দৈনিক সমুদ্রকন্ঠের সাথে সাক্ষাতকারে জেলা প্রশাসক “ভালো আচরণ করে,সেবা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাই”

FB_IMG_1523427675283.jpg

দিসিএম

দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-কক্সবাজারে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের আগে আপনার প্রস্তুতি ছিলো কি?
জেলা প্রশাসক মোঃকামাল হোসেন-অবশ্যই। যে কোনো নতুন জেলা প্রশাসক তার কর্মস্থল জেলা সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব ধারণা নিয়েই দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা করেন। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমিও দায়িত্ব গ্রহণের আগে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে কক্সবাজার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও ধারণা অর্জনের চেষ্টা করেছি।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ -আপনি কি মনে করেন দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে কক্সবাজার জেলা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব বহন করে?
জেলা প্রশাসক-নিঃসন্দেহে কক্সবাজারে আমার বিগত এক মাসের সময়কালীন যে ধারণা, সেটা হচ্ছে যে, যেকোনো জেলার চেয়ে কক্সবাজার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলা। যে জেলাটি আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখবে। আপনি জানেন যে,এখানে রোহিঙ্গা ইস্যু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখন। এখানে ট্যুরিষ্ট প্লেস হিসেবে সারা পৃথিবীতে একটা সুনাম আছে। এখানে সরকারের বড় বড় উন্নয়ন কাজগুলো চলছে। এইসবের ভিত্তিতে বলা যায় যে,কক্সবাজার এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-আপনার কার্যকালে বিগত একমাসে কক্সবাজারে কোন্ কোন্ সমস্যাগুলো অগ্রাধিকারে রাখা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
জেলা প্রশাসক-আমার কাছে খুব বড় কোনো সমস্যা বিদ্যমান আছে বলে মনে হয় না। যে সমস্যা বিদ্যমান,তার ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের প্রস্তুতি আগে থেকেই আছে। আর চ্যালেঞ্জ যেটা আছে,সেটা হলো,এখানে জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হন জনগণকে সেবা দেয়ার জন্য। তাই জনগণকে সস্তুষ্ট করা,জনগণকে তাদের কাংখিত মাত্রায় সেবা প্রদান করা,এটাই হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-এই মূহুর্তে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং রোহিঙ্গাদের অন্যত্র পূনর্বাসনের যে প্রক্রিয়া সেটা আপাতদৃষ্টিতে বেশ জটিল বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া এইক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মনোভাবও নেতিবাচক। সেক্ষেত্রে কোনো বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব হলে কিভাবে মোকাবেলা করা হতে পারে? সেই প্রস্তুতি আছে কি?
জেলা প্রশাসক- প্রত্যাবাসনের বিষয়টা দুই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিষয়। এবং সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও চাপ আছে যে,এখান থেকে তাদের ফিরিয়ে নেয়া হোক। সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেয়া দরকার,সেগুলো কিন্তু নিচ্ছে। সে লক্ষ্যে কিন্তু এপর্যন্ত দু’টি ওয়ার্কিং কমিটি করা হয়েছে। সেখানে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি এবং প্রত্যাবাসন কমিশনারের নেতৃত্বে একটা কমিটি। দু’টা কমিটি কিন্তু কাজ করছে। আর এখানে রোঙ্গিরা প্রত্যাবাসিত হবে কি,হবে না? যাবে কি যাবে না? এটা তো সরকারের বিষয় না। আমরা তো তাদেরকে স্থায়ীভাবে রাখতে পারবো না। নিশ্চয় মায়ানমারে সেই অনুকূল পরিবেশ তৈরী হলে,দুইদেশের মাঝে যেহেতু পারস্পরিক সম্পর্ক আছে,তাদের সাথে সমঝোতা রেখেই আশা করা যায় যে,প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া যাবে।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ার চেয়ে তাদের ভাষানচরে পূনর্বাসনের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে তা অনেক কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। আসলে কি ?
জেলা প্রশাসক-দেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের কোথায় নেয়া হবে এই বিষয়টা এখনো আমাদের কাছে পরিস্কার নয়। তবে নোয়াখালীর ভাষানচরে সরকারের প্রকল্প নেয়া হয়েছে এবং সেখানে নৌবাহিনী প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে। সেখানে সব ধরণের সুবিধাদি নিয়েই কিন্তু সরকার তাদের নিয়ে যাবে। যখন বিষয়টা সামনে আসবে,সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-আপনার কার্যকাল খুবই স্পর্শকাতর একটি সময়ে এসেছে। যেখানে রোহিঙ্গা সমস্যা তো আছেই,সামনে আসছে নির্বাচন। যেখানে সব দল না এলে আন্দোলন ও সংকটময় সময় আসতে পারে এমন আশংকা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আপনার প্রস্তুতি কি হবে?
জেলা প্রশাসক-আসলে এই বিষয়ে জেলা প্রশাসকের তেমন কিছু করণীয় নেই। নিয়ম-কানুন,সরকারের সিদ্ধান্ত মেনেই আইনকানুনের ভেতরে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর বাইরে অতিরিক্ত কিছু করার সুযোগ নেই। ইচ্ছেও নেই।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-যেহেতু কক্সবাজার দেশের সেরা পর্যটন কেন্দ্র,তো আপনার কাজের অগ্রাধিকারে পর্যটন কতো নম্বরে আছে?
জেলা প্রশাসক-নিশ্চয় পর্যটনকে অগ্রাধিকার না দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ কক্সবাজারকে সারাবিশ^ চিনছে একশ কিলোমিটার আনব্রোকেন বীচ হিসেবে। এটা আমাদের দেশের বড় সম্পদ। সুতরাং ট্যুরিষ্টদের আকর্ষিত করার জন্য,ট্যুরিজমের যাতে বিকাশ ঘটে,আমাদের যে বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও অন্যান্য যে কাজগুলো আছে,উন্নয়নের যে কাজগুলো আছে,অবশ্যই তা অগ্রাধিকার পাবে।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-আপনার দায়িত্ব পালনকালে পর্যটন নিয়ে বিশেষ কিছু বা ভিন্ন কিছুর চিন্তা করছেন কিনা?যদিও মাত্র একমাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন আপনি।
জেলা প্রশাসক-আমরা চিন্তা করছি পর্যটকদের সুবিধা বাড়ানোর জন্য। আপনি দেখছেন যে, সৈকতে যতোগুলো পয়েন্ট আছে,কবিতা চত্বর থেকে শুরু করে লাবণী,সুগন্ধা,কলাতলী,ইনানী। এই পয়েন্টগুলোতে পর্যটকদের পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। বিশেষ করে পর্যটকেরা যখন সাগরে নামেন, তাদের জিনিসপত্র রাখার ব্যবস্থা নেই। তখন একজনকে জিনিসিপত্র পাহারা দিতে হয়। তারপরে ওয়াশরুমের তেমন ব্যবস্থা নেই। তো আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিকল্পনা করেছি,সৈকতের এইসব পয়েন্টে আধুনিকমানের লকার এবং ওয়াশরুম স্থাপন করবো। যাতে পর্যটকেরা একটু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
সৈকতের কিছু কিছূ জায়গাতে আলোর স্বল্পতা আছে। আমরা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করবো। এই জায়গাগুলোতে টহলের দেয়ার জন্য আমাদের ট্যুরিষ্ট পুলিশ রয়েছে। আমরা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে বীচ বাইক কেনার পরিকল্পনা নিয়েছি। যাতে যে কোনো সময় বীচ পরিদর্শন করা যায়।
বীচ ক্লিনিং করার জন্য,আপনারা জানেন মাননীয় আইসিটি প্রতিমন্ত্রি জুনাইদ আহমেদ পলক এসেছিলেন। তিনি নিজেও ক্যাম্পেইন করেছেন। আমরাও সাথে ছিলাম। আমরা মাঝে মধ্যে সেখানে ভিজিট করছি,যাতে বীচ ক্লিন থাকে। তারপরে বীচের পাশে যে অগোছালো মার্কেট এবং দোকানগুলো রয়েছে। এগুলোকে একটা শেইপে আনতে হবে,সুন্দর একটা পরিবেশ যেনো হয়, পর্যটকেরা আকৃষ্ট হয়। আপনি যদি ইনানী বীচে যান, নামার সময় দেখবেন যে দুপাশে খুব অগোছালো ও এলোমেলোভাবে দোকানগুলো আছে। দেখতে ভালো লাগে না। আমরা চাই ব্যবসা করুক,কিন্তু জায়গাটা যেনো সুন্দর থাকে। একই ডিজাইনে যেনো করতে পারে। ডিজাইন অলরেডি করা হয়ে গেছে। এখন সেটা কিভাবে বাস্তবায়ন করবো সেই প্রক্রিয়ায় আমরা আছি। এইসব ছোটোখাটো ডেভেলাপমেন্টের মাধ্যমে আমরা বীচকে আরো আকর্ষণীয় করতে পারবো আশা করি।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-আপনি স্থানীয় সুশীল সমাজ,মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহলের কাছ থেকে কেমন ধরণের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন?
জেলা প্রশাসক-যেগুলো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজ আছে তা যেনো যথা সময়ে যথাযথভাবে করতে পারি,কাংখিত সেবা প্রদান করতে পারি তার জন্য সুশীল সমাজ,মিডিয়া,বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজকর্মী,রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব,সমাজকল্যাণমূলক সংগঠন সমূহের কাছ থেকে পরামর্শ চাইবো। কীভাবে আমরা সেবার মান বাড়াতে পারি।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-পরামর্শ দেয়ার পদ্ধতিটা কি?
জেলা প্রশাসক-আপনি জানেন যে আমাদের ফেসবুক পেইজ আছে। কক্সবাজার ডিস্ট্রিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। সেখানে দিতে পারে। আমাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ,মিটিং হয়। সেখানে হতে পারে। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে চান,লিখিতভাবে পরামর্শ দিতে পারেন। কেউ চাইলে মোবাইল ফোনে পরামর্শ বা তথ্য জানাতে পারেন। আমার মোবাইল ফোন চব্বিশ ঘন্টাই খোলা থাকে। সরাসরি আমার অফিসে এসেও আমাকে তথ্য জানাতে পারবেন।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-প্রশাসনে সব সময়ই এক ধরণের তদবিরবাজ সক্রিয় থাকে। এদের ব্যাপারে আপনার কোনো নির্দেশনা আছে কিনা?
জেলা প্রশাসক-অবশ্যই এটা বাংলাদেশে একটা বাজে সংস্কৃতি। জেলা প্রশাসনেও তার ব্যতিক্রম নেই। আমরা চাই যে,যার সেবা নেয়ার কথা তিনি যেনো সরাসরি আসেন। সেই নির্দেশনা দেয়া আছে। যিনি সেবাগ্রহীতা,তিনি যদি সরাসরি জেলা প্রশাসকের সাথেও দেখা করতে চান,কোনো সমস্যা নেই। আমার দরজা সব সময়ই খোলা থাকবে। আর যদি কোনো দালাল শ্রেণী আসে এবং সেটা যদি আমাদের নজরে আসে,তারা নিজেদের স্বার্থে কাজ করছে। এমন হলে দালালদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আছে। সেই বিধান আমরা প্রয়োজন হলে নিশ্চয় প্রয়োগ করবো। আমরা চাই না যে জেলা প্রশাসনে কোনো দালালের অবস্থান হোক।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-আশা করা যায়,আপনার কার্যকালেই কক্সবাজার বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হবে। রেলওয়ে সার্ভিস চালু হবে। মাতারবাড়ী বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে যাবে। সবমিলিয়ে আপনি হয়তো কক্সবাজারে উন্নয়নের টার্নিং পয়েন্টে একজন সহযোগী হবেন,ইতিহাসের অংশ হবেন। আপনার অনুভূতি কি?
জেলা প্রশাসক -অবশ্যই এতো গুরুত্বপূর্ণ সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেটা হবে একজন সফল জেলা প্রশাসক হিসেবে সুখকর অনুভূতি।
আর আমি আসার পর থেকেই বলছি তিনটা জিনিস আমরা দিতে চাই, আর কিছু না পারি। একটা হলো,মানুষের সাথে আমরা সুআচরণ করবো। জনগণের সাথে সুআচরণ করবো। সৎ আচরণ করবো। মানবিক আচরণ করবো।
আমার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আমি এই অনুরোধটা জানিয়েছি। ভালো আচরণ করে,সেবা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাই।
দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ-আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেয়ার জন্য। ভালো থাকুন।
জেলা প্রশাসক মোঃকামাল হোসেন- ভালো থাকবেন। আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top