গরিব মেরে সদর হাসপাতালের এ কেমন ধর্মঘট

Cox-Pic-Hispital.jpg

ছৈয়দ আলম, 
বেলা পৌনে ১২টা। কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগ ও বহির্বিভাগের সামনের বারান্দা, সিঁড়ি এবং বাইরে রোগী ও স্বজনদের ভিড়। যন্ত্রণায় কাতর রোগী ও স্বজনদের চোখেমুখে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার ছাপ। স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলো একটু উন্নত সেবার আশায় এখানে এসেছেন। কিন্তু সকাল থেকে হাসপাতালের সকল চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম বন্ধ। মঙ্গলবার (১৭ এপ্রিল) সকাল থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও কর্তব্যরত নার্স কর্মবিরতি পালন করছেন হাসপাতালের চারিদিকে তালা লাগিয়ে দিয়ে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ-এক রোগির স্বজনদের হামলায় দুই চিকিৎসক আহত হওয়ায় তাদের এ কর্মবিরতি এবং অবরোধ।
দুপুর সাড়ে ১২টা, বহির্বিভাগের বারান্দায় অসুস্থ ছেলেকে কাঁধে নিয়ে বসে আছেন বাবা নিয়ামত আলী। তিনি কান্না করে বলেন, ছেলে মোস্তফা (২২) পেটে প্রচন্ড ব্যথায় রাতভর ঘুমাতে পারেনি। সকালে অনেক চেষ্টার বদৌলতে টাকা ধার নিয়ে সরকারী হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে নিয়ে এসে আমার ছেলের অবস্থা আরো খারাপ অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারছিনা কোনভাবেই। তিনি আরো বলেন, টিকেট কাউন্টার থেকে জানানো হয়, হাসপাতাল বন্ধ, পরে আসেন। এরপর ছেলেকে নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকি। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত এখানে বসে আছি। ‘ছেলের অবস্থা সিরিয়াস। তাকে নিয়ে এভাবে আর বসে থাকতে পারছি না। চিকিৎসা না হোক, অনন্ত একটু শুইয়ে রাখা দরকার। সে উপায়ও নেই। কখন যে ডাক্তারের দেখা পাব। কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও থেকে আসা রোগি মুবিনা ভর্তি আছেন ৫ম তলায় মহিলা ওয়ার্ডে। তার ভাই রশিদ জুহুরের নামাজ পড়ে হাসপাতালে উঠার সময় বিকল্প সরো গ্রিল দিয়ে প্রবেশ করার সময় জানালার লোহায় মাথা ফেটে যায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন-‘গরিব মেরে এ কেমন ধর্মঘট? হাতে তেমন টাকা-পয়সাও নেই। বাইরের কোন হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা করাব সে উপায়ও নেই।’
এভাবে হাসপাতালের সামনে অনেকে রোগী নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। সবার চোখেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ। কখন টিকেট কাউন্টার খুলবে, কখন প্রিয়জনের চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন, কখন চিকিৎসকরা কাজে যোগ দিবেন, কখন তারা এসে জিজ্ঞাসা করবেন, আপনার কি হয়েছে? কিন্তু কোথাও থেকে কোন সদুত্তর নেই। শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। এমনকি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সাংবাদিকরা নার্সদের জিজ্ঞাসা করলে তাদের সাথেও দুর্ব্যবহার করছে।
রোগির অনেক স্বজনরা বলেছেন ‘কেন রোগীদের এই দুর্ভোগ?’-জানতে সংশ্লিষ্ট কোন কর্তৃপক্ষকেও পাওয়া যায়নি। ওয়ার্ড বয় যারা আছেন তারাও একরকম মুখে কুলুপ দিয়ে আছেন। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৭ এপ্রিল) সকাল ১১টায় দুই শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে মারধর করার অভিযোগে তারা রোগীদের অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। রোগীর অভিভাবকদের হামলায় আহত শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা হলেন-ডা.শেফায়েত হোসেন আরাফাত ও তাওহীদ ইবনে আলাউদ্দিন। তারা দু’জন কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক। শিক্ষানবিশ চিকিৎসদের দাবি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে না।
এদিকে হাসপাতালের অনাকাংখিত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে রয়েছে পুলিশ। হামলার ঘটনার অন্তত ২ ঘন্টা পর হাসান মাহমুদ (৩০) নামে এক রোগীকে থানায় আনা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ওই রোগীকে কেন্দ্র করে চিকিৎসককে মারধরের ঘটনা ঘটে। হাসান মাহমুদ কক্সবাজার শহরের লাইট হাউস এলাকার ইসমাইলের ছেলে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তিনটি গেইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে যেতে পারছে না। আবার ভেতর থেকে কাউকে বেরও হতে দেওয়া হচ্ছে না। এ অবস্থায় অনেক রোগী আটকা পড়েছেন। অনেক আহত ও জরুরি রোগীকেও দেখা গেছে।
ডা. শেফায়েত হোসেন জানান, সকাল ১১টার দিকে হাসান মাহবুব নামে এক রোগী মুখে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগীর চাপের মধ্যে তাকে চিকিৎসা দিতে দেরি কেন বলেই মারধর শুরু করে ৪-৫ জন যুবক।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পুচনু জানান, প্রায়ই চিকিৎসকের উপর হামলার ঘটনা ঘটছে। যারা সেবা প্রদান করবেন তাদেরকেই কারণে-অকারণে মারধর করা হচ্ছে। এটা কোনভাবে মেনে নেওয়া যায় না। চিকিৎসদের নিরাপত্তা প্রদানে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। রোগীদের ভোগান্তির ব্যাপারে তিনি জানান, দ্রুত এই সমস্যা সমাধান হবে। তবে তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি কখন সেবা প্রদান শুরু হবে। কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ উদ্দিন খন্দকার জানান, এঘটনায় একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে। হাসপাতালে যে কোন পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top