রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় কেটে তৈরী হচ্ছে নতুন স্থাপনা

-1.jpg

দিসিএম ডেস্ক/

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্থ করতে কৌশলে নানামুখী তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। রোহিঙ্গা বিষয়ে এমন অভিযোগ সবচেয়ে বেশী উঠেছে বিভিন্ন এনজিও এবং আইএনজিও’র বিরুদ্ধে। এমন প্রক্রিয়ার অংশ স্বরুপ টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড় কেটে নতুন করে বনভুমি জবর দখল করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পানি সংরক্ষণাগারের নাম দিয়ে পাহাড়ের হাতি চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করেই স্থাপন করা হচ্ছে ড্যাম। এতে করে টেকনাফ বনাঞ্চলের হাতির অস্তিত্ব বিপন্নেরও আশংকা দেখা দিয়েছে।

একদিকে সরকার ভাসানচরে সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সেখানে স্থানান্তরের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশি বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা কৌশলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও পাল্লা দিয়ে সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর তৎপরতায় মেতেছে। এতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়াসহ অন্যত্র স্থানান্তর প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনসব অভিযোগও উঠেছে যে, দেশি বিদেশি নানা সংস্থার পাতানো ফাঁদে পা দিচ্ছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও ক্যাম্প প্রশাসন পর্যন্ত। তারা এসব কাজে বাঁধা দেওয়ার চেয়ে বরং উল্টো সহযোগিতা দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন করে আর কোন ভূমি বরাদ্দ না দিতে এবং ক্যাম্প এলাকায় নতুনভাবে কোন অবকাঠামো তৈরী না করতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে সে নির্দেশনা পর্যন্ত অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। এমনকি কক্সবাজার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায়ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, রোহিঙ্গা শিবিরের জন্য নতুন করে বন ভুমি ব্যবহার করা হবে না। কক্সবাজার বিভাগীয় বন বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ৮ হাজার একর বনভুমি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

সরেজমিনে টেকনাফ ২৬ নম্বর শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য পানি সংরক্ষণের নামে পাহাড় কেটে ও হাতির চলাচলের পথ বন্ধ করে স্থাপন করা হচ্ছে স্লুইচ ও ড্যাম। সেখানে এক্সকেভেটর দিয়ে দিবা-রাত্রি পাহাড়ের মাটি কেটে সমান করা হচ্ছে। ডাম্পারে করে মাটিগুলো ড্যামে (বাঁধে) ফেলা হচ্ছে।

পরিবেশবাদিরা জানান, টেকনাফ বনভুমির বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে হাতির অভয়ারণ্য। সেখানে বেশ কিছু হাতি রয়েছে। এসব হাতির পাল চলাচল করে থাকে যেখানে পাহাড় কেটে ড্যামটি স্থাপন করা হচ্ছে সেখানেই। একদিকে কক্সবাজার এলাকায় হাতি হত্যার মহোৎসব চলছে অপরদিকে টেকনাফে হাতি চলাচলে জায়গাটিও জবর দখল করে হাতির প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হচ্ছে।

যদিও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক স্থাপন করা রয়েছে। সেখানে বনভূমি ও হাতি চলাচলের পথে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)’র সহায়তাপুষ্ট ইএপি প্রকল্পের আওতায় রোহিঙ্গাদের জন্য ড্যাম স্থাপনা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, কক্সবাজার।

অভিযোগ উঠেছে, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে কোন ধরনের অনুমতি না নিয়ে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংরক্ষিত বনভূমিতে হাতি চলাচলের পথে স্লুইচ ও ড্যাম স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের তরফ থেকে কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী বরাবরে একাধিকবার কাজ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করে পত্র প্রেরণ করা হলেও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এখনো কাজ বন্ধ করেনি। জাতীয় বননীতি ১৯৯৪ এর ১৯ নম্বর ঘোষণায় ‘দেশের বনভূমির অপ্রতুলতার প্রেক্ষিতে সরকারী মালিকানাধীন সংরক্ষিত বনভূমি সরকার প্রধানের অনুমোদন ব্যতিত বনায়ন বহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না’ মর্মে উল্লেখ থাকলেও জনস্বাস্থ্যের কর্মকাণ্ডে তা মানা হচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কক্সবাজার এর নির্বাহী প্রকৌশলী ঋত্বিক চৌধুরী বলেন,‘শুষ্ক মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে রিজার্ভ বনভূমির বাইরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় একটি ড্যাম স্থাপন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারসহ বনবিভাগের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে স্পটটি দেখে গেছেন। এ বিষয়ে তারা কোন আপত্তি করেননি। এছাড়া আমরা প্রকল্পটি ক্যাম্প ইন চার্জ (সিআইসি)’র অনুমতি নিয়ে করছি। রিজার্ভ বনভুমির বাইরে হলেও অলরেডি আমরা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনের চেষ্টা করছি, শিগগির পেয়ে যাবো।’

অপরদিকে অতিরিক্ত রোহিঙ্গা শরনার্থী ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ-দ্দৌজা বৃহষ্পতিবার বলেন-‘সীমান্তবর্তী এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের জন্য বাঁধ দিয়ে পানি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য বিভাগ।’ তিনি বলেন, আগেও পানির ব্যবস্থা করা ছিল তবে এটি একটু বৃদ্ধি সাপেক্ষে বড় করা হচ্ছে।

যদিও শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে পাহাড়ের আশপাশে কোন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস নেই, এরপরও জনস্বাস্থ্য ও রোহিঙ্গা প্রশাসনের দাবি- প্রকল্পটি রোহিঙ্গা ও স্থানীয় উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাদিমুরা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সরওয়ার কামাল বলেন, যেখানে ড্যামটি স্থাপন করা হচ্ছে তার আশপাশে স্থানীয় কোন মানুষের বসতি নেই। এ ড্যাম রোহিঙ্গা ছাড়া স্থানীয়দের কোন কাজে আসবেনা।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পে পাহাড়ের ছড়া (খাল) সংলগ্ন যে ড্যাম স্থাপন করা হচ্ছে জনস্বাস্থ্য ও ক্যাম্প ইনচার্জ দাবি করেছে সেটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সীমানার ভেতরেই করা হচ্ছে। এরপরও এ স্থাপনা নির্মাণের কারণে পাহাড় ধ্বস, বন্যপ্রাণীর চলাচল বিঘ্নিত হওয়াসহ বনভূমির ক্ষতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ করতে অনুরোধ করেছিলাম। পরে গত সোমবার আমরা সেটা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। সংরক্ষিত বনভূমিতে হোক বা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হোক আমি তাদের (জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর) কে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেলে তারা আমাকে বলেন-‘ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি, পেয়ে যাবো’ বলে জানান।

’কক্সবাজার দক্ষিণ বিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক আহমদ বলেন-‘ড্যাম তৈরীর শুরু থেকে বিষয়টি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ ও ক্যাম্প ইনচার্জ কে অবগত করেছি। আমি শুরু থেকে সংরক্ষিত বনভূমি কেটে এ ধরনের ড্যাম স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছি। ক্যাম্প এলাকা হোক বা বাইরে হোক, পাহাড়ে কোন স্থাপনা করতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিনিয়ত যেহারে সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে এবং নতুন নতুন অবকাঠামো স্থাপন করা হচ্ছে তাতে রোহিঙ্গারা সারাজীবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাটিয়ে দিতে চাইবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের জন্য যতোবেশি সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে, রোহিঙ্গারা তাতে নিজ দেশেও ফিরবেনা, ভাসানচরেও যাবে না।

আপনার মন্তব্য লিখুন