চুরি হওয়া সিএনজি যায় কোথায়?

6419bc29175c0c3020af9c9a61207344-5ac25d46ab869-54.jpg

নিউজ ডেস্ক।।

৬০ বছরের অটোরিকশা চালক করিম উল্লাহ (আসল নাম নয়) উত্তরা থেকে গত ১৫ মার্চ রাতে যখন যাত্রী তুলেছিলেন তখন একবারও ভাবেননি সিএনজি দিয়েই এর মূল্য চুকাতে হবে। কথাবার্তায় যাত্রীকে খুবই অমায়িক মনে থাকে তার। এক পর্যায়ে রাস্তার পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে তাকে চা খাওয়ার প্রস্তাব দেন যাত্রী।

ওই দোকানে অন্য কেউ ছিল না জানিয়ে করিম বলেন, ‘এক কাপ চা খেলাম আর আবার কয়েক মিনিটের মাথায় সিএনজি নিয়ে রওনা দিলাম, ঘুম ঘুম লাগতে থাকায় সিএনজি দাঁড় করাতে বাধ্য হলাম। এরপর জেগে উঠে নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পাই।’ ‘আমার কোম্পানির আরেক ড্রাইভার ইবরাহিম আমাকে জানায় অচেতন অবস্থায় আমাকে দেখতে পেয়ে এখানে নিয়ে এসেছে’, বলেন তিনি।

আমার অটোরিকশা আর মোবাইলের কোনও খোঁজ নেই। নিজের মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে এক লোক ধরে জানায় তিনি আমার অটোরিকশাটি পেয়েছেন, বলতে থাকেন করিম। তিনি জানান, ওই লোক আমাকে বলেন ৭০ হাজার টাকা দিলে তিনি আমার সিএনজিটি ফেরত দেবেন। সতর্ক করে দিয়ে বলেন পুলিশকে যেন না বলি। আমি প্রথমে পুলিশের কাছেই যেতে চেয়েছিলাম, পরে বুঝলাম এতে শুধু সময়ই নষ্ট হবে।

পরে চোরের সঙ্গে দর কষাকষি করে ৫০ হাজার টাকায় রফা করলে সে একটি জায়গায় যেতে বলে জানিয়ে করিম বলেন, এসব চোরদের অনেকেই দিনের বেলায় বিভিন্ন অফিসে চাকরিবাকরি করে।

আরেক ড্রাইভারের নাম সেলিম (৫৫)। বিমানবন্দর সড়কে মধ্য জানুয়ারিতে তাকেও প্রায় একইভাবে ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে তার সিএনজিটি চুরি করে নেয়। ৬০ হাজার টাকায় রফা করে নিজের সিএনজিটি ফেরত পেয়েছেন তিনি। তিনিও ভেবেছিলেন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনও কাজ হবে না।

পুলিশের গোয়েন্দারা বলছেন, এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন কমপক্ষে একশ’ অপরাধী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি শাখার সিনিয়র অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার রাহুল পাটোয়ারি বলেন, এসব চোরের অনেকেই দিনের বেলায় বিভিন্ন অফিসে চাকরি করে। তারা একটা সিএনজি ভাড়া করে ড্রাইভারকে এটা-সেটা বুঝিয়ে পূর্ব নির্ধারিত কোনও জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। তারপর সে বা তার দল ওই ড্রাইভারকে ওষুধ প্রয়োগ করে সিএনজি নিয়ে চম্পট দেয়।

ডিএমপির গোয়েন্দারা বলছেন, ঢাকা শহরে এধরনের অপরাধে ১২-১৫টি চক্র এখন সক্রিয় রয়েছে। প্রত্যেকটি চক্রে পাঁচ থেকে সাতজন যুক্ত রয়েছে।

সিএনজি চুরি সবসময় চুরিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সিএনজি চালক ইস্কান্দার হাওলাদারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চার ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সম্প্রতি তারা অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।

পথে যাত্রীর অপেক্ষায় এক সিএনজিচালক

তাদের স্বীকারোক্তি ও ডিবি পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী রাতের বেলা দুই ভাগে ভাগ হয়ে অটোরিকশার সন্ধানে নেমে পড়ে। প্রথম দলে থাকা দুই তিনজন মিলে সিএনজি ভাড়া করে। সেই সময়ে অপর গ্রুপটির তিন চারজন সদস্য পূর্ব নির্ধারিত অন্য একটি জায়গায় অবস্থান নেয়। সেই স্থানে ভাড়া করা সিএনজিটি নিয়ে এলে দুই গ্রুপের সদস্যরা মিলে ড্রাইভারকে ওষুধ প্রয়োগ করে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়।

চুরির কয়েক দিন পর চোরেরা এক মধ্যস্থতাকারী দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই মধ্যস্থতাকারী ড্রাইভার বা অটোরিকশা মালিককে তা ফিরিয়ে দিতে যোগাযোগ করে।

ধরা পড়া চক্রটির দলনেতা ইলিয়াস ও তার সহযোগী লিটন, জসিম এবং আনোয়ার তাদের স্বীকারোক্তিতে জানায় তারা ইস্কান্দারকে আগারগাঁওয়ের বাণিজ্যমেলার জায়গা থেকে ভাড়া করে। ফার্মগেটে তারা এক বন্ধুকে তোলার কথা বলে সিএনজিটি দাঁড় করায়। সেখানে বন্ধু মিন্টু তাদের চা খাওয়ার প্রস্তাব দেয়। পরে হাতে থাকা ঘুমের ওষুধ চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় সে। পরে ইস্কান্দারকে সিএনজিতে তুলে মানিক মিয়া এভিনিউতে ফেলে দেওয়া হয়।

ইলিয়াস থাকে মিরপুরের শাহ আলী মাজার এলাকায়। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, গত দুই-তিন বছর ধরে এই কাজ করছে সে। দিনের বেলায় করে শ্রমিকের কাজ।

চুরি করা এসব সিএনজি ফিরিয়ে দিতে ৫০ থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত দর ঠিক করা হয়। পুরনো সিএনজি কিনতে গেলে বাজারে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা দরকার পড়ে।

ডিএমপির গোয়েন্দারা কয়েকটি চক্রের প্রধানকে শনাক্ত করেছে। ড্রাইভার আর মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা দালালদের নামও পাওয়া গেছে। ইলিয়াসের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চক্রের প্রধান হিসেবে বেশ কয়েকটি নাম পেয়েছে গোয়েন্দা বিভাগ। এরা হলো অলি, মুজিবর, শামীম, জামাল, ছোট জামাল, সেলিম ও নজরুল। ফারুক নামে এক ব্যক্তি সবচেয়ে পরিচিত দালালদের গ্রুপের নেতা। অন্য দুটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন মিরাজ ও আওয়াল। প্রতি সিএনজিতে দালালরা ১৫ থেকে ২০ হাজার করে টাকা পান বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা রাহুল পাটোয়ারী।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top