সালামের আশ্চর্য জাদু, ইসলাম গ্রহান করে ফেললেন ক্যাথলিক যাজক

6419bc29175c0c3020af9c9a61207344-5ac25d46ab869-36.jpg

মুসলিম বালকের সালামে মুগ্ধ ক্যাথলিক যাজক

আর যখন তারা আমার রাসুলের মাধ্যমে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা শোনে,তখন তুমি দেখতে পাবে তাদের চোখে অশ্রু টলমল করছে কারণ তারা সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছে (কোরআন ৫:৮৩)

ব্রিটেনের একটি স্কুলে ছাত্রদের কোরআনের এই আয়াতটি অনুবাদ করে শুনাচ্ছিলেন সাবেক রোমান ক্যাথলিক যাজক ইদ্রিস তৌফিক। যিনি পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। উপরোক্ত কোরআনের আয়াতটি তাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।

ব্রিটিশ কাউন্সিল, কায়রোতে দেয়া এক লেকচারে তিনি তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কথা বলেন। তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর আমি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। যাজক হিসেবে মানুষের সেবা করেছি এবং তা আমি উপভোগ করেছি। যাইহোক, এর পরও ভিতরে ভিতরে আমি খুশি ছিলাম না এবং আমার কাছে কেবল মনে হয়েছে, সেখানে কিছু একটা সঠিক নয়। আমি বিশ্বাস করি সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ সবকিছু ঠিক করে রেখেছেন। আল্লাহ চেয়েছিলেন বলেই আমি ইসলামের পথে আসতে পেরেছি, আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে আপনাদের সামনে কথা বলতে পারছি। আল্লাহ তার নিদর্শন বিভিন্নভাবে দেখাতে পারে। যেমন- কোরআন , বিজ্ঞান, সূর্যোদয়ের মাধ্যমে। তিনি আমাকে দেখিয়েছেন আমার আত্বার মাধ্যমে।

আপনারা জানেন, চার্চের যাজকরা বিয়ে করতে পারে না। এজন্য আমি ছিলাম নিঃসঙ্গ। চার্চের নিয়মিত কাজগুলো করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ছুটি কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমার কাছে খুব বেশি টাকা ছিল না। তাই আমি ইন্টারনেটে খুঁজতে লাগলাম কোথায় কম খরচে ছুটি কাটানো যায়। সেখানে আমি পেলাম মিসর। মিসর সম্পর্কে আমার কোনো ধারনা ছিল না ।আমার ধারনা ছিল মিসর হচ্ছে পিরামিড, উট, বালি ও খেজুর গাছের দেশ। আরেকটি বিয়য় হচ্ছে মুসলিম, যাদের সম্পর্কে আমার কোনো ধারনা ছিল না।

ওই সময় মুসলমানদের সম্পর্কে সব ব্রিটিশদের মতো আমার চিন্তাধারাও ছিল মুসলিমরা হচ্ছে বোমাবাজ ও যোদ্ধা, যা মিডিয়া ও টিলিভিশন থেকে বারবার শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অন্য সবার মতো আমারও ধারনা ছিল, ইসলাম একটি অশান্তির ধর্ম। যাই হোক শেষ পর্যন্ত আমি মিসরে গিয়েই ছুটি কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমি মিসরের হূর্ঘদায় গিয়েছিলাম। এটা মিসরের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র এবং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শহরটি লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত।

‘এটা অনেকটা ইউরোপীয় কিছু সমুদ্র সৈকতের অনুরূপ যা আমাকে বিস্মিত করেছিল। আমি প্রথমে বাসযোগে কায়রো যাই। সেখানে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর একটি সপ্তাহ অতিবাহিত করি। প্রথমবারের মতো আমি সেখানে ইসলাম ও মুসলমানদের সান্নিধ্যে আসি। সেখানে আমি খেয়াল করলাম মিসরীয়রা কতটা ভদ্র ও ভালো মানুষ কিন্তু খুবই শক্তিশালী।’

ইসলামে আমার প্রথম সূচনা হয় কায়রোতে একটি ছোট বালকের মাধ্যমে। সে রাস্তায় বসে জুতা সেলাই করত। একদিন আমি তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে খুব সুন্দর করে বললো ‘আস্সালামু আলাইকুম’। সে সময় আমি আরবি জানতাম না। তখন আমি কিছু আরবি শব্দ শিখে নিয়েছিলাম, যেমন তুমি কেমন আছো ইত্যাদি। আমার যখনই সেই বালকের সামনে দিয়ে যেতাম তার খোজ খবর নিতাম। উত্তরে সেই বালক বলতো আলহামদুলিল্লাহ। এখান থেকেই মুসলমানদের সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে যেতে থাকে।

আমি দেখেছি , ‘মসজিদ থেকে আজানের শব্দ শুনতে পেয়ে রাস্তায় পণ্য বিক্রি করা অত্যন্ত সাধারণ মানুষগুলো তাদের বেচাকেনা ফেলে রেখে আল্লাহ দিকে তাদের মুখ নির্দেশ করে মুহূর্তের মধ্যে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। আল্লাহর প্রতি তাদের দৃঢ় বিশ্বাস আমাকে মুগ্ধ করে। মৃত্যুর পর বেহেশত লাভের প্রত্যাশায় তারা নিয়মিত নামাজ পালন, রোজা পালন, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা এবং মক্কায় গিয়ে হজ পালনের স্বপ্ন দেখে।’

মিসর থেকে ফিরে আমি নতুন কাজের সন্ধান করতে থাকি। যেহতু আমার ধর্মীয় শিক্ষায় অভিজ্ঞতা আছে সেহেতু আমি শিক্ষকতা কারার সিদ্ধান্ত নেই। এরপর আমি একটি বাচ্চদের স্কুলে পড়ানোর সুযোগ পেলাম। সেখানে আমাকে ছয়টি ধর্ম পড়াতে বলা হলো। কিন্তু আমি শুধু ইহুদি এবং খ্রিষ্টান ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম সম্পর্কে জানতাম না। আমার ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজন আরব শিক্ষার্থী ছিলো। এজন্য আমাকে প্রতিদিন প্রচুর পড়তে হতো। এভাবে তিন মাস পরে আমি ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। আমি জানতে পারি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে।

একদিন আরবি পড়ানোর সময় আমি সূরা মায়েদার ৮৩ নং আয়াতটি পড়ছিলাম। তখন নিজের অজান্তেই আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি ছাত্রদের সামনে তা আড়াল করতে চেষ্টা করি।

সাধারণত কিশোর-কিশোরী বয়সে অনেক ছেলে-মেয়েই কিছুটা দুষ্ট প্রকৃতির হয়ে থাকে। কিন্তু এই আরব মুসলিম শরণার্থী শিশুরা ভাল মুসলামানের উদাহরণ স্থাপন করে। এই ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল খুবই ভদ্র ও দয়ালু। তাই তাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকে। রমযান মাসে নামাজের জন্য আমার শ্রেণীকক্ষ তারা ব্যবহার করতে পারবে কিনা সেসম্পর্কে তারা আমার মতামত জিজ্ঞাসা করে।

মুসলিম বালকের সালামে মুগ্ধ ক্যাথলিক যাজক

সৌভাগ্যবশত কেবল আমার রুমটিতেই কার্পেট বিছানো ছিল এবং কার্পেটের ওপর শিশুদের মাসব্যাপী নামাজ পড়ার অনুমতি দেই। আর আমি প্রতিদিন পিছে বসে তাদের নামাজ পর্যবেক্ষক করতাম। এটা আমাকে তাদের সঙ্গে রমজানের রোজা রাখতে উৎসাহ যুগিয়েছিল। আমি ভাবতে শুরু করি, কেন ইসলাম? কেন আমরা কিছু মানুষের সন্ত্রাসীদের কর্মের জন্য ধর্ম হিসেবে ইসলামকে দোষারোপ করি। যখন কিছু খ্রিস্টান একই কাজ করছে; তখন কেন কেউ খ্রিস্টধর্মকে সন্ত্রাসবাদের ধর্ম বলে অভিযুক্ত করে না?

এই ধর্ম সম্পর্কে জানতে আমি একদিন লন্ডনের সবচেয়ে বড় মসজিদে যাই। লন্ডনের কেন্দ্রীয় মসজিদের প্রবেশ পথে আমি ইউসুফ ইসলামকে পাই। তিনি ছিলেন একজন পপ গায়ক। সেখানে বৃত্তাকারে বসে ইসলাম সম্পর্কে কিছু মানুষের কথা বলা শুনলাম।

সেখানে আমাকে একজন বললেন, মুসলমানেরা এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করে, প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ পড়ে এবং রমজান মাসে রোজা পালন করে। আমি তাকে এই বলে থামিয়ে দিলাম, আমি এর সবই বিশ্বাস করি এবং এমনকি রমজানে আমি রোজাও রেখেছি।

তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তাহলে আপনি কিসের জন্য এখনো অপেক্ষা করছেন? কি আপনাকে এ পথে আসতে বাধা দিচ্ছে?’ আমি বলেছিলাম, ‘না, আমি ধর্মান্তরিত হতে মনস্থ করিনি।’

সেই মুহূর্তে মসজিদে মাগরিবের আযান দেয়া হলে সবাই প্রস্তুত হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। আমি পেছনে বসে চিন্তা করছিলাম আমি কি করছি? তখন আমার মাথায় শুধু ঘুরছে আযানের ধ্বনি, আল্লাহু আকবার …। আমি দেখছিলাম পুরুষরা নিচতলায় আর মহিলারা দ্বিতীয় তলায় নামাজ পড়ছেন। আমার কাছে মনে হলো, আকাশ থেকে ফেরেশতারা নেমে এসছে। যখন কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছিল, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। এসময় আমার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল।

‘তাদের নামাজ শেষ হলে আমি ইউসুফ ইসলামের কাছে যাই এবং তাকে অনুরোধ করি আমাকে কালেমা শিক্ষা দেয়ার জন্য; যাতে আমি ইসলামে ধর্মান্তর হতে পারি। তিনি প্রথমে আমাকে ইংরেজিতে কালেমার অর্থ ব্যাখ্যা করে শোনান। পরে আমি তার সঙ্গে সঙ্গে আরবিতে এটি পাঠ করি। এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।’ কালেমা পাঠ করার পরে আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।
ইদ্রিস তৌফিক ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে মারা যান

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top