষ এই ঘটনা প্রকাশ্যে সমর্থনও করেছে। অভিযুক্তদের সমর্থনে একটি সমাবেশে যোগ দিয়েছেন রাজ্য সরকাররে বিজেপি’র দুই মন্ত্রী । সমালোচনার মুখে তারা অবশ্য পরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

কেরালা রাজ্যে একজন ব্যাংক ম্যানেজার ফেসবুকে কাশ্মীরে ঐ ধর্ষণ ও হত্যার সমর্থনে পোস্টিং দেন – ‘এটা না হলে ঐ মেয়েটি বড় হয়ে হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে মানব-বোমা হয়ে হাজির হতো।’ তাকে অবশ্য বরখাস্ত করা হয়।

চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করেন, ‘আমাদের কন্যারা বিচার পাবে।’

অনেকেই বলছেন তার এই আশ্বাস ফাঁকা বুলি।

অন্য দলের রাজনীতিকরাও ব্যতিক্রমী তেমন কিছু দেখাতে পারছেন না। ২০১৪ সালে একজন নারী সাংবাদিককে ধর্ষণ করার দায়ে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, উত্তর প্রদেশের বড় দল সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়াম সিং যাদবের মন্তব্য ছিল- ‘পুরুষরা ভুল করে। সেজন্য তাদের ফাঁসি দেওয়া যায়না। আমরা ধর্ষণ বিরোধী আইন বদলাবো।’

ভারতের সামাজিক এই বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে হয় নারীদের: নিজেকে রক্ষা করতে চাইলে, ঠিকমতো পোশাক পরো, পুরুষ সঙ্গী ছাড়া বাইরে যেওনা, অথবা ঘরের ভেতরে থাকো।

সবচেয়ে আশঙ্কা যেটা তা হলো এখন অধিক সংখ্যায় শিশুরা টার্গেট হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানেই দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে। দেশে ধর্ষণের শিকার নারীদের ৪০ শতাংশই শিশু।

মানুষের উদাসীনতা
ধর্ষণ শুধু ভারতের সমস্যা নয়, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং নারী-পুরুষের অস্বাভাবিক অনুপাতের এখানকার পরিস্থিতি অন্যদের চেয়ে খারাপ।

পাশাপাশি রয়েছে মানুষের উদাসীনতা । নারীর অধিকার বা নিরাপত্তা ভারতে কখনই নির্বাচনী ইস্যু নয়।

তবে আশার কথা যে ধর্ষণের ঘটনা বেশি বেশি করে সংবাদে আসছে। মামলা হচ্ছে বেশি।

কিন্তু হতাশার কথা যে ভারতের বিচার ব্যবস্থা এখনও রাজনৈতিক চাপের কাছে পর্যূদুস্ত। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষকরা মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

এখনও ভারতে প্রতি চারটি ধর্ষণের মামলার মাত্র একটিতে অভিযুক্তরা দোষী সাব্যস্ত হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top