মিয়ানমারে আটক সাংবাদিকদের ১০০ দিনের বন্দিজীবন

received_304237230109452-1024x768-1.jpeg

বুধবার রয়টার্সের আটক দুই সাংবাদিক মিয়ানমারে তাদের বন্দী জীবনের একশতম দিন পার করেছেন। সেদিন ছিল আদালাতে তাদের ১১তম হাজিরার তারিখ। গত ডিসেম্বরে ‘গোপন সরকারি নথি’ ফাঁস করার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করেছে মিয়ানমার। ওই গ্রফতার ঘটনার আগে তারা রাখাইনে ১০ জন রোহিঙ্গাকে গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনাটি বিশ্ববাসীর নজরে এনেছিলেন। তাদের গ্রেফতার হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মিয়ানমার স্বীকার করতে বাধ্য হয়, হত্যাকাণ্ডটির সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনী জড়িত। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আটক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকারি নথি ফাঁসের যে অভিযোগ এনেছে মিয়ানমার তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনে ওই অপরাধের জন্য ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

 

ইয়াঙ্গুনের আদালতে রয়টার্সের আটক সাংবাদিক ৩১ বছর বয়সী ওয়া লোন এবং ২৮ বছর বয়সী কিয়াও সোয়ি উয়ের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই শুনানির পর আটক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা না কারার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে আদালত। ঔপনিবেশিক আমলের শত বছরের পুরাতন সংশ্লিষ্ট আইনে ১৪ বছরের জেল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার মুখে দাঁড়িয়েও সাংবাদিক লন বলেছেন, ‘আমারা জেলে একশ দিন পার করেছি। এতদিন জেলে থাকার পরও আমাদের সাংবাদিকসুলভ স্পৃহা এতটুকু কমেনি।’
বুধবারের শুনানিতে বিবাদী পক্ষের আইনজীবী ১০ রোহিঙ্গা হত্যার ওপর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনটি আদালতে উত্থাপনের আর্জি জানালে আদালত সে আর্জি খারিজ করে দেন। আগের শুনানিতে দেওয়া একই সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিচারক ইয়ে লুইন বলেছেন, শুনানির ওই পর্যায়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিকে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে আদালতের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। শুনানিতে বুধবার আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন ওয়া লনের ছোট ভাই ২৬ বছর বয়সী তুরা অং। তিনি আদালতে বলেছেন, ডিসেম্বরের ১৩ পুলিশ যখন তাদের বাসায় তল্লাসি অভিযান চালিয়েছিল তখন পুলিশ কোনও পরোয়ানা দেখায়নি। এমন কি নিজেদের পরিচয়ও দেয়নি। তল্লাসি করার কোনও কারণ না জানিয়েই তারা ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক ও অন্যান্য জিনিসপত্র জব্দ করে। থুরা অংয়ের এই জবানবন্দি আদালতের কাছে দেওয়া পুলিস কর্মকর্তা সোয়ে অংয়ের সাক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পুলিশ কর্মকর্তা আদালতকে বলেছিলেন, তল্লাসির আগে পরোয়ানা দেখানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, ওই তল্লাসি অভিযানের পরের দিনই রয়টার্সের সাংবাদিকরা আটক হন।

শুনানি শেষ হওয়ার পর বিবাদী পক্ষের আইনজীবী থান যাও অং সাংবাদিকদের বলেছেন, মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী তল্লাসি করার আগে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে এবং তল্লাসির কারণ জানাতে বাধ্য। আদালত এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় সরকার পক্ষের আইনজীবীর মন্তব্য নিতে পারেনি রয়টার্স। তবে গত শুনানির পর যখন তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছিল তখন তিনি কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মিয়ানমার সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকেও বুধবার কেউ কোনও বক্তব্য দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সুইডেনের কূটনৈতিকরা বুধবারের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।

রয়টার্সের আটক

সাংবাদিকরা তাদের পরিবারের সদস্যদের বলেছেন, অপরিচিত পুলিশ সদস্যের আমন্ত্রণে তারা একটি রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতে কিছু মোড়ানো কাগজ ধরিয়ে দিয়ে গ্রফতার করা হয় তাদের। গত বছরের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে ১০ রোহিঙ্গার মৃত্যু হওয়ার বিষয়ে অনুসন্ধান করছিলেন আটক সাংবাদিক ওয়া লোন এবং কিয়াও সোয়ি উ। সাংবাদিকদ্বয়ের গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর মিয়ানমার স্বীকার করতে বাধ্য হয়, সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাখাইনে রোহিঙ্গা হত্যার ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল।
রয়টার্সের সভাপতি ও প্রধান সম্পাদক স্টিফেন জে অ্যাডলের আটক সাংবাদিকের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বলেছেন, ‘শুধু সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করাতেই তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওয়া লোন এবং কিয়াও সোয়ি উ উদাহরণ তৈরি করা ব্যক্তিত্ব এবং অসাধারণ সাংবাদিক যারা তাদের পরিবার ও পেশার প্রতি নিষ্ঠাবান। তাদের থাকার কথা সংবাদ কক্ষে, জেলখানায় নয়।

জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো আটক সাংবাদিকদ্বয়ের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে। ইয়াঙ্গুনে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের টুইটার অ্যাকাউন্টে লেখা হয়েছে, ‘আজ সাংবাদিক ওয়া লোন এবং কিয়াও সোয়ি উয়ের আটক হওয়ার একশতম দিন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকাটা মিয়ানমারের গণতন্ত্রে উন্নীত হওয়ার পথে অনেক বড় বাধা।’ ডেনমার্ক দূতাবাস তাদের দুজনের কারাবাস প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছে, ‘মানুষের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়েই তাদের একশ দিন জেলে থাকতে হয়েছে।’ মিয়ানমারে অবস্থিত সুইডেন দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমরা বিশ্বাস করি, তারা অন্যায় কিছু করেননি এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হবে।’

মিয়ানমারে নিয়োজিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূত ক্রিস্টিয়ান শমডিট বলেছেন রাখাইনের গণহত্যার খবর নিয়ে আটক সাংবাদিকদ্বয়ের রচিত প্রতিবেদনগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। তার ভাষ্য, ‘আমার সবাই যা ঘটেছে সে বিষয়ে সত্য জানতে চাই। কিন্তু আমি আশঙ্কা করি, যা হয়েছে তার সম্পর্কে খণ্ডিত সত্য হয়তো আমাদের জানানো হবে।’ উল্লেখ্য, জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হাউ দো সুয়ান গত মাসে বলেছিলেন, সাংবাদিকতার জন্য তাদেরকে আটক করা হয়নি। ‘অবৈধভাবে সরকারি গোপনীয় নথি’ সংগ্রহের দায়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top